রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের আপত্তি বিদ্বান-শিল্পীদের ভয় পেলে চলবে না

রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের আপত্তি বিদ্বান-শিল্পীদের ভয় পেলে চলবে না

এসএএম স্টাফ,
শেয়ার করুন

রামচন্দ্র গুহঃ এ বছর ভারতের জয়পুর সাহিত্য উৎসবে বাংলাদেশি লেখক তসলিমা নাসরিনের উপস্থিতি অনেকটাই ছিলো অপ্রত্যাশিত। তিনি [১৯ জানুয়ারি] যে সেশনে উপস্থিতি হন তার শিরোনাম ছিলো ‘নির্বাসন’। তবে কর্মসূচিতে তার নাম লেখা ছিলো না। পুলিশী প্রহরায় এই সেশন অনুষ্ঠিত হলেও বিরূপ কোন ঘটনা সেখানে ঘটেনি। কিন্তু তসলিমা নাসরিনের উপস্থিতির খবর চাউর হয়ে পড়লে একদল গোঁড়া লোক উৎসবের পরিচালকের কাছে এর জবাব চান। এরপর থেকে আগাম অনুমতি ছাড়া তসলিমাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে না বলে অঙ্গীকার করে পরিচালক শেষ পর্যন্ত রেহাই পান।
উৎসবের পর দিন। লেখক প্রকাশকরা নিজ নিজ রাজ্য বা দেশে ফিরে গেছেন। মুম্বাই থেকে আসা একজন সিনেমা ক্রু জয়পুরে তাদের শুটিং-এর কাজ শুরু করে। এরা সঞ্জয় লিলা ভানসালি পরিচালিত পদ্মাবতি ছবির শুটিং করছিলো। একদল গোঁড়া শুটিং স্পটে হামলা চালায়। এরা ‘রাজপুত মহিমা’র স্লোগান দিচ্ছিল। ভানসালি ও তার দল ভয়ে মুম্বাই পালিয়ে যায়। কয়েকজন হামলাকারীকে পুলিশ আটক করলেও কয়েক ঘন্টার মধ্যে ছেড়ে দেয়।
বাঙ্গালুরুর এসব ঘটনার কথা জানতে পেরে আমি জয়পুর সাহিত্য উৎসবের আয়োজকদের কাছে লিখি তারা যেন রাজস্তানের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে গিয়ে তাকে লেখক, শিল্পী ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের স্বাধীনতা রক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানায়। মুখ্যমন্ত্রী এই উৎসবের পৃষ্ঠপোষক, এর উদ্বোধনও করেন তিনি। রাজ্য সরকারের কাছ থেকে যৌক্তিক সহায়তা পেতে হবে সংগঠকদের। রাজ্যের পর্যটন শিল্পের স্বার্থে এ ধরনের উৎসবেরও প্রয়োজন রয়েছে। রাজস্তানের মুখ্যমন্ত্রী বা সরকারকে শুধু বছরের একটি সপ্তাহে শিল্পী-সাহিত্যিকদের সৃজনশীলতার প্রতি উৎসাহ দেখালে হবে না বাকি ৫১ সপ্তাহেও একই ধরনের উৎসাহ থাকতে হবে। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজ্যে কোন ব্যবস্থা না নিলেও উৎসবের আয়োজকদের এর নিন্দা জানানো উচিত।
দু:খজনক হলো আয়োজকরা এখনো নিশ্চুপ। ফেব্রুয়ারির গোড়ার দিকে যোধপুরের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। জওয়াহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিবেদিতা মেনন সেখানে বক্তব্য রাখেন। তিনি বক্তব্যে কাশ্মিরে চলমান সংঘাত প্রসঙ্গ তোলা মাত্রই অতি-জাতীয়তাবাদিরা হৈ চৈ শুরু করে দেয়। তারা এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে মেননের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করতে বাধ্য করে। প্রতিহিংসাপরায়ণতার শিকার হন ওই সম্মেলনের আয়োজক এক প্রভাষক। তাকে বরখাস্ত করা হয়।
