‘সীমান্ত টেনে মানুষকে শ্রেণীবিভক্ত করা যায় না’

‘সীমান্ত টেনে মানুষকে শ্রেণীবিভক্ত করা যায় না’

এসএএম স্টাফ,
শেয়ার করুন

শাহবানু বিলগ্রামির কখনো বন্ধু ছিলো না, এমনটা ভাবাই যায় না। হাবভাবে যেন ‘পাশের বাড়ির মেয়ে’। হাসি মাখা মুখ, নম্র ব্যবহার – মন কেড়ে নেবে যে কোন মানুষের। ‘স্বপ্নহীন’ নামে বই লিখে এক দশক আগে যখন আন্তর্জাতিক সাহিত্যঅঙ্গনে পা রেখেছিলেন তখনই তার বইটি ‘ম্যান এশিয়া লিটারারি প্রাইজ’-এর তালিকায় যুক্ত হয়ে যায়। পাকিস্তান আবারো আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে সাহিত্যবিশ্ব। মহসিন হামিদ, কামিলা শামসি, মোহাম্মদ হানিফ, উজমা আসলাম খান ও দানিয়েল মঈনুদ্দিন খানের মতো লেখকদের বই তখন বেস্ট সেলিং তালিকায়। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বুকস্টলগুলোতে সবেমাত্র ভারতীয় সাহিত্যগুলো থেকে আলাদা করে পাকিস্তানী সাহিত্যের জন্য সেল্ফ বসানো শুরু হয়েছে। শাহবানু এসেই স্থান করে নিলেন ওই পাকিস্তানী বুকসেল্ফে।

তবুও একসময় হারিয়ে যেতে বসেছিলেন শাহবানু। শৈশব কাটানো মনট্রিল শহরে তিনি ফিরে যাবেন বলে কেউ কেউ ভেবেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রেও চলে যেতে পারতেন। পাকিস্তানী-কানাডিয়ান বা পাকিস্তানী-আমেরিকান লেখকদের মূল্যায়ন হয় না বলেও তিনি ভাবতে পারতেন। না এর কোনটিই তিনি করেননি। তিনি পাকিস্তান ফিরে যান। প্রথম উপন্যাস প্রকাশের পর দীর্ঘ বিরতির কারণে একসময় পাঠকের মন থেকেও হারিয়ে যেতে বসেছিলেন শাহবানু। এরপরই প্রবল বিক্রমে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। তার প্রথম বইয়ের মতো সর্বশেষ কাজ – ওইসব শিশুরা – এটিও একটি ফিকশন। কোনরকম ঢাকঢোল পেটানো ছাড়াই ভারতের বাজারে তা বিক্রি শুরু হয়। কিছুদিনের মধ্যেই মানুষ এই বইয়ের কেন্দ্রিয় চরিত্র ১০ বছরের বালিকা ফেরজানা’কে নিয়ে কথা বলা শুরু করে। মায়ের মৃত্যুর পর শিকাগো শহর থেকে করাচি ফিরে এসেছিলো যে মেয়ে। অনেক পাঠকের মতে শাহবানু’র কাজগুলো হবে বাইরে থেকে উঁকি দেয়া কোন দর্শকের মতো। আবার কেউ কেউ বলছেন, না, এগুলো শেকড়ে ফেরার আকুতি। যা-ই বলা হোক না তা শাহবানুর ওষ্ঠে হাসির আরেকটি পরত বুলায়। সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত জয়পুর সাহিত্য উৎসবে যোগ দেন এই পাকিস্তানী লেখিকা। সেখানে তার সঙ্গে ফ্রন্টলাইন পত্রিকার কথা হয়। সেই কথোপকথনের কিছুটা সাক্ষাতকার আকারে নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন: আপনি মন্ট্রিলে বেড়ে উঠলেও কিশোরী বয়সে করাচী ফিরে আসেন। আপনার প্রথম উপন্যাস ‘ওইসব শিশুরা’-এর নায়িকা ১০ বছর বয়সী কিশোরী ফেরজানা শিকাগো থেকে করাচি ফিরে এসে এক নতুন জগতের মুখোমুখি হয়েছিলো। উপন্যাসের চরিত্র কি আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন?

