বিদেশ সফরে ব্যস্ত মোদি, মুদ্রানোট বাতিলের যাঁতাকলে পিষ্ট তৃণমূলের দিকে নজর নেই

বিদেশ সফরে ব্যস্ত মোদি, মুদ্রানোট বাতিলের যাঁতাকলে পিষ্ট তৃণমূলের দিকে নজর নেই

শেয়ার করুন
মধ্যপ্রদেশে সরকারি যানবাহনে বিক্ষুব্ধ কৃষকদের অগ্নিসংযোগ

বিদেশ সফরে বিভোর (মাত্র তিন বছর আগে ক্ষমতায় আসার পর এ পর্যন্ত ৬৪টি দেশ সফর করেছেন) ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি’র দৃষ্টি সীমানা থেকে সম্ভবত ভারত হারিয়ে গেছে। বিশেষ করে ভারতের গ্রামগুলোতে বসবাসরত সত্যিকারের ভারতীয়দের প্রতি তার কোন নজর নেই।

একটি ছোট্ট শহরের বনেদী পরিবার থেকে উঠে আসা মানুষ বলে নিজেকে মনে করলেও দূর দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রীদের সঙ্গে মেলামেশাতে মোদি বেশি অভ্যস্ত। নিজ দেশের কৃষকদের প্রতি নজর দেয়ার সময় তার নেই। ঋণভারে জর্জরিত কৃষকরা উদ্বেগজনক হারে আত্মঘাতি হচ্ছে। গত বছর নভেম্বরে দেশটির বাজারে চালু থাকা মুদ্রা মূল্যের ৮৬% তিনি বাতিল করেন। এতে তৃণমূলের কৃষকদের ওপর ঋণের বোঝা আরো চেপে বসে। ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ১২,৩৬০ থেকে ১২,৬০২ জন কৃষক আত্মহত্যা করে। ভারতের শীর্ষ সাতটি আত্মহত্যা-প্রবণ রাজ্যের মধ্যে মোদি’র ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত রাজ্যগুলোর অবস্থা সবচেয়ে করুণ। তালিকার শীর্ষে রয়েছে বিজেপি-শাসিত রাজ্য মহারাষ্ট্র। যত কৃষক আত্মঘাতি হয়েছে তার ৩৭.৮% এই রাজ্যে। বিজেপি শাসিত ছত্তিশগড় ও মধ্য প্রদেশও শীর্ষ সাত রাজ্যের তালিকায় রয়েছে।

কৃষকদের আত্মঘাতি হওয়ার একক সবচেয়ে বড় কারণ হলো ঋণ/দেউলিয়া হওয়া, যার অংশ ৩৮.৭%।

খরা, ফসলের দাম পড়ে যাওয়া, বাজারে নগদ অর্থের ঘাটতি থাকায় পণ্য বিক্রি করতে না পারা, ইত্যাদি করণে এই ঋণ। মোদি’র মুদ্রানোট বাতিলের পর আকস্মিকভাবে বাজারে নগদ অর্থের ঘাটতি তৈরি হয়।

ভারতের জনশক্তির ৫০% কৃষিক্ষেত্রে নিয়োজিত। আর এই জনশক্তিকে নগদ মুদ্রায় মজুরি দেয়া হয়। ১২০ কোটি ভারতীয়ের মধ্যে ৬০ কোটির কোন ব্যাংক একাউন্ট নেই। ৩০ কোটির নেই কোন সরকারি পরিচয়পত্র। ব্যাংক একাউন্ট খোলার জন্য এই পরিচয়পত্র প্রয়োজন। এই কোটি কোটি মানুষ রাতারাতি মুদ্রানোট বাতিল সম্পর্কে ছিলো বেখবর। মোদি’র উদ্যোগ এদেরকে ছিটকে জাহাজের বাইরে ফেলে দেয়।

কৃষকরা যখন খরিফ বা শীতাকালিন ফসল তুলে বাজারে বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন এই মুদ্রানোট বাতিল তাদের ওপর আঘাত হানে। ক্রেতাদের হাতে টাকা না থাকায় বাজারে চাহিদা ছিলো না। ফলে কৃষকদের নামমাত্র মূল্যে তাদের ফসল বিকিয়ে আসতে হয়েছে। ভুট্টার আটা’র দাম সাড়ে তিন রুপিতে নেমে যায়। ৭০% পচনশীল ফসলের এ অবস্থা হয়। দারিদ্রপীড়িত ছত্তিশগড়ে এক কেজি সবজি’র দাম নেমে ০.২৫ রুপিতে দাঁড়ায়। মুম্বাই থেকে প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যায়, কিছু বস্ত্র কারখানায় ৭০% পর্যন্ত শ্রমিককে ছুটি দেয়া হয়। কারণ, নিয়োগকর্তাদের হাতে মজুরি দেয়ার মতো কোন নগদ অর্থ ছিলো না।

