পররাষ্ট্রনীতি’র হাতিয়ার হিসেবে বৌদ্ধধর্মকে ব্যবহার করছে সবাই: ভারত-চীন-শ্রীলংকা, এমন কি পাকিস্তানও

পররাষ্ট্রনীতি’র হাতিয়ার হিসেবে বৌদ্ধধর্মকে ব্যবহার করছে সবাই: ভারত-চীন-শ্রীলংকা, এমন কি পাকিস্তানও

শেয়ার করুন
বুদ্ধগয়ায় ধ্যান করছেন মোদি, ছবি: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

খৃষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে ভারতের বৌদ্ধ ধর্মের উন্মেষ। পরবর্তী শতকগুলোতে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই ধর্মের বিস্তার ঘটে এবং সপ্তম শতাব্দিতে ইসলাম আগমনের আগ পর্যন্ত এটাই ছিলো এই অঞ্চলের প্রভাবশালী ধর্ম। আফগানিস্তানে ইসলাম ব্যাপক প্রভাব বিস্তারের পর তা ভারতীয় উপমহামদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক অংশে ছড়িয়ে পড়ে।

বর্তমানে না ভারত, না চীন; এমন কি ভারতের পুরনো অংশ পাকিস্তানও কোন বৌদ্ধধর্মাবলম্বী রাষ্ট্র নয়। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীরা জনসংখ্যার এক শতাংশেরও কম। বিপরীতদিকে, চীনে কোটি কোটি মানুষ বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারি। কিন্তু চীন রাষ্ট্রটি কমিউনিস্ট; সোজা কথায় ধর্ম-বিরোধী না হলেও ধর্মহীন। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে বৌদ্ধরা আর অবশিষ্ট নেই।

তবে, এই তিনটি দেশই এশিয়ার বৌদ্ধ সংখ্যাগুরু রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের জন্য তাদের অতীত বৌদ্ধ বিশ্বাস  ও বৌদ্ধ যুগের পুরানিদর্শনগুলো ব্যবহার শুরু করেছে।

এই অঞ্চলে শ্রীলংকার মতো কিছু দেশ বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে সংযোগ থাকা দেশগুলো যেমন: ভারত, পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের জন্য প্রাচীন বৌদ্ধ-সংযুক্তির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। আর, “নমনীয় শক্তি” ও “গণ কূটনীতি”র এই যুগে যখন সংস্কৃতি, শিল্প, ঐতিহাসিক সংযোগ ও ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে, তখন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারের জন্য বৌদ্ধ ও অন্য ধর্মগুলোকে ব্যবহারও বৈধ কূটনৈতিক চর্চা হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

১২ থেকে ১৪ মে আন্তর্জাতিক ভেসাক দিবস উদযাপিত হবে শ্রীলংকায়। জাতিসংঘের সমর্থনে ও শ্রীলংকা সরকারের উদ্যোগে এই উৎসব হবে স্বাগতিক সরকারের পাশাপাশি অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর পক্ষ থেকেও গণ কূটনীতির এক প্রদর্শনী। বুদ্ধের জন্ম, বোধন ও অন্তর্ধানের স্মরণে ১২ মে কলম্বোতে এই উৎসবের উদ্বোধন করবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর, ১৪ মে ক্যান্ডিতে সমাপনী উৎসবে সভাপতিত্ব করবেন নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভান্ডারি।

ভারত ও চীনসহ উৎসবে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর বেশিরভাগই বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। তারা “বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য”– এই মূল ভাবের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে নিজ নিজ দেশের বৌদ্ধবাদকে অনন্য উপায়ে তুলে ধরতে উৎসবস্থলে দৃষ্টিনন্দন স্টল বা প্যান্ডেল নির্মাণ করছে।

