সিপিইসি’কে ঘিরে জাতীয় ঐক্যের এক বিরল প্রদর্শনী

সিপিইসি’কে ঘিরে জাতীয় ঐক্যের এক বিরল প্রদর্শনী

এসএএম স্টাফ,
শেয়ার করুন

দেশের সব প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রীদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের চীন সফর দৃশ্যই খুবই মনোমুগ্ধকর। এই সফর থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, শরীফের প্রাদেশিক প্রধান নির্বাহীরা একসময় বিরোধিতার করলেও এখন তারা বুঝতে পেরেছেন ‘চীন-পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর’ (সিপিইসি) আসলেই পাকিস্তানের জন্য একটি গেম-চেঞ্জার এবং এ থেকে তাদের সবার এলাকাই উপকৃত হবে।

প্রধানমন্ত্রী’র সফরসঙ্গীদের মধ্যে সিন্ধু ও খাইবার পাখতুন খোয়ার (কেপি) মুখ্যমন্ত্রীদের অন্তর্ভুক্তি সিপিইসি’র ব্যাপারে এক বিরল জাতীয় অনুভুতি, সংহতি ও ঐক্যের ছবি ফুটে উঠেছে। পাকিস্তান থেকে চীন পর্যন্ত সবার জন্য এটি একটি দর্শনীয় খবরেও পরিণত হয়েছে। এই মহা প্রকল্প নিয়ে এতদিন অনেক রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সন্দেহ-সংশয় ছিলো। এখন এসবের কিছুই আর নেই।

রাজনৈতিক কারণে সিপিইসি’কে ঘিরে সৃষ্ট ভিত্তিহীন আশঙ্কা ও সংশয় দূর করতে চীনকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। দেশটিকে একাধিক বার এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে সবার সংশয় দূর করতে হয়েছে। তারা সবার কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সিপিইসি কোন সুনির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য করা হচ্ছে না, এটা গোটা পাকিস্তানের জন্যই সুফল বয়ে আনবে। ২০১৪ সালে পাকিস্তানে যে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা-গোলযোগ দেখা দেয় তার পরিপ্রেক্ষিতে দেশটিতে চীনা প্রেসিডেন্টের নির্ধারিত সফরও বিলম্বিত করতে দেশটি রাজি হয়নি।

বেইজিংয়ে ‘বেল্ট এন্ড রোড ফোরাম ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন’ সম্মেলনে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এমন উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দলের যোগদানের সুযোগ আসলে পাকিস্তানের জন্যই এক মহা সম্মানের।

বেল্ট এন্ড রোড ফোরাম (বিআরএফ) হলো “সিল্ক রোড অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং একবিংশ শতকের সামুদ্রিক সিল্ক রোড” (ওবিওআর) উদ্যোগের অংশ। ২০১৩ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই উদ্যোগ এর কথা ঘোষণা করেন। ‘উইন-উইন’ সহযোগিতার মধ্য দিয়ে অভিন্ন উন্নয়ন জোরদার করাই এই ফোরামের লক্ষ্য।

ওবিওআর’র একটি পতাকাবাহি বা ‘ফ্লাগশিপ’ প্রকল্প এই সিপিইসি। বিআরএফ-এ আরো ২৭টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে দিয়ে চীনের নেতৃত্বের ভূমিকাটি স্পষ্ট হয়ে গেছে।

এটা জানা কথা যে, সিপিইসি’তে অন্তর্ঘাত চালানোর জন্য কিছু প্রভাবশালী বিদেশী রাষ্ট্র ও কিছু অভ্যন্তরিণ মহল মরিয়া হয়ে উঠেছে। তবে, পাকিস্তান সফলতার সঙ্গে তাদের অপতৎপরতা মোকাবেলায় সক্ষম হয়েছে। কারণ, দেশটি এই প্রকল্প এগিয়ে নিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ও সংকল্পবদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স’র ডিরেক্টর ড্যানিয়েল কোটসই সম্প্রতি যা বলেছেন তার ব্যাখ্যা কেবল তিনিই দিতে পারেন। তার মন্তব্যের মধ্য দিয়ে সিপিইসি’র ব্যাপারে ওয়াশিংটনের বিদ্বেষ ফুটে উঠেছে।