বিজেপি শাসিত মধ্য প্রদেশে ঋণ মওকুফের জন্য আন্দোলনরত কৃষকদের ওপর সম্প্রতি পুলিশ গুলি চালায়। এতে পাঁচ কৃষক নিহত হয়। অথচ এই রাজ্যে সফরে যাওয়া নিয়ে মোদি’র কোন মাথা ব্যথা নেই। নিহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে কোন বিবৃতিও তিনি দেননি। বরং, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র সফরের আয়োজনে তিনি এখন ব্যস্ত। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ডেনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ছবি তোলার ভাবনায় তিনি এখন বিভোর।

মোদি তার ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্প বাজারজাত করতে বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু এই খাতে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে সামান্যই।

গবেষণায় দেখা গেছে, এফডিআই’র যেসব বড় বড় অংক বলা হচ্ছে সেগুলো কেবলই প্রতিশ্রুতি, প্রকৃত বিনিয়োগ নয়। ভারতে বড় অংকের বিদেশী বিনিয়োগ হয়েছে কেবল বর্তমান ভারতীয় কোম্পানিগুলোর শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে।

২০১৬-১৭ অর্থ বছরের শেষ তিন মাসে ভারতের বেসরকারি অর্থনীতি (সরকারি ও কৃষিখাত বাদ দিয়ে)’র প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩.৮%। অথচ ঠিক এক বছর আগে একই সময়ে এই প্রবৃদ্ধি ছিলো ১০.৭%। অর্থনীতিবিদরা অবিশ^াস্য এই পরিস্থিতির জন্য মুদ্রানোট বাতিলকে দায়ি করছেন।

মোদি সন্ত্রাসে অর্থায়ন বন্ধ করতে গত বছর ৮ নভেম্বর আকস্মিকভাবে ৫০০ রুপি (৭.৫ মার্কিন ডলার) ও ১০০০ রুপি (১৫ মার্কিন ডলার) মুদ্রানোট বাতিল করেন। বাজারে চালু থাকা এসব নোটের আর্থিক মূল্য মোট মুদ্রানোটের আর্থিক মূল্যের ৮৬%। কিন্তু সন্ত্রাসে অর্থায়ন বন্ধে মোদি’র চেষ্টা সফল হয়েছে বলে এখনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে, মুদ্রানোট বাতিল যে ভারতের অনানুষ্ঠানিক, কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতকে গুরুতরভাবে আঘাত করেছে তা স্পষ্ট।

ডেইলি মিন্টের এক রিপোর্টে দেখা যায়, ২০১৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বর্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিলো ১২.১%। তা ব্যাপকভাবে কমে ২০১৭ সালের ৩১ মে দাঁড়ায় ৫.৪%। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে গ্রামীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি হয় ২.৫%। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের একই সময়ে এই প্রবৃদ্ধি ছিলো ১২.৯%।

কৃষি প্রবৃদ্ধি আগের বছরের ৬% থেকে নেমে হয়েছে ৩.৮%। নির্মাণ খাতে প্রবৃদ্ধি ৮.৩% থেকে কমে হয়েছে ৬.৯%। রিয়েল এস্টেট খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩.১%, যা এক বছর আগে ছিলো ৭.৬%। কৃষিখাতের পর মুদ্রানোট বাতিলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। কারণ এসব খাতও নগদ মুদ্রা লেনদেনের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। ৫০০ ও ১০০০ রুপি’র মুদ্রা না থাকায় নিম্নমূল্যের নোট দিয়ে পরিশোধ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। পুরণো নোট বাতিলের পর মোদি সরকার নতুন ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট চালু করে।

তবে, ব্যবসায়িক লেনদেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে দেশটিকে আরো অনেক সময় অপেক্ষা করতে হবে। তার আগে মুদ্রানোট বাতিলের ফলে যে ঋণগ্রস্ততা ও চরম দুর্দশা তৈরি হয়েছে, যা মানুষকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, সেগুলোর প্রতি নজর দিতে হবে। ঋণ মওকুফের কথা ভাবা হচ্ছে। কিন্তু এটা কেন্দ্রীয় কোষাগারের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করবে। কারণ কেন্দ্রের কাছেই অর্থ আছে। বিভিন্ন রাজ্য থেকে কয়েক লক্ষ কোটি রুপি চাওয়া হয়েছে। বিজেপি শাসিত মহারাষ্ট্র ও মধ্য প্রদেশে যদি ঋণ মওকুফ করা হয় তাহলে অন্য রাষ্ট্রগুলোও একই দাবি তুলবে। সেই দাবিও কেন্দ্রকে পূরণ করতে হবে।

print
শেয়ার করুন