ভারত-শ্রীলংকা

অনেক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইস্যু শ্রীলংকা ও ভারতকে বিভক্ত করে রাখলেও বৌদ্ধধর্ম একটি ঐক্যের উপাদান। খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সম্রাট অশোকের পুত্র যুবরাজ মাহিন্দার মাধ্যমে শ্রীলংকায় বৌদ্ধ ধর্মের আগমণ। মগধ থেকে বিহার পর্যন্ত বিশাল রাজ্যের অধিপতি ছিলেন অশোক। পরবর্তী শত শত বছর বাণিজ্যিক সম্পর্ক এই দুই দেশের বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সংযোগ ক্রমাগত দৃঢ় করেছে। আজো প্রতিবছর দুই লাখের বেশি শ্রীলংকান ভারতে বৌদ্ধতীর্থগুলো ভ্রমণে যায়। কারণ, গৌতমবুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংযোগের স্থানগুলো শুধু ভারতেই রয়েছে। এখানেই তার জীবন কাটে, তিনি ধর্মের প্রচার করেন এবং জীবনাবসানও ঘটে এখানেই। আর এটাই ভারতের একটি ‘ইউনিক সেলিং প্রোপজিশন’ (ইউএসপি)।

তবে, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহরলাল নেহেরুই সবার আগে দেশটির বৌদ্ধ ঐহিত্য বিশ্বের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস চালান। তিনি ১৯৫৬ সালে আন্তর্জাতিক রূপ দিয়ে বৌদ্ধ জয়ন্তি উৎসবের আয়োজন করেন। আর, নয়া দিল্লি তার কূটনীতির অস্ত্রাগারে নতুন অস্ত্র হিসেবে “গণ কূটনীতি”র সংযোজন ঘটায় ২০০৬ সালে। ভারতের “গণ কূটনীতি”র অংশ হিসেবে বৌদ্ধ ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

২০১২ সালে ভারত বুদ্ধে’র কপিলাবস্তু পুরানিদর্শনগুলো নিয়ে শ্রীলংকার বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এই প্রচেষ্টা বেশ সফল হয়েছিলো। প্রধানমন্ত্রী মোদি পররাষ্ট্র নীতিতে বৌদ্ধধর্মকে ব্যবহারের জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছেন। ভারতের অসংখ্য বৌদ্ধতীর্থকে বিদেশী পর্যটক আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত করার পাশাপাশি তার “পূর্বমুখি নীতি” চাঙ্গা করতে ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছেন। তাই মোদি এ বছরের আন্তর্জাতিক ভেসাক উৎসবের প্রধান অতিথি হতে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট মৈত্রিপালা সিরিসেনার আমন্ত্রণ উৎসাহের সঙ্গে গ্রহণ করায় তাতে বিস্ময়ের কিছু ছিলো না।

একজন হিন্দুত্ববাদি বা হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের প্রবক্তা হলেও মোদির সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের যোগাযোগ বহুদিনের। (বুদ্ধগয়া এবং বিহার ও উত্তরপ্রদেশের পূর্বাঞ্চলে বিভিন্ন এলাকা’র বাইরে) তিনি ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে এই রাজ্যকে বৌদ্ধ তীর্থভূমিতে পরিণত করেন। অনেকটা গর্বের সাথে মোদি বলে থাকেন যে তার নিজ শহর ভাদনগর প্রাচীনকালে ছিলো বৌদ্ধধর্মের একটি প্রতিষ্ঠিত বিদ্যাপীঠ। বৌদ্ধ ধর্মকে বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সেখানকার বারুচ বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঘটনাক্রমে শ্রীলংকার সঙ্গে বারুচের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য সম্পর্ক ছিলো। গুজরাটি বণিকদের মাধ্যমে শ্রীলংকায় বৌদ্ধধর্মের আগমন ঘটে।

প্রাচীনকালে বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলো এমন পুরাতাত্ত্বিক ভবনগুলো খুঁড়ে বের করে তা সংরক্ষণের জন্য মোদি গুজরাট পুরাতত্ত্ব বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

