শরিয়াহ্ ব্যাংকিং প্রবর্তনের সময় এসেছে

শরিয়াহ্ ব্যাংকিং প্রবর্তনের সময় এসেছে

পুর্ণিমা এস ত্রিপাথি,
শেয়ার করুন

ভারতে প্রধানমন্ত্রী মোদির মুদ্রানোট বাতিলকরণ উদ্যোগে সব শ্রেণীপেশার মানুষকে আঘাত করলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশটির মুসলিম জনগোষ্ঠি। এর কারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তাদের নিম্ন অংশগ্রহণ, অতলস্পর্শী দারিদ্র্য ও শিক্ষার নিম্নহার। আর তাই মুদ্রানোট বাতিলের অভিজ্ঞতা এই বিপুল জনগোষ্ঠির মাঝে ইসলামী শরিয়াহ্-ভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার দাবি জোরদার করেছে। এক্ষেত্রে তামিলনাড়ুর ভেলোর জেলায় যে জরিপ চালানো হয় তা বেশ উৎসাহব্যঞ্জক। ইন্ডিয়ান সেন্টার ফর ইসলামিক ফাইন্যান্স (আইসিআইএফ) এই জরিপ চালায়। এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে শরিয়াহ্-ভিত্তিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছে। মুদ্রানোট বাতিলের প্রভাব বুঝার জন্য আইসিআইএফ এ জরিপ চালায়।

