মিয়ানমারের মল্লযুদ্ধ – লেথবি

মিয়ানমারের মল্লযুদ্ধ – লেথবি

এসএএম স্টাফ,
শেয়ার করুন

অতীতে এক সময় ছিলো যখন মিয়ানমারে বিভিন্ন উপজাতীয় সম্প্রদায়ের মানুষ শুধু লেথবি দেখবে বলে গ্রামা লের মল্লম গুলোর পাশে দলে দলে ভিড় জামাতো। লেথবি এক ধরনের মুষ্টিযুদ্ধ, এতে প্রতিযোগীরা হাতে দস্তানা ব্যবহার করেন না। এটা এক ধরনের মার্শাল আর্ট যেখানে মাথায় গাট্টা মারা, গলা টিপে ধরা বা শরীরে ঘুসি দেয়া অনুমোদিত। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের জাপানী মল্লযুদ্ধ শিল্প ‘নাবান’, মিয়ানমারের আত্মরক্ষামূলক মার্শাল আর্ট ‘বানদো’ এবং পবিত্র মার্শাল আর্ট হিসেবে স্বীকৃত ‘থাইং’-এর যে অংশটুকুতে অস্ত্রের ব্যবহার রয়েছে সেই ‘বাইনসাই’-এর সঙ্গে লেথবিকে তুলনা করা হয়।
থাইল্যান্ডের কিক বক্সারদের মতো এখানেও শঙ্কাহীন প্রতিযোগিরা লড়াই করলেও তাদের এই লড়াই চলে মিয়ানমারের ঐতিহ্যবাহী সুরের তালে তালে। এটাই ওই অ লে প্রচলিত একই ধরনের অন্য ক্রীড়াগুলো থেকে লেথবিকে আলাদা করেছে। লাওসে একই ধরনের খেলার নাম মুয়াই লাও, মালয়েশিয়ায় তোমেই এবং কম্বোডিয়ায় প্রাদাল সেরেই। লেথবি প্রতিযোগিরা হাতে দস্তানা, মাথা বা শরীরের কোন অংশে সুরক্ষামূলক কিছু পরিধান করেন না।
আচারিক নাচের মধ্য দিয়ে লেথবি শুরু হয়। এই নাচের আচারকে বলা হয় লাত খা মাউং। রেফারির সংকেত পেয়ে প্রতিযোগীরা লড়াই শুরু করেন এবং কোন প্রতিপক্ষ হার স্বীকার না করা পর্যন্ত লড়াই চলে। লেথবিতে পয়েন্ট গণনার কোন ব্যবস্থা নেই।
লড়াইয়ে প্রতিযোগীরা যেভাবে হাত ও পায়ের কৌশল ব্যবহার করেন তা দর্শকদের চমৎকৃত করে। এখানে রক্তপাতের ঘটনাও ঘটে। কখনো কখনো কোন প্রতিযোগির মাথা ফেটে রক্তের ধারা তার চোখ বন্ধ করে দিলে তিনি লড়াই বন্ধ করতে বাধ্য হন। তবে, কোন কোন লেথবি সংগঠনের নিয়ম হলো, লড়াই বন্ধ ঘোষণার আগে প্রতিযোগী তিনবার তার চোখের রক্ত মুছে নেয়ার সুযোগ পাবেন।
মিয়ানমারের এই বিনোদন বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীকে কাছাকাছি নিয়ে আসে। যে কেউ এ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে। শিক্ষক থেকে শুরু করে রাস্তার ভরঘুরেও এখানে অংশ নিতে পারেন। সাধারণত আগের বছরের চ্যাম্পিয়ন প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু করেন। কেউ তার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে এগিয়ে গেলেই লড়াই শুরু হয়।
মিয়ানমারের বিভিন্ন অ লে বিভিন্ন ধরনের লেথবি’র প্রচলন থাকলেও ১৯৫০’র দশকে একে একটি নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসার কাজ শুরু হয়। তখন থেকে কিছু নিয়ম মেনে খেলতে প্রতিযোগিদের উৎসাহিত করা হয় এবং নিরাপত্তার ওপর জোর দেয়া হয়। নতুন প্রজন্মের কাছে লেথবি’কে আকর্ষনীয় করতে সুরক্ষামূলক পোশাক ও আধুনিক বক্সিং রিং-এর মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
সম্প্রতি মিয়ানমারের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় দেশটির ঐতিহ্যবাহী লেথবি ও অন্যান্য মার্শাল আর্ট আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এখনো অনেকে লেথবিকে বর্বর ধরনের খেলা বলে মনে করে।
নিষ্ঠুর প্রকৃতির হলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লেথবি জিমনেশিয়ার ছড়িয়ে পড়ছে। বিদেশীরা একে ঐতিহ্যবাহী মার্শাল আর্টের মতো একটি কার্যকর রণকৌশল হিসেবে গ্রহণ করছে। মিয়ানমারে মার্শাল আর্টের অনুশীলনকারীরা চান লেথবিকে যেন ‘মিক্সড মার্শাল আর্ট’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

print
শেয়ার করুন