২০১০ সালে গুজরাটে বৌদ্ধ ঐতিহ্যের ওপর এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে মোদি বলেন: “বৌদ্ধ ধর্ম ও গুজরাটের মধ্যে সম্পর্ক গৌতমবুদ্ধের জীবনকালের মতোই পুরনো। ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে বৌদ্ধধর্ম প্রসারে গুজরাটের ব্যবসা ও বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই গুজরাট এবং বিশেষ করে বারুকাচ্চা (আধুনিককালের বারুচ) বন্দরের নাম প্রাচীন বৌদ্ধ সাহিত্যে বার বার উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাচীনকালে বেনারস ও বৈশালির মতো বৌদ্ধকেন্দ্রগুলো থেকে আসা বণিক ও তাদের বাণিজ্যবহরের মাধ্যমে গুজরাটে বৌদ্ধধর্মের বিস্তার ঘটে।”

এই সেমিনারে দালাই লামা যোগ দিয়েছিলেন।

মোদি আরো বলেন, “অশোক শাসনামলে গুজরাটে কিভাবে বৌদ্ধধর্মের বিস্তার ঘটেছে তা জুনগাধ-এর অশোক প্রস্তরে উৎকীর্ণ রয়েছে। গ্রীক, পার্থো-সাইথিয়ান, সাতবাহানা, বোধি রাজবংশ, কেসাতরাপাস ও সাকা শাসকদের আমলে বৌদ্ধধর্মের অনেক পাথরে খোদাই করা নিদর্শন গুজরাটে আসে। এর বহু এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।”

“মাইতরাকা রাজাদের সময় গুজরাটে ১৩ হাজারের বেশি বৌদ্ধভিক্ষু ছিলেন। আমাদের একটি বিশাল বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো। এটি ছিলো গুজরাটের বল্লভিপুরের ‘বল্লভি বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়’।

“ ‘শান্তিদেব’-এর দেশ গুজরাট, ‘বোধচারিয়াভাটারা’ তার বিস্ময়কর লেখনি। এটি সংস্কৃত ভাষায় বৌদ্ধধর্মের ওপর লেখা অসাধারণ এক গ্রন্থ। এটি বোধিসত্ত্ব জানার এক উৎকৃষ্ট উপায়।

“গুজরাটের সমৃদ্ধির কথা হিউয়েন সাং লিখে গেছেন। এখানকার পণ্যগুদামগুলো ছিলো পরিপূর্ণ। আর বণিকরা বিস্তৃত পরিসরে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। এখানেই ধর্মগুপ্ত, শ্রীমাথি ও গুনামাথির মতো খ্যাতনাম বৌদ্ধ পান্ডিতদের অবদান রয়েছে।”

“চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং বারুজ, কুচ, বল্লভিপুর, সুরাষ্ঠারাসহ ভাদনগর ব্যাপকভাবে সফর করেন। গুজরাটে হাইনাইয়ান ও মাহায়ানা দুটিই অনুশীলন করা হতো।”

বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে হিন্দুবাদের সংযোগ

মজার বিষয় হলো বৌদ্ধধর্মের প্রতি মোদি’র আগ্রহ সৃষ্টির হয় যখন তিনি কট্টর হিন্দুবাদি সংঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) একজন পূর্ণকালিন কর্মী।

মোদির বর্তমান দল ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ (বিজেপি)’র আধ্যাত্মিক গুরু আরএসএস ও হিন্দু মহাসভা তাদের হিন্দুত্ব সংস্করণে বৌদ্ধবাদকে যুক্ত করেছে। আরএসএস মনে করে বৌদ্ধবাদ হলো “হিন্দুবাদেরই সংস্করণকৃত রূপ” এবং এটি ভারতের প্রভাব বিস্তৃত করার এক মোক্ষম হাতিয়ার।

আরএসএস নেতা ভি ডি সভারকর বিষয়টি “হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্ম” হিসেবে চিত্রায়িত করেন। তিনি বলেন, ভারতের ধর্ম হলো ‘হিন্দু-বৌদ্ধবাদ’। তিনি এশিয়াকে “হিন্দু-বৌদ্ধ” ধর্মের অনুসারি বলে বর্ণনা করেন।

২০১৬ সালে জার্নাল অব কারেন্ট চায়নিজ এফেয়ার্সে লেখা এক নিবন্ধে ড. ডেভিড স্কট বলেন যে মোদি হলেন প্রথম ভারতীয় নেতা যিনি “গণ কূটনীতি”র অংশ হিসেবে বৌদ্ধধর্মকে “নমনীয় ক্ষমতা” হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন।

