যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেন সরে যাচ্ছে এশিয়া?

যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেন সরে যাচ্ছে এশিয়া?

জোনাথন ম্যানর্থপ,
শেয়ার করুন

যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট যিনিই হোন না কেন, তিনি অতীতের মতো দেশটিকে বিশ্বের পুলিশ হিসেবে প্রদর্শন করতে আগ্রহী হবেন বা তা করতে সক্ষম হবেন- এমন প্রত্যাশা এশিয়ায় এখন খুবই কম।
এশিয়ার বিতর্কগুলোতে মধ্যস্থতা করা কিংবা মীমাংসায় যুক্তরাষ্ট্রকে হিসাবের মধ্যে না আনার দৃঢ় বিশ্বাসটা সৃষ্টি হয়েছে জর্জ ডব্লিউ বুশ ও বারাক ওবামার আমলে। উভয় প্রেসিডেন্টই মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছেন। প্রহসনের মতো হয়ে ওঠা নির্বাচনী প্রচারণার সময় হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথাবার্তা এই দৃষ্টিভঙ্গিই জোরদার হয়েছে, এশিয়ার প্রতি ওয়াশিংটনের গুরুত্ব ক্রমাগত কমে যাচ্ছে।
চীন ইতোমধ্যেই এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছে, তার আধুনিকায়ন করা সামরিক বাহিনী, বিশেষ করে নৌবাহিনী এবং ক্ষেপণাস্ত্র ভা-ার এশিয়ান পানিসীমায় তার মিত্রদের পক্ষ থেকে যেকোনো মার্কিন পদক্ষেপকে মোকাবিলা করতে পারবে। আঞ্চলিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায়ও ওয়াশিংটনকে বোকা বানিয়ে দিয়েছে বেইজিং।
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অতি সম্প্রতি বৈশ্বিক উচ্চাভিলাসপূর্ণ আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে তার দেশের আত্মপ্রকাশ ঘটনার জন্য আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করার পথ প্রস্তুত করেছেন। অনেকটা চীনা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ভøাদিমির পুতিন হতে যাচ্ছেন তিনি।
এশিয়ার যেসব প্রতিবেশী ঐতিহ্যগতভাবেই সমর্থনের জন্য ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করে থাকত, তারা এখন হয় বেইজিংয়ের নি:শর্ত আনুগত্য প্রকাশ করছে কিংবা নিজেদের প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা নিজেরাই করার চেষ্টা করছে।
আঞ্চলিক আবেদনকারীদের বেইজিংয়ের পৃষ্ঠপোষকতা এবং অভিভাবকসুলভ সুরক্ষা কামনা করার বিষয়টি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠছে। চলতি সপ্তাহেই মালয়েশিয়ার দুর্নীতি-জর্জরিত প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক বেইজিংয়ের নতুন স¤্রাটের প্রতি আনুগত্য প্রকাশকারী আরেকটি এশিয়ান নেতা হিসেবে গণ্য হয়েছেন। নাজিব বেশ ভালোভাবেই ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রড্রিগো দুতার্তের রাস্তা অনুসরণ করছেন। দুতার্তে স্পষ্টভাবেই ওয়াশিংটনের সাথে শত বছরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিন্ন করে বলেছেন, তার দেশের ভবিষ্যৎ এখন চীনের সাথে বাঁধা। কলম্বিয়া ও লাওসও এই সুরেই সুর মিলিয়েছে। অবশ্য এই দেশ দু’টি অনেক কম নাটকীয় পথ অনুসরণ করেছে।
নাজিব একসময় ওয়াশিংটনের সাথে এত ঘনিষ্ঠ ছিলেন যে, তিনি ওবামার সাথে গলফ পর্যন্ত খেলেছেন। কিন্তু মালয়েশিয়ার সভরেন ওয়েলথ ফান্ডের প্রায় ১০০ কোটি ডলার কিভাবে নাজিবের ব্যক্তিগত ব্যাংক একাউন্ডে গেল তা নিয়ে মার্কিন বিচার বিভাগ গত জুলাইতে তদন্ত শুরু করলে সম্পর্কে তিক্ততা শুরু হয়।
নাজিবের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের আরো নানা অভিযোগ রয়েছে। এমন প্রমাণও রয়েছে, তিনি যখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন, তখন সাবমেরিন কেনার একটি চুক্তি নিশ্চিত করার জন্য ফরাসি এক অস্ত্র কোম্পানিকে নাজিবের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ২০০ মিলিয়ন ডলার দিতে হয়েছিল। তার এক ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক উপদেষ্টার উপপতœীকে নজিবের দেহরক্ষীরা মেরে ফেলেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০০৬ সালের সেই ঘটনার সুরাহা এখনো হয়নি। মঙ্গোলিয়ান মডেল শারিবুগিন আল্টানতুয়া নামের ওই নারী হুমকি দিয়েছিলেন, তিনি ফরাসি চুক্তিটি ফাঁস করে দেবেন।