জরিপে অংশ নেয়া ৬৫ বছর বয়সী এক পুরনো আসবাব বিক্রেতা জানান, তার রোজ আয় ৪০০-৫০০ রুপি থেকে এখন ২০-৩০ রুপিতে নেমে এসেছে। আরেক ফল বিক্রেতা ইরফান (৪০) জানান তার আয় কমে গিয়ে মাত্র ৫০-৬০ রুপিতে দাঁড়িয়েছে। গোস্ত বিক্রেতা ইকবাল (৪৫) জানিয়েছেন, মুদ্রানোট বাতিলের প্রথম সপ্তাহে তার কোন আয়ই হয়নি। পরের সপ্তাহগুলোতে বিক্রি বাড়লেও তা সব বাকিতে। দৈনন্দিন চাহিদা পূরণের জন্য তাকে রীতিমত লড়াই করতে হচ্ছে। সরকারি অবসরভাতার ওপর নির্ভর করে থাকা ৬০ বছর বয়সি এক মুসলিম মহিলা জানান, মুদ্রানোট বাতিলের প্রথম সপ্তাহে প্রতিদিনই তিনি মাসিক ভাতা তোলার জন্য লাইনে দাঁড়ান, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই মেলেনি। দ্বিতীয় সপ্তাহে গিয়ে কিছু টাকা তুলতে পারেন তিনি।
এই জরিপে বেনারসের তাঁতি, মোরাদাবাদের কাসারী, ফিরোজাবাদের কাঁচ শিল্প, আলিগড়ের চাবিপ্রস্তুতকারক, লাখনৌ-এর এমব্রয়ডারি ও জরি শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের অবস্থাও উঠে আসে। এতে দেখা যায় মুদ্রানোট বাতিলের কারণে তাদের আয় রাতারাতি বন্ধ হয়ে যায়। তাদের যেটুকু সঞ্চয় ৫০০ ও ১০০০ রুপি নোটের আকারে রাখা ছিলো তাও ধ্বংস হয়ে যায়।
মুসলিম ইস্যু নিয়ে কাজ করেন দিল্লির এমন একজন গবেষক শফিক রহমান বলেন, ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে মুসলমানরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির স্বীকার হয়েছে। বেশিরভাগের কোন ব্যাংক একাউন্ট নেই। কারণ, সুদের বিনিময়ে লেনদেন ইসলামে নিষিদ্ধ। ভারতে গড়ে যেখানে ৭৮ শতাংশ মানুষের ব্যাংক একাউন্ট রয়েছে, সেখানে মুসলমানদের মধ্যে এই হার ৬৩%। ৯% মুসলমানের পোস্ট অফিস একাউন্ট থাকলেও এর জাতীয় গড় ১৪%। অর্থাৎ ৩৭% মুসলিম ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে এবং মুদ্রানোট বাতিল সম্পর্কে এরা বেখবর।
শিক্ষার নিম্ন হার (জাতীয় হার ৭৩%, মুসলমানদের মধ্যে ৬৯%) ও নিম্নআয়ের কারণেও মুসলমানরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ৬৩% মুসলমানের বার্ষিক আয় ১ লাখ ২০ হাজার রুপির নিচে। মাত্র ৬%-এর আয় ৩ লাখ রুপি বা তার ওপরে। নবেম্বরে নোট বাতিলের পর থেকে ৫৫টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, এর মধ্যে ১২ জন মুসলমান। ভারতের মুসলমানরা মূলত ক্ষুদ্র ব্যবসায় বা স্বনির্ভর কোন কাজের সঙ্গে জড়িত। বেশিরভাগই অনানুষ্ঠানিক খাত। যার কোন অডিটের প্রয়োজন হয় না। ফলে তাদের ব্যাংক একাউন্টও নেই। আর এ কারণেই নোট বাতিল তাদেরকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে।
আইসিআইএফ’র সাধারণ সম্পাদক ও ভারতের ইসলামী ব্যাংকিং কমিটির কনভেনার এইচ আবদুর রাকিব বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং ইস্যু নিয়ে মোদির ভাবনা-চিন্তা করার সময় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী যদি সত্যিই ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে চান, মুদ্রাবিহীন অর্থনীতি তৈরি করতে চান তাহলে তাকে দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের দুর্দশার প্রতি নজর দিতে হবে। তাদের জন্য মোদিকে কিছু করতে হবে।
ইসলামী ব্যাংকিং শুধু মুসলমানদের জন্য – এমন ধারণা ভুল উল্লেখ করে রাকিব বলেন এ যুক্তিতে অনেকে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিরোধিতা করে। আসলে এটা বিনিয়োগের একটি নৈতিক উপায়। যে কারণে বিশ্বব্যাপী এর প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাজ্য, হংকং, সিঙ্গাপুর ও ফ্রান্সের মতো দেশে ব্যাংকগুলো তাদের ব্যবস্থায় ইসলামী ব্যাংকিং সংযুক্ত করেছে। তাহলে ভারতের করতে অসুবিধা কোথায়? শরিয়াহ্-সম্মত মিউচুয়াল ফান্ড ও স্টক ভারতে চালু থাকলেও ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূলধারায় মুসলমানদের নিয়ে আসতে ইসলামী ব্যাংকিং কোন চালু করা যাবে না তার কোন ব্যাখ্যা নেই।
তবে আইসিআইএফ’র প্রচারণা ও মোদির ফিনান্সিয়াল ইনক্লুসন উদ্যোগের কারণে ২০১৫ সালের জুলাইয়ে ভারতের কেন্দ্রিয় ব্যাংক গভর্নর রঘুরাম রাজনের নেতৃত্বে ‘কমিটি অন মিডিয়াম-টার্ম পাথ অন ফিনান্সিয়াল ইনক্লুসন’ গঠন করে। ওই বছরের ডিসেম্বরে কমিটি তার রিপোর্ট দেয়। রিপোর্টে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোতে মুসলমানদের জন্য আলাদা উইন্ডো খোলার সুপারিশ করা হয়।
সুদবিহীন ব্যাংকিংয়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে রিপোর্টে বলা হয়: ‘সুদবিহীন ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্স-এর মূল চেতনা হলো ন্যায়বিচার, যা ঝুঁকি বণ্টনের মাধ্যমে অর্জিত হয়। স্টেকহোল্ডাররা লাভ ও লোকসানের সমান অংশীদার হবেন। সুদ আরোপ এখানে নিষিদ্ধ … এটি একটি কঠোর নৈতিক বিধান।’ এ ধরনের ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে এমন নয়টি আর্থিক পণ্যের তালিকা উল্লেখ করে রিপোর্টে আরো বলা হয় বিশ্বের বিভিন্ন অংশ এমনকি এশিয়ার অনেক দেশে এই ব্যবস্থা চালু থাকলেও এ ব্যাপারে ভারত আগ্রহশূন্য থাকার কোন ব্যাখ্যা নেই।
ভারতের বাণিজ্যিক বাংকগুলো প্রাথমিকভাবে কিছু সাধারণ আর্থিক পণ্য নিয়ে আলাদা ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো খুলতে পারে বলেও রিপোর্টে সুপারিশ করা হয়।
কমিটির এই দ্ব্যর্থহীন সুপারিশ ও পরবর্তীতে মুদ্রাহীন অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের পর আশা করা যায় মোদি এখন ইসলামী ব্যাংকিং চালুর বিষয়ে ভাববেন এবং ব্যবস্থা নেবেন। অতীতের মতো এ উদ্যোগটিও যেন সাম্প্রদায়িক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে সেদিকেও তাকে খেয়াল রাখতে হবে।

