ছত্রাক: কলকাতার বন্দিআত্মাগুলোর অন্তদর্শন

ছত্রাক: কলকাতার বন্দিআত্মাগুলোর অন্তদর্শন

শেয়ার করুন

দূরে কালো আবছায়ার মতো দিগন্ত বিদীর্ণ করেছে এক সবুজ বনানী। মাথার ওপরে মেঘের ফাঁকে সূর্য্যরে উঁকিঝুঁকি। দূরের বনটি নি:সঙ্গ নয়। সেখানে এক সীমান্ত রক্ষীও আছে। কারণ, বনের প্রান্ত সীমাই দুটি দেশের সীমানা। সেখানে পাহারায় দাঁড়িয়ে সাদা চামড়ার এক প্রহরী। তার নির্মম হৃদয়ের মাঝে লুকিয়ে আছে অনেক গোপন খবর। বন ছাড়া তার আর কোন সঙ্গী নেই। কিন্তু একদিন আত্মার ডাকে সাড়া না দিয়ে সে আর পারেনি। ফিসফিস করে উগড়ে দিতে লাগলো মনের গোপন কথাগুলো। চুপিসারে স্বীকার করলো নিজের ভুলগুলো। সে খুন করেছে, অনেক খুন করেছে। অনেক মানুষকে খুন করেছে সে। মানুষের বানানো সীমানা পাড়ি দেয়ার অপরাধেই সে মানুষগুলোকে খুন করেছে। অথচ খুন হওয়া মানুষগুলো একটু ভালোভাবে জীবন কাটানো ছাড়া আর কিছু চায়নি। তাদেরকে খুন করেছে সে।

ফিসফিস কণ্ঠে প্রহরী নিজের অপরাধগুলো যেন বনকেই শোনাতে চায়: একশ’টি খুন করেছি আমি। আমি এক বিদেশী সৈনিক বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে। সীমান্তের এ পারে প্রাচুর্য। তাই অনেকেই আসতে চায় এখানে। তাদেরকে আমি গুলি করে মারি। তাদের প্রত্যেককে। তাদের জীবন কেড়ে নিতেই রাখা হয়েছে আমাকে।

প্রহরী’র স্বীকারোক্তির কোন জবাব দিতে পারে না বনানীর মৃদুমন্দ সমীরণ। গোপন কথাগুলো গোপনেই রাখতে বসুন্ধরার কাছে তার আকুতি। নিজের খোঁড়া কুহরে অপরাধগুলো চাপা দিতে চায় সে। মর্মবেদনার ক্ষণ পেরিয়ে প্রহরি ফের বাস্তব অবস্থায় ফিরে আসে। বন্দুকের ট্রিগারে মুষ্টিবদ্ধ হয় তার হাত। বনানীর সবুজ-বাদামী চাঁদোয়ার নীচে সে অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু বন্ধ হয় না মানুষ শিকার।

এই গভীর নির্জনতার মাঝে আরেক দৃশ্যপট। আরেকটি মানুষ। বাদামী চামড়া’র। সে শিকারী নয়, শিকার। গাছের ছায়ায় মিশে থাকা তার ছায়াটি মৃদমন্দ বাতাসের মতোই থিরথির করে কাঁপছে। বনের মাসরুম তার খাবার। রাতে ঘুমের জন্য তার শয্যা গাছের ডাল। প্রাণখুলে সে হাসতে পারে। বনানীর মাঝে হঠাৎ শিকার ও শিকারীর দেখা হয়ে যায় একদিন। কিন্তু কোন হত্যাকাণ্ড হয় না। পরস্পরের দিকে তারা নির্বাক তাকিয়ে থাকে। তাই বলে বাইরের দুনিয়ায় শিকার ও শিকারির সংগ্রাম থেমে থাকে না।

আরেক দৃশ্যপট, ছিনিয়ে নেয়া জমিতে নির্মাণ কাজের দৃশ্য। মূল মালিকদের অভিযোগ কর্তৃপক্ষ শিল্পাঞ্চল গড়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে জমি কেড়ে নিলেও এখন দেখা যাচ্ছে সেখানে বিলাসবহুল আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। শিল্পকারখানায় কাজ করবে বলে স্বপ্নে বিভোর মানুষগুলো এখন বড়লোকের বাড়িতে চাকর-ঝি’র কাজ ছাড়া আর কিছু’র কথা ভাবতে পারছে না। ছয় হাজার রুপি দামের জমিতে তৈরি করা ফ্লাটের দাম ৮০ লাখ রুপি। শিকার ও শিকারীর খেলা এখানেও। কিন্তু এই ভবন নির্মাণ প্রকল্পেও আত্মঅনুশোচনায় ভোগা এক স্থপতির দেখা মেলে। বনের প্রহরির মতো এই স্থপতিও পারছে না তার অনুশোচনাগুলো কারো সাথে শেয়ার করতে।

