বাংলাদেশ : গোপন সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ

বাংলাদেশ : গোপন সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ

আজম খান,
শেয়ার করুন

‘মুঝে ভুখ লাগি হ্যায়, মুঝে খানা দে দো!’ স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে ছোট্ট মেয়েটি আর কিছু বললো না। গ্রাম থেকে আসা তার চাচা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন। ‘ও কী বলছে?’ তিনি জানতে চাইলেন, ‘ও কোন ভাষায় কথা বলছে?’ তার মা প্রশ্রয়পূর্ণ, এমনকি গর্বেরও বলা যায়, হাসি দিলেন। বললেন, ‘ও বাংলার চেয়ে হিন্দি ভালো পারে! ও আমার সাথে ইন্ডিয়ান সিরিয়াল দেখে, খুব তাড়াতাড়ি শিখে ফেলছে!’ চাচা ভ্রু কুচকালেন, ‘হিন্দি সিরিয়াল দেখার মতো বয়স কি ওর হয়ছে? ওকে কার্টুন দেখতে দিচ্ছ না কেন?’ ‘ওগুলোর সবই এখন হিন্দিতে,’ হেসে জবাব দিলেন মা।

এগুলো কোনো কাল্পনিক সংলাপ নয়। ঢাকার এক মধ্যবিত্ত পরিবারের বাসায় এমন ঘটনা ঘটেছে খুব বেশি দিন আগে নয়। দু:খের বিষয় হলো, ছোট্ট মেয়েটির দাদার দাদা ১৯৫২ সালে ছিলেন ভাষা আন্দোলনের কর্মী, তার দাদা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা।

বেড়াতে আসা চাচা যখন বিষয়টা সমর্থন করতে পারলেন না, তখন তার মা আত্মপক্ষ সমর্থন করলেন। ‘বিদেশি ভাষা শিখতে দোষ কোথায়? ইংরেজরা শেখে ফরাসি, ফরাসিরা শেখে জার্মান, আর এখানে আরো অনেক লোক শিখছে চীনা!’ চাচা আস্তে জবাব দিলেন, ‘কিন্তু সেগুলোতে নিজের মাতৃভাষাকে জলাঞ্জলি দিয়ে নয়।’

বাঙালি মননে ভাষা একটি অবিভাজ্য অংশ, জাতির সামাজিক-সাংস্কৃতিক আবরণ। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে সংগ্রাম করতে হয়েছিল, আর এর পরিণতিতে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। তারপরও ক্ষয় ধরেছে।
ফেব্রুয়ারি এলে লোকজন ভাষা-শহিদদের আত্মত্যাগের কথা বলে। মার্চ এলে স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে বড় বড় কথা হয়। ডিসেম্বর এলে বাংলাদেশের বিজয় নিয়ে আমরা আপ্লুত হই। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, একটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতি হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিতি কেবল একটি পতাকা এবং মানচিত্রের ওপর একটি স্থান পাওয়া নয়। এটা ঐতিহ্য, সম্মান সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের ব্যাপার, জাতীয় গর্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক দরবারে যাওয়ার বিষয়।

‘যেকোনো সমাজেই সব সময় সহজাত সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ থাকে,’ বলেন লেখক ও গবেষক তারেক আলী। ‘কিন্তু যখন বাইরের সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ স্থানীয় ঐতিহ্য ও রীতিনীতিকে পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে ফেলে, তখন বিপদ শুরু হয়। সাংস্কৃতিক ক্ষয় একটি সূক্ষ্ম আগ্রাসন এবং বিপজ্জনক বিষয়, আর সেটা পরিকল্পিত হলে আরো ভয়াবহ বিষয়।’

আঞ্চলিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সমীকরণে অর্থনৈতিক আধিপত্য অস্বাভাবিক কিছু না হলেও সত্যিকার অর্থে সাংস্কৃতিক আধিপত্যই কোনো জাতির ওপর প্রাধান্য বিস্তারের গোপন আঘাত।
বলিউড হয়তো দুর্বিনীত ও সুন্দর এবং তার চমক ও গ্লামার দিয়ে বিশ্বকে মোহিত করেছে, কিন্তু যখন এই বলিউডি সংস্কৃতি ঐতিহ্যের ওপর চড়াও হয়, তখন তা হয় দু:খজনক বিষয়। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি তার ঐতিহ্য, রীতিনীতি, প্রথার জন্য সুপরিচিত। বাঙালি মুসলমানের মননের জটিল ছাঁচের সৌন্দর্য হলো প্রার্থনা ও আত্মনিগ্রহের আধ্যাত্মিকতা লালন করেই তার মিউজিক, সঙ্গীত ও নৃত্য আত্মস্থ করার সামর্থ্য। একটাকে বাদ দিয়ে অপরটি গ্রহণ করা নয়। কিন্তু এখন বিয়ে অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী বিবাহসঙ্গীতের জায়গা স্থান পাচ্ছে হিন্দি ছবির কান ফাটানো মিউজিক। লোকজ নৃত্যের বদলে চলছে কোমর দোলানো চটুল ভারতীয় মুভির নাচ।