শরিয়াহ্-সম্মত মিউচুয়াল ফান্ড
২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মোদির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমক্রেটিক এলায়েন্স (এনডিএ) সরকার স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া’র একটি আলাদা ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো খোলার ব্যাপারে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়। ওই বছর নবেম্বরে সরকার ঘোষণা করে যে এসবিআই মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে শরিয়াহ্-সম্মত মিউচ্যুয়াল ফান্ড ছাড়া হবে। এর নাম দেয়া হয় শরিয়াহ্ ইকুইটি ফান্ড (একটি ওপেন-এন্ডেড ইকুইটি ফান্ড)। ২০১৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে এই ফান্ড বাজারে ছাড়ার কথা ছিলো। ফরাসী এসেট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান আমুন্ডির সঙ্গে যৌথভাবে এসবিআই ওই ফান্ড ছাড়ে। কিন্তু সুব্রামনিয়াম স্বামীর বিরোধিতার মুখে পরবর্তীতে এই উদ্যোগ স্থগিত করা হয়। অবিলম্বে এই উদ্যোগ বন্ধের দাবি জানিয়ে স্বামী মোদির কাছে চিঠি পাঠান। বিজেপির অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতাও এর বিরোধিতা করে বলেন, শরিয়াহ্-সম্মত আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।
প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের সাম্প্রদায়িক মনোভাবের উর্ধ্বে উঠে সত্যিকার অর্থে ফাইনান্সিয়াল ইনক্লুসন’ গ্রহণ করবেন বলে রাকিব আশা করছেন। তিনি বলেন, রিলায়েন্স ও টাটার মতো কোম্পানিগুলোর যদি শরিয়াহ্-সম্মত স্টক থাকতে পারে, আইসিআইসিআই ও কটক ব্যাংক যদি উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম চালাতে পারে তাহলে ভারতে কেন ইসলামী ব্যাংকিং চালানো যাবে না?
রাকিব বলেন, বোম্বে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ছয় হাজার কোম্পানির মধ্যে মোটামুটি চার হাজার দু’শটি শরিয়াহ্-সম্মত কোম্পানি। বোম্বে শেয়ারবাজারের শরিয়াহ্-সম্মত সূচক রয়েছে এবং এতে রিলায়েন্স ইন্ডিয়া, ভারতী এয়ারটের ও টাটা টেলি’র নাম রয়েছে।
ভারতে ইসলামী ব্যাংকিং ধারনা গ্রহণের সময় এসেছে। নৈতিক আর্থিক কর্মকা- এমন এক ধারণা যার ব্রত এমনকি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘও গ্রহণ করতে পারে।

ফ্রন্টলাইনে প্রকাশিত।

print
শেয়ার করুন