মানব চরিত্রের এই অন্তর্দশনগুলোই কলকাতার বাংলা ছবি ছত্রাক-এ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কাহিনী কাল্পনিক হলেও ঘটনাগুলো কলকাতার সমাজে বাস্তব। শ্রীলংকার খ্যাতনামা চিত্রপরিচালক বিমুক্তি জয়সুন্দরের এই ছবি কোন শ্রীলংকান পরিচালকের প্রথম বাংলা ছবি। আরো দু’জন শ্রীলংকার ভারতীয় ছবি পরিচালনা সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তারা মুলত তামিলভাষী ছবির সঙ্গে যুক্ত। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক পটভূমিতে বিচ্ছিন্নতাবোধ, স্বাধীনতা, টিকে থাকার লড়াই, পুঁজিবাদ, রাজনৈতিক দুর্নীতি ও অসহায়ত্বের মতো ধারণাগুলো জয়সুন্দর এক সুতায় গাঁথার চেষ্টা করেছেন। রূপালী ক্যানভাসে উপনিবেশোত্তর যুগে দক্ষিণ এশিয়ার জনজীবনের সমাজতাত্ত্বিক চিত্রাঙ্কনের সর্বশেষ নমুনা জয়সুন্দরের এই ছবি। ‘ছত্রাক’ ২০১১ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে মর্যাদাপূর্ণ ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট পুরস্কার জিতে। এ ছাড়াও টরেন্টো, প্যাসিফিক ম্যারিডিয়ান ও ভ্লাদিভস্টকসহ অনেক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিপুল সমাদৃত হয় এই ছবি।
সম্প্রতি কলম্বোতে এই ছবি প্রদর্শনীর পর এই লেখকের সঙ্গে কথা হয় চিত্রপরিচালকের। তিনি বলেন, ৯০ মিনিটের ছবি’র কাহিনী তিন সপ্তাহ সময়জুড়ে বিস্তৃত। ২০১০ সালে কলকাতা বিমানবন্দর থেকে সড়ক পথে যাওয়ার পথে নির্মাণাধীন এক আবাসিক এলাকার অবস্থা দেখে এমন ছবি তৈরির চিন্তা তার মাথায় আসে। “আমার মনে হলো এই ভবনগুলোর সঙ্গে কলকাতার বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর কোন সম্পর্ক নেই। অর্ধনির্মিত ভবনগুলোর পাশ দিয়ে স্থানীয় লোকজন তাদের গবাধিপশু নিয়ে নীরবে হেটে যাচ্ছে।”

অনেকটা আর্ট ফিল্মের আদলে ছত্রাক’র কাহিনী বাস্তবতা ও পরাবাস্তবতার মাঝামাঝি পথে এগিয়েছে। এতে কলকাতার জীবনকে ঘিরে ভারতের শহুরে মানুষের জীবনচিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

“২০১০ সালে আমি যখন প্রথম কলকাতায় আসি তখন এই নগরীর কিছু বিপরীতধর্মী দৃশ্য আমার নজরে পড়ে,” জয়সুন্দর বলেন। “এর একটি অংশ যেন এখনো সময়শূন্যতায় আটকে আছে। একশ’ বছর আগে এরকম দৃশ্য কল্পনা করা যেতো। সবকিছুই যেন জঙ্গলে যত্নহীন বেড়ে ওঠা ছত্রাকের মতো।”

সেই ১৯৯৬ সাল থেকে শর্টফিল্ম নির্মাণ করছেন জয়সুন্দর। ২০০৫ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে তার ছবি ’সুলাঙ্গা ইনু পিনিসা’ (পরিত্যাক্ত ভূমি) সেরা অভিষেক পরিচালকের পুরষ্কার পায়। শ্রীলংকার গৃহযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত এই ছবিতে আত্মজিজ্ঞাসা’র চেষ্টা করা হয়েছে। বহু দৃষ্টিকোণ থেকে যুদ্ধের পরিণতি বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে। ভারতের পুনে ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট ও ফ্রান্সের লে ফ্রেসনয় স্টুডিও ন্যাশলাল থেকে জয়সুন্দর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।