২০১৫ সালে মোদি বলেছিলেন, “বিশ্বব্যাপী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে ভারত তার মহান ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে কাজে লাগাবে। এটা হবে অনেক গভীর, অনেক ব্যক্তিগত ও অনেক বেশি শক্তিশালী। গৌতম বুদ্ধ যেসব দেশের সংস্কৃতির অংশ তাদের সঙ্গে ভারতের বন্ধন রয়েছে এবং এই বন্ধনকে কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।”

ড. স্কট বলেন, “গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী মোদি প্রাচীন বৌদ্ধ পুরানিদর্শনগুলো খুঁজে বের করতে ব্যক্তিগতভাবে আগ্রহ দেখিয়েছেন। তিনি বৌদ্ধদের অনুষ্ঠানগুলোতে যেতেন। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে গুজরাটে বৌদ্ধ ঐতিহ্যের ওপর সেমিনারের আয়োজন করা হয়। আধুনিককালে বৌদ্ধ ধর্মের ‘প্রাসঙ্গিকতা’ তিনি তুলে ধরেন।”

২০১৪ সালে এক টুইটবার্তায় মোদি লিখেন: “বুদ্ধপূর্ণিমায় আমরা প্রভু বুদ্ধকে নমস্কার জানাই। যার শিক্ষা শত শত বছর ধরে গোটা মানবতাকে দিক নির্দেশনা দিয়েছে।”

এ কারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ অনুষ্ঠানগুলোতে যোগ দিতেন। ২০১৫ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক বুদ্ধিস্ট কনফেডারেশন আয়োজিত আন্তর্জাতিক বুদ্ধপূর্ণিমা দিবস উৎসব (ভেসাক) – এ তিনি প্রধান অতিথি হয়েছিলেন।

স্কট যুক্তি দিয়ে বলেন, “মোদি প্রকাশ্যে বলেন যে বুদ্ধ ছিলেন একজন সংস্কারক, তার শিক্ষাগুলো হিন্দুবাদের মধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে। এ কথা বলে বৌদ্ধধর্মের স্বতন্ত্র স্বত্বা খাটো করা হয়েছে। কিন্তু এতে মোদি তার হিন্দুবাদকে আরো ভালোভাবে তুলে ধরতে বুদ্ধকে ব্যবহার করতে পারছেন। এর ফলে বৌদ্ধধর্মের ওপর ভারতের মনযোগের বিষয়টিও একটি রূপ পাচ্ছে।”

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে ‘গ্লোবাল হিন্দু-বুদ্ধিস্ট ইনিশিয়েটিভ অন কনফ্লিক্ট এভয়েডেন্স এন্ড এনভায়রনমেন্ট কনসাসনেস’ আয়োজনে মোদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তিনি বলেন, “আপনারা এমন এক দেশ সফর করছেন যেটি তার বৌদ্ধ ঐতিহ্য নিয়ে অতিশয় গর্বিত। আসিয়ান দেশ থেকে এখানে তীর্থযাত্রীরা আসেন। আসেন চীন, কোরিয়া, জাপান, মঙ্গোলিয়া ও রাশিয়া থেকেও। ভারতজুড়ে বৌদ্ধ ঐতিহ্য তুলে ধরতে আমার সরকার সম্ভাব্য সবকিছু করছে। এশিয়াজুড়ে বৌদ্ধ ঐতিহ্য জোরদার করার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে ভারত।”

স্কট জানান, অনুষ্ঠানের তৃতীয় দিনে মোদি বুদ্ধগয়াগামী প্রতিনিধি দলের সঙ্গে যোাগ দেন। সেখানে তিনি পবিত্র বোদিবৃক্ষের নীচে একটি মেডিটেশন (ধ্যান) সেশনের নেতৃত্ব দেন। এই বোদিবৃক্ষের নীচে বসেই গৌতম বুদ্ধ জ্ঞানালোকপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। এর আগে স্বামী বিবেকানন্দ বুদ্ধকে হিন্দুবাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন বলে মোদি উল্লেখ করেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে ভারতকে “বৌদ্ধ ভারত” বলার ওপর জোর দিতেন। বুদ্ধের সকল মূল্যবোধ ও শিক্ষা আত্মস্থ করেছিলেন তিনি। হিন্দু ধর্মী পণ্ডিতরাও তাদের সাহিত্যে বুদ্ধের শিক্ষা সংযুক্ত করেছেন বলে মোদি দাবি করেন।