মাত্র একটি রাজ্য রাজস্তানে বাক স্বাধীনতার ওপর হামলার তিনটি সাম্প্রতিক ঘটনা এখানে তুলে ধরা হলো। সারা দেশেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। তা যে দলের সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন। ইরানে নিষিদ্ধ হওয়ার আগেই রাজিব গান্ধীর সরকার ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ নিষিদ্ধ করেছিলো। আর বাহ্যত সাহিত্য-প্রেমিক পশ্চিমবঙ্গের বাম মুখ্যমন্ত্রীরা প্রথম তসলিমার বইগুলো নিষিদ্ধ করেন এবং তাকে রাজ্য থেকে বিতাড়িত করেন। হিন্দুত্ববাদি, শিবসৈনিক ও অন্যান্য উৎকট দেশভক্তরা এ ধরনের অসহিষ্ণুতা আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে; আরো সহিংসতা সৃষ্টি, ভাংচুর চালাতে পারে। হ্যাঁ, কংগ্রেস ও বামরা এটা শুরু করেছিলো।
অতীতে বামদের মধ্যে তাদের মত সম্পর্কে যেমন অন্ধবিশ্বাস ছিলো এখন তা ডানপন্থী গোঁড়াদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। গত বছর নেহেরু বিশ্বদ্যিালয়ে কেন্দ্রিয় সরকারের বর্বর হামলাকে এরা সমর্থন করে। বাবা রামদেবকে বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য রাখতে দেয়া হয়নি। রামদেব হয়তো পন্ডিত নন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের আচরণ নিয়ে অনেকদিন ধরে বুদ্ধিজীবী মহল থেকে সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে। নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকগুলো বিভাগে একরঙ্গা মাক্সবাদিরা প্রভাব বিস্তার করে আছে। এগুলোর একটি এতটাই সংকীর্ণমনা যে তারা নর্মাদা আন্দোলন নিয়ে আলোচনা সভাও আয়োজন করতে দেয়নি। কারণ, পরিবেশবাদিরা শ্রেণীসংগ্রাম বাদ দিয়ে বুর্জোয়াদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে।
বাক স্বাধীনতা জোরদারের প্রসঙ্গ এলে আমরা আমাদের কোন রাজনীতিক ও রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে জোরালো বা অব্যাহত সমর্থন আশা করতে পারি না। জ্যোতি বসু হয়তো গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কুয়েজের সঙ্গে ছবি তুলে আনন্দ পেয়েছেন কিন্তু তিনি তসলিমা নাসরিনকে পরিত্যাগ করেছেন। আগামী জানুয়ারিতেও বসুন্ধরা রাজ্যে জয়পুর সাহিত্য উৎসবে যোগ দেবেন। আর উৎসব শেষ হলে তার দলের লোকেরাই বিজ্ঞজন ও চিত্রনির্মাতাদের ওপর হামলা করবে। তার পুলিশ বাহিনী এসব ঘটনা চেয়ে চেয়ে দেখবে।
তবে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কথা বলতে লেখক-বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীদের ভয় পেলে চলবে না। শুধু তাদের মতাদর্শের অনুসারিরাই বুদ্ধিবৃত্তিক ও শিল্পের স্বাধীনতা ভোগ করবেন এটাও চলবে না। লেখক-শিল্পীদের ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে। এক্ষেত্রে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন রাজশ্রী রনবৎ। এই বুদ্ধিজীবী যোধপুরে এক সেমিনার আয়োজন করেন এবং সেখানে নিবেদিতা মেনন বক্তব্য রাখেন। মেনন একজন বাম-ঘেষা নারীবাদী। সেমিনারে আমন্ত্রিত অন্য উল্লেখযোগ্য আলোচকদের মধ্যে ছিলেন হিন্দুবাদি ইতিহাসবিদ ওয়াই সুদর্শন রাও। রনবৎ এমন আলোচকদেরও আমন্ত্রণ জানান যারা ডান-বাম কোনটাই নন, তবে উদার মধ্যপন্থী। রনবৎকে বরখাস্ত করা হয়েছে। কিন্তু তার সহকর্মী লেখক বুদ্ধিজীবীদের তাকে ভুলে গেলে চলবে না। তাকে অনুকরণ ও সম্মান করতে হবে। জয়পুর সাহিত্য উৎসবের আয়োজকরা ২০১৮ সালের উৎসব উদ্বোধনে রাজশ্রী রনবৎকে আমন্ত্রণ জানানোর কথা বিবেচনায় নিতে পারেন।

রামচন্দ্র্র গুহ গান্ধী বিফোর ইন্ডিয়া বইয়ের লেখক