মোদির শাসনে বাড়ছে উদ্বেগ

মোদির শাসনে বাড়ছে উদ্বেগ

এসএএম স্টাফ,
শেয়ার করুন

ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেয়াদের মাঝামাঝি অবস্থায় মৌলিক সংস্কারের ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদির প্রত্যাশা ছাড়িয়ে যাওয়া নিয়ে চলতি মাসের প্রথম দিকে মন্তব্য করা পর্যবেক্ষকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল।
তারপর তিনি এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপটি গ্রহণ করলেন। কর ফাঁকি ও দুর্নীতি রোধের জন্য তিনি হঠাৎ করে দেশটির তিন-চতুর্থাংশেরও মূল্যের ব্যাংক নোট বাতিল করে দিলেন। মোদি তার প্রাথমিক পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন বলে মাঝেমাঝেই যে ধারণার সৃষ্টি হয়, এই পদক্ষেপ আবারো তা মিথ্যা প্রমাণ করলো।
দুর্নীতি, কেলেঙ্কারি ও ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকা মুদ্রাস্ফীতির প্রেক্ষাপটে ভোটাররা ২০১৪ সালে মোদিকে ৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় নির্বাচনী ম্যান্ডেট দিয়েছিল। ভারতের সবচেয়ে বর্ধিষ্ণু রাজ্য গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তার ট্র্যাক রেকর্ডে বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হয়েছিল, মোদির উত্তেজনাকর বক্তৃতাগুলো দেশে ও বিদেশে তাকে রক স্টারের মতো গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।
ভারতের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে মোদির অবস্থান বহাল থাকলেও গত সেপ্টেম্বরে পিউ’র একটি জরিপে দেখা যায়, জনসাধারণের উদ্বেগ তার দায়িত্ব গ্রহণের আগের মাত্রায় বাড়ছে। চাকরির সঙ্কট এবং দুর্নীতির কারণে আগামী বছর অনুষ্ঠেয় একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের নির্বাচন এবং ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছিল।
ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষক সাশা রাইজার-কোসিটস্কির মতে, ‘২০১৪ সালে মোদির প্রবল নির্বাচনী বাগাড়ম্বরতা বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং সেই সাথে অনেক ভোটারের মধ্যে অলীক উচ্চ প্রত্যাশার সৃষ্টি করেছিল। অতি বেশি প্রত্যাশার বিপরীতে সরকার অনেক সাদামাটা প্রমাণিত হয়।’
নির্বাচনের সময় মোদি অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখানে এর গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটির মূল্যায়ন দেয়া হলো :
অর্থনৈতিক সূচক
বিপুল বিজয়ের জন্য মোদি ভারতের ১৩০ কোটি মানুষের একেবারে প্রত্যেকের জন্য উন্নত ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি এর কিছুটা অর্জন করেছেন। যে মন্দা পূর্বসূরিদের ক্ষমতাচ্যুত করেছে, তা থেকে তিনি খানিকটা ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছেন। ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি নিয়ে ভারত এখন দ্রুততম বিকাশমান প্রধান অর্থনীতি। যদিও সেটা সম্ভবত হয়েছে মোট জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপি হিসাব করার নতুন পদ্ধতির সুবাদে। দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগও বিপুলভাবে বেড়েছে।
কিন্তু নেপথ্য চিত্রটি মিশ্র। মাসিক হিসাবে, উৎপাদনের বৃদ্ধি মাত্র ২ শতাংশ। রফতানি ৭.২ শতাংশ পড়ে গেছে। সম্ভবত সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো চাকরির বাজার। প্রতি মাসে চাকরির বাজারে যোগ হচ্ছে ১০ লাখ লোক। তাদের জন্য কোনো ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না।
ব্যবসা সহজীকরণ
চাকরিহীন প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন ভূমি ও শ্রম আইন। মোদি এ দু’টি খাতে সংস্কার সাধনে আইন প্রণেতা ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোর সমর্থন আদায় করতে পারেননি। বিশ্বব্যাংকের ব্যবসাবান্ধব র‌্যাংকিংয়ে মোদির ভারত ১৪২ থেকে ১৩০-এ ওঠে এলেও সেটা হয়েছে অনেকটা পদ্ধতিগত পরিবর্তনের কারণে। ২০১৮ সালের মধ্যে শীর্ষ ৫০-এ ওঠার মোদির টার্গেট এখনো অনেক দূরের বিষয়।
