মালদ্বীপে শাসন পরিবর্তনে শ্রীলঙ্কা ফর্মুলা?

মালদ্বীপে শাসন পরিবর্তনে শ্রীলঙ্কা ফর্মুলা?

ফারাহ মাসুম,
শেয়ার করুন

দক্ষিণ এশিয়ার প্রবাল দ্বীপমালার দেশ মালদ্বীপের রাজনীতিতে এখন অনেকখানি উত্তাল হাওয়া বইছে । দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাাচন অনুষ্ঠিত হবার সম্ভাবনা ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে। প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় এই নির্বাচন ক্ষমতার প্রধান নির্র্ণায়ক ভিত্তি । যদিও আইন প্রণয়ন ও মন্ত্রিসভা অনুমোদনসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে ৭৭ আসন বিশিষ্ট সংসদের ।

জনগণের প্রত্যক্ষভোটে ৫ বছরের জন্য ২০১৩ সালে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন আবদুল গাইয়ুম নির্বাচিত হয়েছিলেন । আরেক মেয়াদে তিনিই সরকারি দল প্রগেসিভ পার্টি অব মালদ্বীপস (পিপিএম) এর প্রার্থি হবেন বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে । ইতিমধ্যে তার পক্ষ থেকে ফাস্ট লেডি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করেছেন ।

এর বিপরীতে বিরোধি দলগুলো ঐক্যবদ্ধ প্রার্থি দেয়ার জন্য একটি বৃহত্তর পরিসরের রাজনৈতিক জোট তৈরি করেছেন । এই জোটের প্রধান নেতা কারোই প্রেসিডেন্ট পদে বিদ্যমান অবস্থায় প্রার্থি হবার সম্ভাবনা বা সুযোগ নেই। প্রধান বিরোধি দল মালদ্বীপ ডেমোক্রেটিক পার্টির (এমডিপি) মূল নেতা মোহাম্মদ নাসিদ সন্ত্রাস সংক্রান্ত এক মামলায় ১৩ বছর সাজা নিয়ে স্বেচ্চা নির্বাসনে বৃটেনে রয়েছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইয়ুম বিরোধি জোটের অন্যতম অংশীদার । পরবর্তী প্রেসিডেন্ট প্রার্থি নির্ধারণসহ বেশকিছু ইস্যুতে ইয়ামিনের সাথে তার মতপার্থক্য ভাঙ্গনে গিয়ে পরিণতি পেয়েছে । তিনিই বর্তমান সরকারি দল পিপিএম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন তার কাছ থেকে দলের সভাপতির পদ অধিগ্রহণ করেছেন । তার এই দখলের পক্ষে রায় দিয়েছে আদালত । কার্যত গাইয়ুম এখন পিপিএমএর খন্ডিত অংশ নিয়ে বিরোধি জোটের সদস্য হয়েছেন । দেশটির দীর্ঘকালীন প্রেসিডেন্ট মামুন গাইয়ুমের বয়স জনিত সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন করে প্রেসিডেন্ট হবার সুযোগ নেই ।

বিরোধি জোটের অরেকটি দল হলো জমহুরি ই পার্টি। দলটির প্রধান কাশিম ইব্রাহিম মালদ্বীপের অন্যতম প্রধান ধনাঢ্য ব্যক্তি। এক সময় সরকারি জোটের অংশ ছিলেন । এখন তিনি বিরোধি জোটের অন্যতম শরীক। কাশিম ইব্রাহিমও বয়স জনিত সীমাবদ্ধতার জন্য এবার প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াতে পারবেন না ।

