ভারতের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: বিস্ময়ের অপেক্ষায়

ভারতের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: বিস্ময়ের অপেক্ষায়

শেয়ার করুন

ভারতে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আট সপ্তাহও বাকি নেই। মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলগুলোকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আবারো বুঝিয়ে দিলেন যে পার্লামেন্টে তারই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। এটাই মোদি’র স্টাইল। তিনি নিজের পছন্দের কথা বিরোধী দলগুলোর কাছে ঘোষণা করবেন। তারা তা গ্রহণ করতে পারে, আবার বর্জনও করতে পারে। কিন্তু, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)’র কাছ থেকে পাওয়া ইংগিতগুলো যদি সত্যি হয় তাহলে “তিনি এমন একজনের নাম ঘোষণা করবেন তাকে মেনে নেয়া ছাড়া বিরোধী দলগুলোর আর কোন উপায় থাকবে না।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিনিয়র বিজেপি নেতারা বলেন, প্রধানমন্ত্রী আগে থেকে যাদের নাম এসেছে যেমন সুষমা স্বরাজ, এল কে আদভানি বা মুরলি মনোহর যোগী — এদেরকে এড়াতে চাচ্ছেন। প্রকাশ্য রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা রয়েছে এমন কাউকেও তিনি বিবেচনা করতে চান না। সামাজিক জীবন থেকে অবসর নিয়েছেন এমন রাজনীতিকের ব্যাপারেও তার ভোটো রয়েছে। এমনকি অবসরপ্রাপ্ত কোন সশস্ত্র বাহিনী প্রধানকে বিবেচনা করার কথাও তিনি বাতিল করে দিয়েছেন।

বিশেষ করে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোন পর্যায়েই কোন আলোচনা না হওয়ায় বিজেপি মহলে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী নিয়ে জল্পনা এখন তুঙ্গে। এ বিষয়ে অবগত একজন সিনিয়র বিজেপি নেতা বলেন, মোদিজির সঙ্গে কোন আলোচনা হয় না। তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নেন। বেশিরভাগ সময় তিনি এমনকি অমিত শাহ ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস)’র সঙ্গেও কোন আলোচনা করেন না।

কিন্তু তিনি কোন সিদ্ধান্ত নিলে আরএসএস’কেই প্রথম জানানো হয়। এরপর ধীরে ধীরে সবাই জানতে পারে। আমরা তার এই স্টাইলটিই দেখেছি মুদ্রানোট বাতিলের সময়, এমন কি উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পদে যোগি আদিত্যনাথকে বেছে নেয়ার সময়। তাই এবারও অপ্রত্যাশিত কিছু আমরা আশা করছি।”

এই নেতার কথা যদি বিশ্বাস করতে হয় তাহলে প্রেসিডেন্ট পদে মোদি’র প্রথম পছন্দ হবে ইনফোসিস-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান এন আর নারায়না মুর্তি, এর পর থাকবেন রতন টাটা ও নারায়না মুর্তি’র স্ত্রী সুধা মুর্তি। সুধা মুর্তি নিজগুণে মানবহিতৌষি হিসেবে খ্যাতিমান। সাবেক সেনা প্রধান ভি পি মালিকের নাম তালিকায় থাকলেও তাকে বিবেচনা করার সম্ভাবনা কম। ওই নেতার মতে এর কারণ, প্রধানমন্ত্রীকে স্যালুট করেছেন এমন কাউকে মোদি বেছে নেবেন না।

এই নেতার মতে নারায়না মুর্তির সম্ভাবনা প্রবল। কারণ, আরো অনেক কিছুর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববাসীর কাছে একটি বার্তা দিতে চান। নারায়না মুর্তি এমন এক ব্যক্তি যাকে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের জনক বলা যায়। গত এক দশক ধরে ভারতের এই শিল্প বিশ্বকে মুগ্ধ করে চলেছে। তিনি শুধু লাখ লাখ কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করেননি, ভারতের আইটি শিল্পকে বিশ্বের দরবারে নেতৃত্বের আসনে আসীন করেছেন। তাছাড়া তিনি কোন বিতর্ক বা কেলেংকারিতে জড়িত নন। তার বিরুদ্ধে কোন দুর্নীতির অভিযোগও নেই। তাছাড়া প্রকাশ্য কোন রাজনৈতিক সংযুক্তিও তার নেই। একজন আগাগোড়া সরল ও সৎ ব্যক্তি হিসেবে সারা বিশ্বে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি হিসেবে তিনি পরিচিত। তিনি সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষা করতে পারেন এবং কোন চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না বলে আশা করা যায়।