এসব অস্পষ্ট রাস্তায় বেইজিং সাধারণভাবে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্র অনেক সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়াদির দিকে নজর দেয়, আর বেইজিং এগুলোকে ছোটখাট বিষয় বলে মনে করে। এমন প্রেক্ষাপটেই নাজিব নিজেকে চীনের ‘সত্যিকারের বন্ধু’ বলে ঘোষণা করে বলেছেন, তিনি তাদের সম্পর্ককে ‘নতুন উচ্চতায়’ নিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি চীন থেকে উপকূলীয় রণতরী কিনছেন। তাছাড়া বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) মতো পাশ্চাত্যের প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বদলে নতুন নতুন সংস্থা গড়তে বেইজিংয়ের উদ্যোগের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন।
নাজিবের মতো দুতার্তেও ওয়াশিংটনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংবেদনশীলতার কবলে পড়েছেন। জুনে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তিনি অপরাধী চক্রগুলোকে পুলিশের ডেথ স্কোয়াডের মতো ব্যবহার করছেন। মাদক পাচারকারী অভিযোগে প্রায় চার হাজার লোককে হত্যা করা হয়েছে।
গত মাসে বেইজিংয়ে দুতার্তে ঘোষণা করেছেন : ‘এই ভেন্যুতে, মহামান্য, এই ভেন্যুতে আমি যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজেকে আলাদা করার কথা ঘোষণা করছি। সামরিকভাবে, হয়তো সামাজিকভাবে নয়, এবং সেই সাথে অর্থনৈতিকভাবে আমেরিকা শেষ হয়ে গেছে।’
বিপরীতে চীনের সাথে সেই প্রাচীন কাল থেকে থাকা পারস্পরিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বৈরিতা টেনে এনে দূরবর্তী দ্বীপগুলোর প্রতিরক্ষা জোরদার করছে। জাপান তার অরক্ষিত সমুদ্রসীমায় জনমানবহীন দ্বীপগুলোতে আবাসভূমি গড়ার জন্য অতি সম্প্রতি ৯৫ মিলিয়ন ডলারের বাজেট তৈরি করেছে।
শি ক্ষমতায় আসার পর বেইজিং পাঁচটি সেনকাকু দ্বীপের ওপর দাবি আরো জোরালোভাবে দাবি জানাতে থাকলে টোকিও তার ৩৯টি জনমানবহীন দ্বীপে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করে। অন্য ৩৯টি দ্বীপকে ‘রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি’ ঘোষণা করেছে, গোলযোগপূর্ণ স্থানগুলোতে দ্রুত মোতায়েনের জন্য বিশেষ বাহিনীও গড়ে তোলা হচ্ছে। এসব দ্বীপে বিমান বিধ্বংসী ও রাডার ইউনিট স্থাপন করা হচ্ছে।
শি ক্ষমতায় আসেন ২০১২ সালের শেষ দিকে। প্রথমে কমিউনিস্ট পার্টির মহাসচিব হিসেবে, তারপর হন প্রেসিডেন্ট। ১৯৭৬ সালে মাও সে তুং মারা যাওয়ার পর যে যৌথ নেতৃত্বের সৃষ্টি হয়েছিল, তিনি ক্ষমতায় এসে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সেটা অবসানের পথ ধরেন।
তার দুর্নীতিবিরোধী অভিযান আসলে তার প্রকৃত ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক শত্রুদের খতম করার চেষ্টা। শি’র জ্যাকোবিন আদালতের শিকার হয়েছেন কমিউনিস্ট পার্টির লাখ লাখ কর্মকর্তা। এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রখ্যাত হলেন সাবেক সেক্রেটারি জার ঝু ইয়ংকাঙ।
তার প্রতিহিংসা বা ক্রোধ থেকে কেউই নিরাপদ নয়, তা প্রমাণ করতেই যেন শি তার সর্বোচ্চ নেতায় পরিণত হওয়ার গুজবটা সত্যে পরিণত করছেন। পার্টির ৪০০ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকটি তিনি এ কাজে ব্যবহার করেন।
চলতি বছরের শেষ দিকে পার্টি তাকে আরো পাঁচ বছরের দায়িত্ব দিতে চলেছে। শির বর্তমান বয়স ৬৩ বছর। আর অলিখিত একটি বিধান আছে, তা হলো অবসরের বয়স ৬৭। তাছাড়া প্রেসিডেন্ট পদটি দুই মেয়াদে রাখা যায়।
তবে এই ৬৭ বছরের সীমারেখাটি লঙ্ঘন করা হচ্ছে। শি তার ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং দুর্নীতি দমন অভিযানের প্রধান নায়ক ওয়াঙ কিশানকে চীনে সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর সাত সদস্যবিশিষ্ট পলিটব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটিতে আবার নিয়োগ দিয়েছেন। এখানে বয়সের বাধ্যবাধকতা অনুসরণ করা হয়নি।
বিশ্বস্ত সহযোগীকে এভাবে বহাল রাখাটা এই ইঙ্গিতই দেয়, তার আমলে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হবে না।

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ
(ফরেন পলিসি থেকে)

print
শেয়ার করুন