বিরোধি জোটের একজন অভিন্ন প্রার্থি দেয়ার কথা বলছেন জোটের সবাই । নাসিদ নিজেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে চান । এ জন্য তার সামনে যে আইনী বাধা রয়েছে তা অপসারণের জন্য মালদ্বীপের প্রভাবশালী কূটনৈতিক অংশীদারদের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন । তিনি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কিনা তা নিয়ে বড় রকমের অনিশ্চয়তা রয়েছে । এ অবস্থায় সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ওমর নাসিরকে একমাত্র হাইপ্রোফাইল প্রার্থি হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে । তবে তিনি সম্মিলিত বিরোধি দলের প্রার্থি হবেন এমন কোন ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যায়নি ।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে মালদ্বীপে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির  একটি বড় কারণ হলো দেশটির কর্তৃত্ববাদী শাসন । মালদ্বীপের শাসন প্রক্রিয়ার মধ্যেই এক ধরনের স্বেচ্ছাচারি প্রবণতা সুপ্ত রয়েছে। ২০০৫ সালের আগে মালদ্বীপে কোন রাজনৈতিক দল ছিল না । গণভোটের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতেন । এই নির্বাচনে কার্যত কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতো না । এখনও দেশটিতে রাজনৈতিক দল নিয়ন্ত্রিত । সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুল ওয়াহিদের সময় বৈধ রাজনৈতিক দলের জন্য ৩ হাজার জন সদস্য থাকার পরিবর্তে ১০ হাজার সদস্য থাকার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয় । ফলে অনেকগুলো রাজনৈতিক দল তখন বিলুপ্ত হয়ে যায় । এখন মাত্র ৭টি বৈধ রাজনৈতিক দল রয়েছে । এর মধ্যে সংসদে প্রতিনিধিত্ব রয়েছে ৫টি দলের। এসব দলের মধ্যে সরকারি দল পিপিএম এর এমপি রয়েছেন ৩৪ জন । এর মধ্যে অজ্ঞাত সংখ্যক সদস্যের মামুন গাইয়ুমের প্রতি আনুগত্য রয়েছে । প্রধান বিরোধি দল এমডিপির সংসদ সদস্য রয়েছে ২৪ জন । জমহুরি পার্টির রয়েছে ১৬ জন। মালদ্বীপ ডেভলপমেন্ট এলায়েন্সের রয়েছে ৫ জন এবং আদালত পার্টির রয়েছে ১ জন । এ অবস্থায় বিরোধি পক্ষ সংসদে সংখ্যাগরিষ্ট অবস্থায় পৌঁছে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে । বিরোধি নেতা নাসিদ তো সংসদের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করার কথা প্রকাশ্যে বলেছেন । এর পর স্পীকারের উপর অনাস্থা আনার উদ্যোগ নেয়া হয় । এই অনাস্থা প্রস্তাব ঠেকানোর জন্য অনাস্থা প্রস্তাবে এমপির স্বাক্ষরের সংখ্যা প্রায় চারগুণ বাড়ানো হয় । সর্বশেষ সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে বলা হয়, সংসদে মন্ত্রী বা স্পীকারের ব্যাপারে কোন অনাস্থা প্রস্তাব আনা হলে তা চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করবে সুপ্রিম কোর্ট ।

আইন, পুলিশ এবং আদালতের ক্ষমতা ও এখতিয়ার ব্যবহার করে ইয়ামিনের সরকার অচলাবস্থা তৈরি করে ক্ষমতা দখল করার প্রচেষ্টা এখনো পর্যন্ত ঠেকিয়ে যাচ্ছেন । কিন্তু আগামী নির্বাচনে সেই বিপর্যয় কতটা প্রতিহত ইয়ামিন ও তার দল করতে পারবে তা নিয়ে সংশয় দেখা যাচ্ছে । অতি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নানা ধরনের প্রতিকুলতার পরও সরকারি দলের চেয়ে বিরোধি জোট অনেক বেশি আসন পেয়েছে । এই নির্বাচনে পরাজিত হবার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ইয়ামিন ।

ইয়ামিন রাজনৈতিকভাবে যত প্রতিকূল অবস্থায় পড়ছে ততই স্বৈচ্ছাচারের পথ অবলম্বন করছেন । ইয়ামিনের প্রতিদ্বন্দ্বী কোন রাজনীতিবিদ এখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করার মতো নেই । সর্বশেষ সরকারের প্রতি অনাস্থা প্রস্তাব ইস্যু সামনে আসার পর নির্বিচারে বিরোধি নেতাদের গ্রেফতার ও মামলা দেয়া হয়েছে । বিরোধি পক্ষও মেয়াদের আগেই সরকারের পতন ঘটানোর নানা প্রক্রিয়া শুরু করে । আর সরকার তার প্রশাসনিক ও পুলিশী ক্ষমতা প্রয়োগ করে এসব প্রচেষ্টা থামাচ্ছে ।

চার লাখ মানুষের প্রাকৃতিকভাবে ভঙ্গুর এ দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইয়ামিনের বেশ কিছু সাফল্যও রয়েছে । মালদ্বীপের মাথা পিছু ১১ হাজার ৯ শ ডলার আয় দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ । পর্যটন ও মৎস্য সম্পদ আহরণের উপর অর্থনীতি প্রধানত নির্ভরশীল । অবশ্য বড় কয়েকটি উচ্চাভিলাসি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেশটির বিদেশি ঋণের অংকও বেড়ে যাচ্ছে বলে সমালোচনা রয়েছে ।

