মিয়ানমারে রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ড: গণতন্ত্রের সঙ্গে প্রতারণা

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ড: গণতন্ত্রের সঙ্গে প্রতারণা

জন রবার্টস,
শেয়ার করুন

বাংলাদেশ সীমান্তের ওপাশে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ও জাতীয়তাবাদি দুর্বৃত্তদের গুরুতর অপরাধ তদন্তে’র জন্য গত মাসে জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল (ইউএনএইচআরসি) একটি প্রস্তাব গ্রহণ করছে। ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে প্রকাশিত জাতিসংঘ রিপোর্টে মিয়ানমার বাহিনীর ‘শুদ্ধি’ অভিযানে গ্রামশুদ্ধ জালিয়ে দেয়া, গণহত্যা ও গণধর্ষণের বিবরণ দেয়া হয়েছে। গত অক্টোবরে কয়েকটি সীমান্ত ফাঁড়িতে কথিত রোহিঙ্গাদের হামলার জের ধরে এই নৃশংসতা শুরু হয়। সীমান্ত ফাঁড়ির হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ৯ সদস্য নিহত হয়। তখন থেকে ৭০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে গিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এতে দেশটিতে আশ্রয় নেয়া উদ্বাস্তু সংখ্যা ৩ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। আরো ১ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে অভ্যন্তরিণ বাস্তচ্যুতির শিকার হয়েছে।

জাতিসংঘ রিপোর্টে ব্যাপক অপরাধ সংঘটনের ইংগিত দেয়া হয়। জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের মতে অন্তত এক হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয় এবং অজ্ঞাত সংখ্যক মানুষ, বিশেষ করে ১৭-৪৫ বয়সী পুরুষ নিখোঁজ হয়েছে। বাংলাদেশের আলাদা আটটি উদ্বাস্তু শিবিরে ২শ’র বেশি রোহিঙ্গার সাক্ষাতকার নেয়া হয়। রাখাইন রাজ্যে গ্রাম ধ্বংসের বিষয়টি স্যাটেলাইটে তোলা ছবিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

অভিযানের ধরন দেখে বুঝা যায়, মিয়ানমারে সরকারের নিরবতার সুযোগে সেনাবাহিনীর দ্বারা একটি নিয়মতান্ত্রিক হত্যাপর্ব চলছে। দেশটি থেকে সকল রোহিঙ্গাকে বিতাড়ণ এর চূড়ান্ত লক্ষ্য।

ইউএনএইচসিআরসি’র প্রস্তাবটিকে ৪৭ জাতির নেয়ার একটি যাচ্ছে তাই আপোস বলা যায়। মিয়ানমারে মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াং লি, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার জায়েদ রাদ আল-হুসেইন এবং আরো ১৩টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা যে তদন্ত কমিশন (সিওআই) গঠনের আহবান জানিয়েছিলো তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তার বদলে ইউএনএইচসিআরসি সেখানে একটি ‘সত্যানুসন্ধানী মিশন’ পাঠাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিকদের দেয়া প্রস্তাব গ্রহণ করে।

‘জরুরিভিত্তিতে’ এই মিশনে ফরেনসিক ও যৌন নির্যাতন বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয় যেন ‘অপরাধিদের জবাবদিহিতা ও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ন্যায়বিচার পরিপূর্ণভাবে নিশ্চিত করা যায়।’ এই প্রস্তাবে, পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে ‘গণতন্ত্রের প্রতীক’ অং সাং সুচি’র নেতৃত্বাধিন সামরিক-এনএলডি হাইব্রিড সরকারের কাছ থেকে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। এই ‘জরুরি’ তদন্ত আগামী সেপ্টেম্বরের দিকে একটি প্রাথমিক রিপোর্ট দেবে এবং পূর্ণ রিপোর্ট আগামী বছর পাওয়া যাবে।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দেয়া রিপোর্টে জাতিসংঘের দূত লি ২০১২-২০১৪ সালে একইভাবে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানেরও তদন্ত দাবি করেন। সে সময়ে একইভাবে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করা হয় এবং বর্তমান মাত্রায় অপরাধ সংগঠিত হয়।

সুচি’র ভূমিকা আড়াল করাই ছিলো জেনেভায় ইইউ কূটনীতিকদের উদ্দেশ্য। লি গত মাসে সাংবাদিকদের বলেছেন, ইইউ নেতারা পুরোদস্তুর তদন্ত শুরুর আগে সুচিকে আরো সময় দিতে চান। প্রথমদিকে তারা এমন কোন ধরনের তদন্তেরই বিরোধিতা করছিলেন যেখানে মিয়ানমারের নিজস্ব তদন্তের পূর্ণ অংশগ্রহন থাকবে না।

প্রায় অর্ধ শতাব্দিকাল দেশের ক্ষমতায় থাকা নিষ্ঠুর স্বৈরশাসকদের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে সুচি’র এনএলডি এখন দেশ চালাচ্ছে। গত বছর এপ্রিলে সেনাবাহিনীর ‘ইউনাইটেড সলিডারিটি এন্ড ডেভলপমেন্ট পার্টি’র সরকার থেকে এনএলডি ক্ষমতা গ্রহণ করলেও গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়গুলো জেনারেলদের হাতে থেকে যায়।