উত্তর: আমার গল্পে এক শিশুর কথা বলা হয়েছে যে পশ্চিমা জগতে বেড়ে উঠেছে, তার মাকে হারিয়েছে, এরপর পাকিস্তানে ফিরে এসে দেখে অন্যরকম জগত। হ্যাঁ, এটা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রায় অনুরূপ। কিন্তু এর বাইরে গল্পের গঠন, চরিত্র ও ধারণা পুরোপুরি ভিন্ন এবং একেবারেই কাল্পনিক। এরপরও আমার কিছু কিছু আত্মীয় কিছু চরিত্রে তাদেরকে খুঁজে পাবেন।

প্রশ্ন: আপনার প্রথম উপন্যাস ‘স্বপ্নহীন’-এ মূল চরিত্রের শৈশবকালের কথা বলা হয়। ‘ওইসব শিশুরা’তেও মূল চরিত্র এক ১০ বছরের কিশোরী। এই শৈশব থেকে আপনার গল্পগুলোকে বের করে আনার কোন পরিকল্পনা নেই।
উত্তর: শৈশব সবসময়ই আমাকে বিমুগ্ধ করে। এমনকি এখন আমি মা হওয়ার পরও। শিশুকাল নিয়ে লেখা বইগুলো আমাকে টানে। শিশুদের সান্নিধ্যেই আমার বেশির ভাগ সময় কাটে। তাদের সান্নিধ্য আমার বিষণœতা কাটায়। ‘ওইসব শিশুরা’ বইয়ে ফেরজানার বয়স ১০ হলেও মাহমুদের পরিবারের টানাপোড়েনের ব্যাপারে তার অন্ত:দৃষ্টি অনেক গভীর। কারণ পাকিস্তানে গোষ্ঠীদ্ব›দ্ব, রাজনীতি, চরমপন্থার মতো গুরুতর সমস্যাগুলোর ব্যাপারে তার প্রাথমিক অনুভুতি ছিলো একেবারে তরতাজা, কখনো বা হাস্যকর।

প্রশ্ন: আপনার দুটি উপন্যাসেই ১৯৭১ সালের যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে। একজন পাকিস্তানীর জন্য তা একটি ক্ষত। আপনার সাহিত্য কর্মের মধ্য দিয়ে এমন অনুভুতি’র প্রকাশ ঘটেছে?

উত্তর: কোনভাবে হয়তো আমি ১৯৭১ সালকে টেনে এনেছি। তবে যুদ্ধের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোন সংযোগ ছিলো না। এই ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে আমার জানাশোনা বইপত্র থেকে। তবে, মানবিক অনুভুতি থেকে এই যুদ্ধের ফলাফল, আবেগের সঙ্গে জড়িত প্রতিক্রিয়াগুলোর ব্যাপারে আসলেই আমি কৌতূহলী। এই যুদ্ধ সম্পর্ক ও পরিবারগুলোর ওপর কি ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে তা আমি জানতে চাই।
১৯৭১ সালকে উপজীব্য করে সম্প্রতি বেশ কিছু পাকিস্তানী উপন্যাস রচিত হয়েছে। তবে এটি এখনো আমাদের জন্য ক্ষত কিনা সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। আপনি যদি আমাদের দেশগুলো – ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ইতিহাস দেখেন তাহলে দেখবেন ‘১৯৭১’ প্রতিটি দেশকেই ব্যাপক প্রভাবিত করেছে। তাই আমাদের সবার সাহিত্যে তার উল্লেখ কোন অস্বাভাবিক বিষয় নয়।

print