পহেলা বৈশাখ উদযাপন: মিশে আছে জাতীয় পরিচয়, গৌরব ও প্রতিবাদ

পহেলা বৈশাখ উদযাপন: মিশে আছে জাতীয় পরিচয়, গৌরব ও প্রতিবাদ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী,
শেয়ার করুন

পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ। আমাদের অর্থনৈতিক ইতিহাসের অংশ। একটি আঞ্চলিক উৎসবও বটে। আমাদের এই অঞ্চলের যেখানে বর্ষা ঋতুর আগমন ঘটে সেখানেই এই উৎসব। পাঞ্জাবে বৈশাখ উযযাপিত হয়। উদযাপিত হয় বাংলায়, এমনকি থাইল্যান্ডেও। এই অঞ্চলজুড়ে ভাটি এলাকায় পহেলা বৈশাখ উযযাপন করা হয়।

পহেলা বৈশাখ আমাদের প্রাকৃতিক অর্থনীতির ইতিহাসের একটি অংশ। কারণ এতে একই সঙ্গে প্রকৃতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জড়িয়ে আছে। নতুন বছরের আগমন উপলক্ষে চাষীদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে হতো। তাই চাষীকূলের জন্য এটি আনন্দের কোন বিষয় ছিলো না। বৈশাখে মুখ ব্যাদান করে আসে তীব্র গরম, শুষ্ক আবহাওয়া, খরা। চাষা-কৃষকদের জন্য কোনভাবেই তা সুখকর উৎসব ছিলো না।

তবে হ্যা, মধ্যবিত্ত শ্রেণী একে উৎসবে পরিণত করেছে। এটা ব্যবসায়ী ও ভূমির মালিক জমিদারদের জন্য লাভজনক ছিলো। এ সময় জমিদাররা খাজনা পেতো, ব্যবসায়ীরা হালখাতা খুলে তাদের বকেয়া আদায় করতো। তারা আগের সব পাওনা বুঝে নিয়ে নতুনভাবে সবকিছু শুরু করতো।

বৃটিশ আমলে পহেলা বৈশাখ উদযাপন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের রূপ নেয়। তখন থেকে এই অঞ্চলের মধ্যবিত্ত শ্রেণী পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে তাদের সংস্কৃতির অংশ করে নেয়। এতে ঔপনিবেশিকতাবাদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঔপনিবেশবাদিরা ইংরেজি নববর্ষের ‘থার্টিফাস্ট নাইট’ উদযাপন করতো। তাই পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়, গৌরব ও প্রতিবাদ মিশে আছে।

পাকিস্তান আমলে আমরা আবারো আগের অবস্থানে ফিরে যাই। পাকিস্তানীদের হামলা ছিলো বাঙ্গালি সংস্কৃতির ওপর। রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করা হলো, বেতার-টেলিভিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ হলো। পরিমার্জনা শুরু হলো কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা হলো। বৃটিশ আমলে শুরু হওয়া জাতীয়তাবাদি আন্দোলনটাই ফের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আরো বেগবান হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে যুক্ত হলো পহেলা বৈশাখ। পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ থেকে আমরা একটি সেক্যুলার অবস্থানে চলে আসি।

পহেলা বৈশাখ একটি সেক্যুলার উৎসব – এটা ঠিক। বাঙ্গালি’র জীবনে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত বহু উৎসব-পার্বন রয়েছে। হিন্দুদের এক ধরনের উৎসব, মুসলমানদের আরেক ধরনের। কিন্তু এই এক জায়গার ধর্মের উর্ধ্বে উঠে সব বাঙ্গালির মিলন ঘটে। আবার ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে নব্য-উপনিবেশিকতাবাদ তথা পাঞ্জাবি আধিপত্যের বিরুদ্ধে আমরা অবস্থান নিয়েছি – ওই জায়গাটিও কিন্তু আছে। এটা দেশপ্রেম, জাতীয়তবাদ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত।

একই সঙ্গে আমাদের পরিচয়টিও সংজ্ঞায়িত হয়ে গেলো। আমরা জানিয়ে দিলাম এটা জোর-যুলুমের বিরুদ্ধে। এছাড়া পুঁজিবাদের প্রবল চাপতো ছিলোই। ১ জানুয়ারি থেকে ইংরেজি নববর্ষের সূচনা। আমাদের অর্থবছরের শুরু জুলাইয়ে। কিন্তু ১ জানুয়ারি থেকে পঞ্জিকা বর্ষ শুরু হয়; স্কুল-কলেজেরও শুরু এই দিন থেকে।

গুগল ডুডলে পহেলা বৈশাখ

এখন থার্টিফার্স্ট নাইট আবার ফিরে এলেও তা অন্যভাবে এসেছে। পুঁজিবাদের সঙ্গে এর যুক্ত হওয়ার বিষয়টি আমার কাছে খুব তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়। এমন কি একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের ঢংও বদলে গেছে। ঢাকায় খুব ভোরে প্রভাত ফেরির মধ্য দিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি পালন শুরু হতো। ১৯৭০ সালে জাতীয়তাবাদি আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন আওয়ামী লীগের লোকেরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারির ১২টা ১ মিনিটে শহীদ মিনারে গিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পন করলো। এর তাৎপর্য হলো বঙ্গবন্ধুকে উচ্চ আসনে বসানো। সকালে প্রভাত ফেরিতে গেলে তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে একাকার হয়ে যেতে পারেন বলে হয়তো ভাবা হয়েছিলো।

এটা হলো রাজনীতি। তবে এর একটি সাংস্কৃতিক তাৎপর্যও আছে। যে পুঁজিবাদি বিশ্বকে আমরা তুচ্ছ করেছি, ভাষা আন্দোলনও যাকে স্পর্ধা দেখিয়েছে — তার কাছেই যেন আমরা আত্মসমর্পন করেছি। ওই ১২টা ১ মিনিটকেই আমরা নিয়ে এলাম।

বাঙ্গালির আর সব অনুষ্ঠান খুব ভোরে শুরু হয় — পাখির কলতানে, ঊষার উদয়ের মধ্য দিয়ে। পহেলা বৈশাখেরও সূচনা সূর্যোদয়ের মুহূর্তে, একুশে ফেব্রয়ারিও তাই। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে এখন পুঁজিবাদ তার স্থান করে নিয়েছে। পুঁজিবাদের জন্যই থার্টিফার্স্ট নাইটের আয়োজন। আবার পহেলা বৈশাখও উদযাপিত হচ্ছে। একুশে ফেব্রুয়ারির আগে এখন চলে এসেছে ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’। নিতান্তই পুঁজিবাদি একটি বিষয় এই ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’। দিনটি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এই একুশে’র মাসে পহেলা ফাল্গুনও উদযাপন করা হচ্ছে। কিন্তু শেষোক্তটির সঙ্গে একুশে’র চেতনার কোন মিল নেই। ফাল্গুনের আয়োজনটা হচ্ছে উৎসবের। এর সঙ্গে ফুল ব্যবসায়ী, বস্ত্র ব্যবসায়ী, প্রসাধন ব্যবসায়ী, মেলার ব্যবসায়ীদের যোগ আছে। কিন্তু একুশে’র চেতনা পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে, জাতীয়তাবাদের পক্ষে। এভাবেই ঘটনাগুলোকে দেখা যেতে পারে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, লেখক, সমালোচক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক।

শেয়ার করুন