কংগ্রেসের শুনানিতে তিনি বলেছেন, পাকিস্তানে সিপিইসি বাস্তবায়িত হলে সেখানে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর হামলা বাড়বে। সিপিইসি’র বাস্তবায়ন সম্ভবত জঙ্গী ও সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে আরো অধিক সংখ্যক টার্গেটে হামলা চলাতে উৎসাহিত করবে। তার এই যুক্তি খুবই অদ্ভুত। তার কথার মানে হলো সন্ত্রাসীদের হামলা হতে পারে এই আশঙ্কায় কোন বড় ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না।

সিপিইসি’র বিরুদ্ধে যখন এমন অব্যাহত ষড়যন্ত্র চলছে তখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে অন্তর্ভুক্ত জাতীয় নেতৃত্ব এই মুহূর্তে নিজেদের মধ্যে ঐক্য দেখিয়েছেন তা আসলেই ছিলো অতি কাক্সিক্ষত। এসব নেতা প্রমাণ করেছেন যে জাতির জন্য, জাতীয় সমৃদ্ধির জন্য তারা তাদের রাজনীতির উর্ধ্বে উঠতে পারেন।

আগের সফরের পর সিন্ধুর মুখ্যমন্ত্রী মুরাদ আলী শাহ ও কেপি’র মুখ্যমন্ত্রী পারভেজ খাত্তাক সিপিইসি’র ব্যাপারে তাদের মন পরিবর্তন করেছেন এবং তারা একে একটি ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা হিসেবে অভিহিত করতে শুরু করেন। তারা বলেন, এই পরিকল্পনা পাকিস্তানের গন্তব্য ও ভাগ্য বদলে দেবে।

কেপি’র মুখ্যমন্ত্রী পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের খাত্তাক দলের পক্ষ থেকে এই প্রকল্পের বিরোধিতায় প্রায় চারটি বছর নষ্ট করেছেন। তবে বিলম্বে হলেও তিনি বুঝতে পেরেছেন যে বিক্ষোভের রাজনীতি নিরর্থক ও নিষ্ফলা। আগামী নির্বাচনের জন্য কেউ তাকে কিছু দিতে পারলে সিপিইসি’ই দিতে পারবে। এরপর থেকে তিনি এই প্রকল্পের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেন এবং চীনের কাছ থেকেও প্রত্যাশিত ইতিবাচক সাড়া পান। এর পর থেকে গত তিন বছরে সিপিইসি’র ব্যাপারে তার আর প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্যে কোন অমিল ছিলো না। অন্তত এই বিষয়ে তারা এখন এক পথের পথিক।

পাকিস্তান পিপলস পার্টি’র মুখ্যমন্ত্রী সিন্ধুতে। সিপিইসি’র ব্যাপারে স্বল্পমাত্রায় হলেও তারও ছিলো আপত্তি। তিনি খাত্তাকের মতো এত কট্টর ও বিধ্বংসি ছিলেন না। এরপর কয়েক দফা চীন সফরের পর তার উদ্বেগগুলো নিরসন হয়ে যায়। চীন তার প্রস্তাবিত বেশ কিছু প্রকল্পে অর্থায়ন করতে রাজি হয়।

আর স্পষ্টতই বেলুচিস্তানের আগের মুখ্যমন্ত্রী ড. আব্দুল মালিকের সিপিইসি’র বিরোধিতা করার কোন কারণ ছিলো না। প্রদেশগুলোর মধ্যে সিপিইসি থেকে বেলুচিস্তানই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। কারণ, এই প্রকল্পের গেটওয়ে গোয়াদার বন্দর এই প্রদেশেই। এই প্রদেশে বিশাল এক জালের মতো বিস্তৃত সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। এই সড়ক নেটওয়ার্কই সিপিইসি’তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

print
SOURCEদি নিউজ
শেয়ার করুন