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন চালানোর ক্ষেত্রে এনএলডি ও সেনাবাহিনী উভয়ই দায়ি। বৌদ্ধ নিয়ন্ত্রিত বার্মার রাজনৈতিক প্রশাসনে এদেরই একচেটিয়া আধিপত্য। রোহিঙ্গারা বহু প্রজন্ম ধরে মিয়ানমারে বাস করছে। অথচ দেশটির সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না। সরকারিভাবে এরা বাংলাদেশ থেকে আসা ‘অবৈধ অভিবাসী’। এই জনগোষ্ঠীর জন্য সেখানে এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরী করে রাখা হয়েছে।

ইউএনএইচআরসি’র প্রস্তাবের ব্যাপারে মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন মহলের প্রতিক্রিয়া ছিলো আগের মতোই। প্রস্তাবটি গ্রহণের আগেই এর সমালোচনা করে জেনেভায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ থিন লিন বলেন: ‘যা করার প্রয়োজন আমরা তা-ই করবো।’

ওই প্রস্তাব গ্রহণের একদিন পর মিয়ানমারের পররাষ্ট্র দফতর থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয় যে তারা এই প্রস্তাবের সঙ্গে পুরোপুরি দ্বিমত পোষণ করছে। পররাষ্ট্র দফতর আরো জানায়, কোন আন্তর্জাতিক তথ্যঅনুসন্ধানি দল পাঠানো হলে তা সমস্যা নিরসনের পরিবর্তে ক্ষোভ আরো উসকে দেবে।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চলাকালে সুচি ছিলেন লক্ষ্যনীয়ভাবে নীরব। তার এই নীরবতাকে সেনাকর্মকাণ্ডের র প্রতি সমর্থনের নামান্তর বলে মন্তব্য করে বিবিসি। সুচি রাখাইনে কোন ‘জাতিগত নির্মূল’ অভিযানের কথা অস্বীকার করেন। বরং জোর দিয়ে বলেন, সেনা অভিযানের প্রতি তার সরকারের সমর্থন রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যেখানে খুশি গিয়ে যুদ্ধ করার স্বাধীনতা তাদের রয়েছে এবং সংবিধানেও আছে যে সেনাবাহিনীর বিষয়গুলো তারাই সামাল দেবে।’

সরকারে থাকা সিনিয়র সেনা অফিসারদের মনোভাব অনুসরণ করেই সুচি কথা বলেছেন। সেনা প্রধান জেনারেল মিং অং হলাইং-এর নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও সীমান্ত নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়। মিয়ানমারে জাতিসংঘের যে কোন ধরনের হস্তক্ষেপের নিন্দা জানান সেনাপ্রধান। তার কথা রোহিঙ্গারা বাঙ্গালি, তারা মিয়ানমারের কেউ নয়। তাই মিয়ানমারে থাকার কোন অধিকার তাদের নেই।

কি ধরনের তদন্ত চালানো হবে সে বিষয়ে ইউএনএইচআরসি’র যুক্তিতে রোহিঙ্গা বা অন্য কোন জনগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে কোন কথা ছিলো না। তাই মিয়ানমারের বক্তব্য দেশটিতে অর্থনৈতিক ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের মধ্যে সংঘাতের বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছে।

গত বছর এপ্রিলে এনএলডি’র সরকার গঠন ছিলো জেনারেলদের সঙ্গে দলটির অশুভ আঁতাদের চূড়ান্ত প্রকাশ। ২০১১ সালে এই আঁতাত শুরু হয়েছিলো। ওবামা’র আমলে এই আঁতাত দৃঢ় হয়। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার যাতাকল ও অর্থনৈতিকভাবে চীনের ওপর অতিনির্ভরতা থেকে জান্তার বেরিয়ে আসার প্রয়োজন ছিলো। বছরের পর বছর নির্যাতনে পিষ্ঠ হয়ে মিয়ানমারের এলিট শ্রেনীর প্রতিনিধি সুচি ও এনএলডি সেনাবাহিনীকে জুনিয়র পার্টনার হিসেবে মেনে নিয়ে গণতন্ত্রের বাতাবরণে একটি হাইব্রিড সরকার প্রতিষ্ঠায় রাজি হয়।

এই ব্যবস্থা দু’পক্ষের জন্যই ছিলো সুবিধাজনক। পশ্চিমাদের জন্য মিয়ানমার এতদিনে সস্তা শ্রম ও খনিজ সম্পদের আধারে পরিণত হয়েছে। ওবামা প্রশাসন চীনের ওপর থেকে মিয়ানমারের নির্ভরতা কমাতে এগিয়ে আসে এবং চীনকে ঘেরাও পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সেখানকার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে।

ইইউ দ্রুত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং দ্রুত দেশটির সঙ্গে লেনদেন শুরু করে। ইইউ’র উদ্যোগ এতটাই দ্রুত ছিলো যে ওয়াশিংটনে অনেকের পরিকল্পনাকেও তা ছাড়িয়ে যায়। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলো মিয়ানমারকে এক ‘নতুন দিগন্ত’ হিসেবে দেখতে পায়। এখানকার অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ ও সস্তা শ্রম তাদেরকে প্রচুর মুনাফার হাতছানি দেয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে মিয়ানমারসহ যেকোন স্থানে মানবাধিকার লংঘন ইস্যুটির সঙ্গে বিদ্রুপ করে। অথচ রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর নৃশংসতার তদন্তই ছিলো সেখানকার শাসকদের সুপথে আসনে চাপ সৃষ্টির একটি অন্যতম উপায়।

 

SOURCEwsws.org
শেয়ার করুন