অন্যান্য উৎসবের মধ্যে ১ বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উৎসব। লোকজ মেলা, ভোরে রমনা পার্কে সঙ্গীত, মেয়েদের লাল ও সাদা পোশাক পরা, ছেলেদের পাঞ্জাবি-পায়জামা পরা ছিল দিনটির অবিচ্ছেদ্য অংশ। দোকানপাটে পুরনো হিসাব বন্ধ করে হালখাতা খোলা হতো, ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করানো হতো। এখন উৎসবে যুক্ত হয়েছে ভিন্ন উপাদান। প্রায় এক যুগ আগে হঠাৎ করে চালু হওয়া চারু কলা ইনস্টিটিউটের ছাত্রদের মিছিল হয়ে পড়েছে ‘ঐতিহ্য’। ‘মঙ্গল-যাত্রা’ নামের শোভাযাত্রাটিতে জাতির প্রাণ-প্রকৃতির সাথে না-মেলা কাগজের বাঘ, হাতি, পেঁচা এবং মঙ্গল-প্রদীপ (যা এখানকার মানুষের বিপুল বড় অংশের কাছে ধর্মবিরোধী হিসেবে পরিচিত) প্রচলন করা হয়। অধ্যবসায়ের ফল পাওয়া গেছে। এখন শোভাযাত্রাটি ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। বহির্বিশ্ব আমাদের নির্দেশনা দিচ্ছে, আমাদের ঐতিহ্য কোনটি, কোনটি ঐতিহ্য নয়। তাহলে শবে বরাতের পবিত্র রাতে হালুয়া-রুটি বিতরণ কেন ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেল না? অবশ্য এটা ইসলামি প্রথা নয়, একটু বেশি নিয়মনিষ্ঠরা একে প্রত্যাখ্যানই করে। কিন্তু তারপরও আমাদের নিজস্ব নয়, এমন সংস্কৃতির মতো শ্রদ্ধাও এর প্রতি দেখানো হয় না।

‘এজন্য প্রয়োজন হয় প্রতিবেশীর অনুমোদন’, স্পষ্টভাবে জানালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিজ্ঞানের ছাত্রী আসিয়া রহমান। ‘অবস্থা এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, আমরা যা-ই করি বা বলি না কেন, সেজন্য আমাদের শক্তিশালী প্রতিবেশীর অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। হিজাব পরার জন্য লোকজন আমার সমালোচনা করে। বলে, আমি মৌলবাদী হয়ে গেছি। অথচ আমার মা, দাদি এবং তার মা- সবাই বোরকা পরতেন। আমি বলবো, আমার পূর্বপুরুষদের চেয়ে আমি কম পরদা করি। আবার যখন আমরা বিয়েতে শাড়ির বদলে ভারতীয় লেহেঙ্গা পরি, তখন তা নিয়ে প্রচুর প্রশংসা করা হয়। এটা মারাত্মক ভন্ডামি।’
মিরপুরের বেনারসি পল্লী পরিদর্শনও হতাশাজনক ব্যাপার। আগে এখানে স্থানীয়ভাবে হাতে তৈরি চমৎকার সিল্ক কাতান, দারুণ জামদানি, টাঙ্গাইল সিল্ক, সুতি ইত্যাদি নানা ধরনের শাড়ি দেখা যেত। এমনকি ভারতীয় মুভি দেবদাসের খুবই সুন্দর ও ব্যয়বহুল শাড়িগুলো পর্যন্ত বেনারসি পল্লীর শিল্পীদের তৈরি ছিল। এখন দোকানদাররা স্বীকার করছেন, স্থানীয় পণ্যের চেয়ে ভারতীয় শাড়ির মজুত ও বিক্রি বেশি হচ্ছে তাদের। তারা ব্যাখ্যা করে জানান, কিভাবে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা সস্তায় তাদের শাড়ি দিয়ে বাজার ভাসিয়ে দিয়ে স্থানীয় প্রতিযোগিতাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। একবার স্থানীয় প্রতিযোগিতা শেষ হয়ে যাওয়ার পর ভারতীয় শাড়ির দাম বাড়তে থাকে। ততক্ষণে স্থানীয় শিল্পের ঘুরে দাঁড়ানোর সময় শেষ হয়ে গেছে।

স্থানীয় শিল্পপতি ও অর্থনীতি সবাই মনে করেন, এ ব্যাপারে সরকারের কঠোর নীতিমালা অবলম্বন করা উচিত। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি ব্যাপকভাবে এবং আসলে খুবই অদ্ভুতভাবে ভারতের অনুকূলে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা তাদের বৃহৎ প্রতিবেশীকে খুশি ও তার প্রশংসা করতে মরিয়া। আর ওই প্রতিবেশীও এর পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে। আর কেন নেবে না? বাংলাদেশিরা নিজেরা যদি নিজেদের স্বার্থ না দেখে, তবে কে দেখবে?
কোনো বাংলাদেশি যখন বিদেশে গিয়ে পোশাকের দোকানে গিয়ে ‘বাংলাদেশ তৈরি’ লেবেল দেখে, তখন তা হয় তার জন্য গর্বের বিষয়। কিন্তু দেশে ফিরে তার সেই গর্ব কোথায় যায়। আমাদের কথা বলা, পোশাক পরা, লেখা, গান, নৃত্য এবং এমনকি চিন্তার ধরনে কেন আমাদের জাতীয় পরিচিতি এত দ্রুত ম্লান হয়ে পড়ছে?

বিশ্বায়ন ও আঞ্চলিক সহযোগিতা একটি বাস্তবতা, বাংলাদেশ এ সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত রয়েছে। সব জাতিই এটা জানে। কিন্তু জাতীয় গর্ব, ঐহিত্য ও প্রথা আমাদের মাথা উঁচু রাখে, আমাদের স্বাধীন রাখে। আমাদের মাঝি নদী পাড় হওয়ার সময় বাতাসে তার ভরাট কণ্ঠ ছাড়ার সময় কি হিন্দি ছবির কর্কশ শব্দ উচ্চারণ করবে? নিশ্চয় নয়! এখনো হয়নি। হবেও না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পরিচিতি দুর্বার অহঙ্কার, ভালোবাসা আর সচেতন পরিচর্যায় সুরক্ষিত থাকবে।

print
শেয়ার করুন