মোদি বলেন, বৌদ্ধ ধর্ম ভারত জাতির মুকুটের একটি রত্ম-বিশেষ। বৌদ্ধধর্মের প্রসারের পর হিন্দু ধর্ম ‘বৌদ্ধবাদি হিন্দু’ অথবা ‘হিন্দুবাদি বৌদ্ধ’ ধর্মে পরিণত হয়েছে।

চীনের সহমর্মিতা পেতে বৌদ্ধধর্মকে ব্যবহার

২০১৪ সেপ্টেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলতে ‘বৌদ্ধবাদের উত্তরী’ ব্যবহারের চেষ্টাও করেছিলেন মোদি।

মোদি বলেন: “৬ষ্ঠ শতাব্দিতে ভিক্ষু হিউয়েন সাং চীন থেকে ভারত এসেছিলেন। তিনি গুজরাটের যে গ্রামে গিয়ে থেকেছেন সেখান থেকেই আমি এসেছি। বৌদ্ধবাদের মধ্য দিয়ে ভারত ও চীন, বিশেষ করে চীন ও গুজরাট, অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।”

প্রেসিডেন্ট শি’র গুজরাট সফরকে মোদি ‘বিশেষ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে’ বলে উল্লেখ করেন। শি’র সফর শেষে প্রকাশিত যৌথ ইশতেহারে বলা হয় যে পথে হিউয়েন সাং ভারত সফরে এসেছিলেন সেই পথ ধরে পর্যটন উন্নয়নে চীন ভারতকে সহায়তা দেবে।

শি ২০১৫ সালের মে’তে মোদি’র আগ্রহের প্রতিদান দেন। তিনি মোদিকে শিয়ান-এর শে^তহংস মন্দির (হোয়াইট গুজ টেম্পল)-এ নিয়ে যান। হিউয়েন সাং ভারত সফর শেষে এখানে ফিরে এসেছিলেন। এর পর হিউয়েন সাং (যিনি হুয়ান জাং নামেও পরিচিত) লুয়াইং গিয়ে সেখানকার হোয়াই হর্স টেম্পলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন তিনি।

চীনের একটি বৌদ্ধ মন্দিরে মোদি ও শি জিনপিং

চীনা পঞ্জিকার ৬৮তম বর্ষে প্রতিষ্ঠিত এই হোয়াইট হর্স টেম্পলে গিয়েছিলেন দু’জন ভারতীয় বৌদ্ধভিক্ষু কাসিয়াপা মাতাঙ্গা ও ধর্মরত্ম। কুশান ভাষার দোভাষী ধর্মরত্ম চীনা বর্ষ ২৮৯ থেকে ২৯০ পর্যন্ত ওই মন্দিরে অবস্থান করেন। বৌদ্ধধর্মের শাখা চান (জেন)-এর প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত ভারতীয় পণ্ডিত বোধিধর্ম পঞ্চম শতকে এই মন্দির পরিদর্শনে আসেন।

তবে ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধের কারণে দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ক জোরদারে বৌদ্ধবাদ ব্যবহারের সকল প্রচেষ্টাই নস্যাৎ হয়ে যায়। ভারতের অরুনাচল প্রদেশের ওপর চীনের দাবী ও তিব্বতের দালাই লামার প্রতি ভারতের সমর্থন নিয়ে এই বিরোধ। এছাড়াও, শ্রীলংকায় চীনের ‘এক অঞ্চল এক সড়ক’র প্রকল্পগুলো এবং পাকিস্তানে ‘চীন-পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর’ বানচালে ভারতীয় প্রচেষ্টা বৌদ্ধবাদকে ব্যবহার করে চীন-ভারত সম্পর্ক জোরদার প্রচেষ্টার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বৌদ্ধবাদের সঙ্গে চীনের সখ্যতা