দায়িত্ব গ্রহণের দিন মোদি যে ৩০টি বড় ধরনের সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন, তিনি সম্পন্ন করেছেন মাত্র সাতটি। এই মন্তব্য সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের। পার্লামেন্টে অনুমোদিত দেউলিয়া আইনটি পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হতে আরো কয়েক বছর লাগবে। আর অর্থনীতিবিদেরা ‘ঐতিহাসিক’ জাতীয় বিক্রয়করকে বেশ ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
কালো টাকা
ভারতের জট পাকানো কর ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা একটি বিশাল সমান্তরাল অর্থনীতির সৃষ্টি করেছে। মোদি এটা ভাঙার প্রতিজ্ঞা করেছেন। কালো টাকা সাদা করার যে সুযোগ তিনি দিয়েছিলেন, তাতে সাড়া মিলেছে সামান্যই। বিদেশে পাচার করা সম্পদ থেকে ভারতের ১৩০ কোটি নাগরিকের প্রত্যেকের জন্য উদ্ধার হয়েছে মাত্র ২০ রুপি করে, অথচ মোদি আশা করেছিলেন ২০ লাখ। অবশ্য ভারতের অভ্যন্তর থেকে তুলনামূলক সাড়া দেখা গেছে ভালো, ৬০০ বিলিয়ন রুপিরও বেশি ঘোষণা পাওয়া গেছে।
তবে তিনি সবচেয়ে বড় পদক্ষেপটি গ্রহণ করেছেন মাত্র কয়েক দিন আগে। সেটা হলো ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট হঠাৎ করে বাতিল করা। এই দু’টি নোট দেশটির মোট মুদ্রার মূল্যের ৮৬ ভাগ। অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতে লুকিয়ে রাখা ৪.৬ ট্রিলিয়ন রুপি এর মাধ্যমে সামনে আসবে। অবশ্য এতে করে ভবিষ্যতে কর ফাঁকি রোধ সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে মিশ্র ধারণা রয়েছে।
বড় নোট বাতিল করার প্রথম চার দিনে মোট মূল্যের প্রায় এক পঞ্চমাংশ ব্যাংকগুলোতে জমা পড়েছে।
সামাজিক অগ্রগতি
গরিব মানুষের জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা এবং দিনে ২ ডলারের কম আয়ে বেঁচে থাকা কোটি কোটি মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা বিধানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মোদি সাফল্য অর্জন করেছেন। তবে তার আমলে সামাজিক বৈরিতা বাড়ার অভিযোগ রয়েছে।
তার হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলটির বিরুদ্ধে রয়েছে তথাকথিত নিম্ন সামাজিক শ্রেণী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রয়োজন ও অধিকার অগ্রাহ্য করার অভিযোগ। সাংবিধানিকভাবে সেক্যুলার রাষ্ট্রটিতে ধর্মীয় উত্তেজনায় তার পার্টির আইন প্রণেতাদের ইন্ধন দেয়া বন্ধ করতে না পারার জন্য মোদি সমালোচিত হয়েছেন।
‘অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা সঠিক দিকে অগ্রসর হচ্ছি। তবে যুক্তিটা গতির দিক থেকে, দিক-নির্দেশনায় নয়,’ জানান মুম্বাইভিত্তিক কটক মহিন্দ্র অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিলেন শাহ। ৯.৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় জড়িত প্রতিষ্ঠানটির এই কর্মকর্তা বলেন, সামাজিক, রাজনৈতিক বা ভূ-রাজনৈতিক অনেক বিষয় সবসময়ই থাকে, যা বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিতে পারে।
পররাষ্ট্রনীতি
দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিকে মোদি প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতিতে সাফল্য ছিল সামগ্রিক। আন্তর্জাতিকভাবে ঘৃণিত লোক থেকে মোদি রাতারাতি বৈশ্বিক নেতাদের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিতে পরিণত হন।
প্রতিরক্ষা ও রেলওয়েসহ বিভিন্ন খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে ভারত হয়ে পড়ে বিশ্বের সবচেয়ে উন্মুক্ত অর্থনীতি। অবশ্য স্কডা অটো এএসের মতো বৈশ্বিক কোম্পানিগুলো বলছিল, প্রযুক্তি হস্তান্তরের যেসব শর্ত মোদি দিয়েছেন, তা পূরণ করতে চাইলে ভারতকে আরো উন্মুক্ত হতে হবে। প্রযুক্তি শিল্পের সাথে ভারতের সম্পর্ক ক্রমবর্ধমান হারে কঠিন হয়ে পড়ছে।
তার নীতি ক্রমাগত প্রশ্নের মুখেও পড়ছে। প্রতিবেশী ও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক হয়ে পড়েছে উত্তেজনাকর। উগ্র জাতীয়তাবাদী বক্তব্য যত বাড়ছে, পাকিস্তানের আরেক মিত্র চীনের সাথে সম্পর্ক তত অবনতি হচ্ছে।
তুলনামূলক কম স্থিতিশীল সরকারের অধীনে কয়েক বছর ধরে নীতিগত স্থবিরতার পর মোদি ‘অনায়াসে ধরা সম্ভব’ নীতির দিকে ঝুঁকছেন বলে মন্তব্য করেছেন এবিএন আমরো ব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ অর্জেন ভ্যান দিজখুজেন। তার মতে, বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রিয় থাকতে হলে মোদিকে সংস্কারের গতি প্রাণবন্ত রাখতেই হবে।’

বুমবার্গ আবলম্বনে হাসান শরীফ

print
শেয়ার করুন