বাংলাদেশ: বিনিয়োগের আড়ালে মুদ্রা পাচারে শিথিল নীতিমালা!

বাংলাদেশ: বিনিয়োগের আড়ালে মুদ্রা পাচারে শিথিল নীতিমালা!

এসএএম রিপোর্ট,
শেয়ার করুন

সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছাড়াই বাংলাদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য শিথিল করা হচ্ছে বিদেশে বিনিয়োগের দুয়ার। বাংলাদেশ ব্যাংক কেস টু কেস ভিত্তিতে বিদেশে বিনিয়োগের এই অনুমতি দেবে। কোন কোন বিবেচনায় এই অনুমতি দেয়া হবে এ ব্যাপারে কোনো সার্কুলার জারি করা হবে না। বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, এর ফলে বিদেশে মুদ্রাপাচার বেড়ে যাবে। চাপ বাড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী, বাংলাদেশি মুদ্রা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাধাহীনভাবে আন্তর্জাতিক লেনদেন করতে পারবে না। যদি কোনো বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগের আগ্রহ থাকে তাহলে তাদের বেশকিছু নিয়ম মেনে করতে হবে। সে ক্ষেত্রে একজন ব্যবসায়ী ব্যবসা বাড়াতে অন্য দেশে লিয়াজোঁ বা সাবসিডিয়ারি অফিস খোলা ও ব্যয় নির্বাহের জন্য বছরে ৩০ হাজার ডলার পর্যন্ত নিতে পারেন। এছাড়া এলসি খুলে যে কোনো পরিমাণের বৈধ পণ্য আমদানি, ভ্রমণ কোটায় বছরে সার্কভুক্ত দেশে পাঁচ হাজার ডলারসহ মোট ১২ হাজার ডলার খরচ করা যায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও তা করতে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয় ব্যবসায়ীদের। তাই বিষয়টি সহজ করে দিলে ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন একটি সুযোগ তৈরি হবে। তবে এটি যদি একেবারে কোনো নিয়ম না মেনে খুলে দেয়া হয় তবে দেশ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে। তাই ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহজ নিয়ম মেনে আন্তর্জাতিক লেনদেনের ব্যবস্থার কথা বলেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশে ব্যাংকের সাবেক এক ডেপুটি গভর্নর বলেন, বিনিয়োগের দুয়ার একেবারে খুলে দেয়া কোনো সঠিক সিদ্ধান্ত হবে না। কারণ ব্যবসায়ীদের দেশের বাইরের বিনিয়োগ দেশের রিজার্ভের উপর চাপ তৈরি করবে। যার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়বে। একই সাথে হঠাৎ করে এমন সুযোগের কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগও কমে যেতে পারে।
তিনি বলেন, যদি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়াই হয়ে থাকে তাহলে তার জন্য আলাদা একটি নীতিমালা তৈরি করতে হবে। যে নীতিমালার মধ্যে ব্যবসায়ী যারা বিদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী তাদের নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচিত বিনিয়োগকারীর পণ্যের বাজার চাহিদা পর্যবেক্ষক করতে হবে। তা না হলে বিনিয়োগ উপযোগী হবে না।
২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো মবিল যমুনাকে বিদেশে বিনিয়োগের অনুমতি দেয়া হয়। সেখানে এমজেএল অ্যান্ড এ কে টি পেট্রোলিয়াম নামে একটি কোম্পানি গঠন করা হয়। যেখানে বাংলাদেশের এই বিনিয়োগকারীর সাথে যুক্ত হয় মিয়ানমারের একটি প্রতিষ্ঠান। আর এই দুই কোম্পানির বিনিয়োগ ছিলো ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এছাড়া অনুমতিপ্রাপ্ত আরেকটি প্রতিষ্ঠান ছিল পোশাক খাতের দুলাল ব্রাদার্স (ডিবিএল) গ্রুপ। গত বছরে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রাথমিকভাবে ইথিওপিয়ায় ৩০ লাখ ডলার বিনিয়োগের অনুমতি দেয়া হয়। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটি আরও তিন কোটি ২০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করতে পারবে বলে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে এক কোটি ডলার নেয়া হবে বাংলাদেশ থেকে। বাকি অর্থ ইথিওপিয়ার বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে কোম্পানি।
এসিআই হেলথ কেয়ারেকে এক্সপোর্ট রিটেনশন কোটায় বিনিয়োগ করার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটি ৪ লাখ ৪৭ হাজার ডলার ওই দেশের ক্যাটালেন্ট ফার্মা সলিউশন, মেডকোর ফার্মা ও সারভেন্স ইনসে বিনিয়োগ করেছে।
স্কয়ার ফার্মাকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে বিদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য স্কয়ার ফার্মাকেও যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ লাখ ডলার নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এর আগে ২০১৪ সালে দেশের বাইরে বিনিয়োগের অনুমতি পায় ওষুধ খাতের ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস। প্রতিষ্ঠানটি প্রাথমিকভাবে আড়াই হাজার ইউরো নিয়ে এস্টোনিয়াতে একটি যৌথ বিনিয়োগকারী কোম্পানি গঠন করে।
এখন পর্যন্ত হাতে গোনা যে কয়টি অনুমোদন পেয়েছে তার বাইরে আবেদন করলেও দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে বিদেশে বিনিয়োগের অনুমোদন দেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক।
যার মধ্যে নিটল নিলয় গ্রুপ উগান্ডায় কৃষি জমি কেনার কথা বলে বিনিয়োগের অনুমতি চাইলে তার অনুমোদন দেয়া হয়নি। সিঙ্গাপুরে শিপইয়ার্ড কারখানা স্থাপনের অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেছিল সামিট গ্রুপ। বিদেশে আখ নির্ভর চিনিকল স্থাপনের জন্য দেশবন্ধু গ্রুপ অর্থ নেয়ার অনুমতি চেয়েছিলো। কম্বোডিয়ায় জমি কিনে শিল্প স্থাপনের অনুমোদন চেয়েছিল মেঘনা গ্রুপ। এছাড়া ভারতে কোম্পানি খোলার জন্য প্রাণ গ্রুপ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছিলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এগুলোর অনুমোদন দেয়নি। কোন বিবেচনায় অনুমতি দেয়া হয়নি তাও সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন অনেক প্রতিষ্ঠানই বিদেশে পুঁজি নেয়ার অনুমোদন পেয়ে যাবে। কারণ, সরকার সমর্থক অনেকেই বিদেশে বৈধভাবে পুঁজি সরিয়ে নেয়ার পাঁয়তারা করছে। এ সুযোগটিই তারা কাজে লাগাবে। কেস টু কেস সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষেত্রে অতীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাজনৈতিক প্রভাব অনেক প্রবল হয়ে উঠতে দেখা গেছে। এক্ষেত্রেও তার পূনরাবৃত্তি হতে পারে।

শেয়ার করুন