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ওপর দশকের পর দশক নিপীড়ন চালানোর পর চীন এখন এই ধর্মের প্রসারে ব্যাপক আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছে। চীনারা একে বলছে “চায়নিজ বুদ্ধিজম”। এর মাধ্যমে তারা বিদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের পথ খুঁজছে।

দেশ-বিদেশে চীনের ভারমুর্তি উন্নত করতে একটি ‘সুরেলা সমাজ’ (হারমোনিয়াস সোসাইটি)-এর খোঁজে ১৯৯০’র দশকে দেশটি বৌদ্ধ ধর্মকে অবলম্বন করা শুরু করে বলে উল্লেখ করেছেন ড. স্কট। ২০১৪ সালে পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক এক সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট শি বলেন: “আমাদেরকে চীনের নমনীয় শক্তি বাড়াতে হবে, চীনাদের ব্যাপারে একটি ভালো আখ্যান তৈরি করতে হবে।”

এরপর থেকে চীন কনফুসিয়বাদ ও বৌদ্ধবাদ ব্যবহার করে তার “পঞ্চম কূটনীতি” শুরু করে।

বৌদ্ধবাদ ব্যবহারের সুফল তুলে ধরে সেখানকার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদ মাধ্যম। এতে বলা হয়, বৌদ্ধবাদ অবলম্বন করা হলে তা এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব বাড়াবে।

ড. স্কট দেখান যে প্রেসিডেন্ট শি’র বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। তার পিতা শি জংশুন বহুবছর এক দালাই লামার দেয়া ঘড়ি হাতে পরেছিলেন। তার মা কুই শিন’কে পুরোদস্তুর তিব্বতীয় রীতিতে সমাহিত করা হয়। তার স্ত্রী পেং লিউয়ান ব্যক্তিগতভাবে তিব্বতি ধারার বৌদ্ধবাদের চর্চা করেন।

ইউনেস্কোর সদরদফতরে চীন ও বৌদ্ধবাদ নিয়ে যে লেখা রয়েছে তার প্রকাশ অনুষ্ঠানে শি বলেন: “প্রাচীন ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের উৎপত্তি ঘটে। চীনে এই ধর্মের বিকাশের পর বহু শতাব্দি ধরে তার সঙ্গে স্থানীয় কনফুসিয়বাদ ও তাওইজমের সংমিশ্রণ ঘটে চীনা বৌদ্ধবাদের বর্তমান রূপ দাঁড়িয়েছে। চীনের মানুষ চীনা সংস্কৃতির আলোকে বৌদ্ধবাদকে সমৃদ্ধ করেছে এবং কিছু বিশেষ বৌদ্ধ ধারণার বিকাশ ঘটিয়েছে। তারা জাপান, কোরিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মকে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছে।

শ্রীলংকার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে চীন প্রকাশ্যে বৌদ্ধ ধর্ম ব্যবহার না করলেও তারা তা করতে আগ্রহী। অন্তত এ পথে ভারতের তৎপরতাগুলো মোকাবেলায়। এই তৎপরতার প্রথমটি হলো ভেসাক উদযাপন। এখানে অত্যন্ত আকর্ষণীয় স্টল দিয়েছে চীনারা। বুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে চিরায়ত চীনা সজ্জার সংমিশ্রণ ঘটেছে এখানে।

পাকিস্তানের প্রচেষ্টা

২০১২ সালে শ্রীলংকায় কপিলাবস্তুর পুরাতত্ত্বগুলো প্রদর্শনের পরপরই পাকিস্তান গান্ধারা অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের পুরানিদর্শনগুলোর প্রদর্শনী করে। এসব নিদর্শন এখন সেদেশের যাদুঘরে রাখা আছে।

শ্রীলংকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক হাইকমিশনার সীমা ইলাহি বালুচ শিল্প ও সঙ্গীতের বেশ ভক্ত। তিনিই পাকিস্তান-শ্রীলংকা সম্পর্কে “নমনীয় শক্তি”র প্রবর্তক। তিনি তার ইসলামিক রাষ্ট্রটিকে অন্যের ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল রূপে তুলে ধরেন।

শেয়ার করুন