মালদ্বীপ একটি ক্ষুদ্র দ্বীপমালার দেশ হলেও এর কৌশলগত অবস্থান বেশ গুরুত্বপূর্ণ । ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টানাপড়েনের প্রভাব সব সময় পড়তে দেখা গেছে দেশটির রাজনীতির উপর । এখানকার ক্ষমতাসীন পিপিএম রক্ষণশীল ডানপন্থী ইসলামী মূল্যবোধ সম্পন্ন দল । এ দলটি মূলত দেশটির দীর্ঘ সময়ের প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইয়ুমের অনুসৃত নীতি অনুসরণ করে । পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সরকার বিশেষ সম্পর্ক বজায় রাখে ওআইসি দেশসমুহ এবং চীনের সাথে । ভারত ও পাশ্চাত্যের সাথে কোন ধরনের সংঘাত এড়িয়ে চললেও সাধারণ সম্পর্কের বাইরে কৌশলগত বন্ধন যথা সম্ভব এড়িয়ে চলেছে বর্তমান সরকার ।

সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ডে সৌদি আরব ও ওআইসি বিশেষভাবে সহায়তা দিয়ে আসছে । এশিয়ার প্রভাবশালী দেশ চীনও নানা ধরনের বিনিয়োগ ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে আসছে । এসব দায় এর কারণে সৌদি আরবের অনুরোধে ইরান ও কাতারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে মালদ্বীপ । অন্যদিকে প্রধান বিরোধি দল এমডিপি এবং এর নেতা মোহাম্মদ নাসিদ ভারতপন্থী হিসাবে পরিচিত। নাসিদের সংক্ষিপ্ত সময়ের শাসনে দেশটিতে ভারতের প্রভাব বেড়ে যায় বিশেষভাবে । পাশ্চাত্যের সাথেও রয়েছে দলটির বিশেষ সম্পর্ক । নাসিদকে ১৩ বছরের কারাদন্ড দেয়া হলে নির্বাসনের জন্য তিনি বৃটেনকে বেছে নেন । অথচ ইয়ামিন সরকার কমনওয়েল্থ থেকে তার দেশকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন ।

শ্রীলঙ্কার মতো করে মালদ্বীপে সরকার পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে মনে করা হয়। শ্রীলংকায় রাজাপাকসের সরকারি দল প্রিডম পার্টির সেক্রেটারি  ও স্বাস্থ্য মন্ত্রী সিরিসেনাকে রাজাপাকসের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিরোধি প্রার্থি করা হয় । ঐকমত্যের সরকারের জন্য লিংকওম্যান হিসাবে কাজ করেন সাবেক প্রেসিডেন্ট কুমারা বন্দনায়েকে । ছোট খাট অনেক দল ও গোষ্ঠি বিগত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সিরিসেনাকে সমর্থন করেন । মালদ্বীপে এখন শ্রীলঙ্কার সেই প্রেক্ষিতই তৈরি হচ্ছে । মধ্য বাম লিবারেল গণতান্ত্রিক এমডিপির সাথে রক্ষণশীল মধ্য ডান গাইয়ুম অনুগত পিপিএম এবং মধ্য ডান উদার রক্ষণশীল কাশিম ইব্রাহিমের জমহুরি পার্টির ঐক্য হয়েছে । সিরিসেনার মতো একজনকে হয়তো এখানেও প্রার্থি করা হবে পরবর্তী নির্বাচনের জন্য।

প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিনের কট্টর শাসনে গত এক বছরের রাজনৈতিক মেরুকরণে  যারা আগের নির্বাচনে তার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তাদেও অনেকে দূরে সরে গেছেন । প্রতিপক্ষের প্রতি দমনমূলক নীতির কারণে জনসমর্থনও বেশ খানিকটা ঘুরে যেতে শুরু করেছে । কৌশলগতভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে সব দেশ মালদ্বীপের সরকারি নীতিকে সমর্থন করছে না তারাও সরকারের উপর নির্বচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ করার জন্য চাপ দিয়ে রাখছে।

এক্ষেত্রে ইয়ামিন আদালত এবং প্রশাসনকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহারের যে পদক্ষেপ নিয়েছেন মেয়াদ ফুরিয়ে আসার সাথে সাথে সেটির কার্যকারিতা আরো কমে যাবে বলে মনে হচ্ছে । এই অবস্থায় মামুন আবদুল গাইয়ুুম এবং জমহুরি পার্টির সাথে সমঝোতা করতে পারতেন ইয়ামিন । এভাবে পিপিএমকে হয়তো আবারো ক্ষমতায় রাখা যেতো । কিন্তু ইয়ামিনের জন্য সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে । নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে ততই এই দ্বীপমালার দেশে সরকার পরিবর্তন আসন্ন হয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে । আগামী সোয়া এক বছরের মধ্যে এই পরিস্থিতিতে কোন নাটকীয় পরিবর্তন হয় কিনা সেটিই এখন দেখার বিষয় ।

শেয়ার করুন