এখানে উল্লেখ করা যায় যে নারায়না মুর্তি মোদি’র প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ভারতকে সামনে এগিয়ে নিতে তিনি মোদি’র প্রচেষ্টাকে সমর্থন দিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।

বিজেপি’র ভেতরের সূত্রগুলোর মতে রতন টাটা’রও প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, তার সম্ভাবনা মুর্তির চেয়ে কিছুটা কম। কারণ, ন্যাশনাল ডেমক্রেটিক এলায়েন্স (এনডিএ)’র আগের মেয়াদে বিজেপি’র সঙ্গে তার কিছুটা মনকষাকষি হয়।

দলের ভেতরের খবর রাখেন এমন এক নেতা বলেন, “ওইসব মনকষাকষি এখন অতীতের বিষয়। তিনি এখন আর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নন। বিশ্বজুড়ে তার নিষ্কলুষ ভাবমুর্তি রয়েছে এবং সবার শ্রদ্ধাভাজন। কোন কারণে মুর্তি যদি বাদ পড়েন, তাহলে রতন টাটার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

বিজেপি’র সিনিয়র নেতারা বলেন, এর কারণ হলো ভারতের ব্যবসায়িক সম্প্রদায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে জাতিগঠন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অবদান রাখলেও এর জন্য তাদেরকে কোন প্রতিদান দেয়া হয়নি।

একজন বিজেপি নেতা বলেন, “এটা [ভারতীয় ব্যবসায়ীদের প্রতি স্বীকৃতি] অনেকদিন ধরে তাদের প্রাপ্য।”

তেলেগু দেশাম পার্টি ও ওয়াইএসআর কংগ্রেসে’র সমর্থন নিয়ে পার্লামেন্টে এনডিএ’র সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। এছাড়া অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাভিদা মুন্নেত্রা কাজাঘাম (এআইএডিএমকে), জনতা দল (ইউ) ও বিজু জনতা দল (বিজেডি)’র ভোট আশা করা হচ্ছে। ২৭ মে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নিতিশ কুমারের বৈঠকের পর জেডিইউ’র সমর্থন প্রায় নিশ্চিত। এই সাক্ষাৎ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ কারণ তিনি ২৬ জুন কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধির ডাকা বৈঠকে যোগ না দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যান। বিজেডি’র নবিন পাটনায়কের হয়তো বিজেপি’র পক্ষে যাওয়া নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে, কিন্তু মুর্তি বা টাটা’র মতো কোন প্রার্থী দেয়া হলে তাকে সমর্থন দিতে তিনি রাজি হবেন বলে মনে হয়। কারণ উড়িষ্যার মুখ্যমন্ত্রীও প্রেসিডেন্ট পদে কোন প্রগতিশীল ও উন্নয়নমুখি ব্যক্তিত্বকে দেখতে চান।

বিজেপি’র হিসাব মতে, বর্তমান অবস্থায় এআইএডিএমকে নিশ্চিতভাবে এনডিএ’কে সমর্থন করবে। কারণ, তাদের প্রতিপক্ষ দ্রাভিদা মুন্নেত্রা কাজাঘাম (ডিএমকে) সোনিয়ার সঙ্গে বৈঠকে যোগ দিয়েছে।

একজন সিনিয়র বিজেপি নেতা বলেন, “তাছাড়া, মুর্তিকে যদি প্রার্থী করা হয় তাহলে দক্ষিণ ভারতের কাউকে সমর্থন দিতে পেরে তারাও খুশি হবে।”

মজার ব্যাপার হলো সিনিয়র বিজেপি নেতারা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির থাকার সম্ভাবনা বাতিল করে দিয়েছেন। তারা লোকসভা স্পিকার সুমিত্রা মহাজন বা আরএসএস প্রধান মোহন ভগবৎ প্রার্থী হওয়ার গুজবও নাকচ করে দেন। মহাজনকে প্রার্থী করা হলে লোকসভার আরেক উপ-নির্বাচন অহেতুক টেনে আনা হবে।

বিজেপি নেতারা মোহন ভগবতের প্রেসিডেন্ট হওয়ার বিরুদ্ধে। তাদের কথা, “দয়া করে আরএসএস প্রধানের পদটি খাটো করবেন না। এই পদ প্রেসিডেন্টের পদের চেয়েও অনেক বড়। আরএসএস প্রেসিডেন্ট হিসেবে মোহন ভগবত চাইলে যেকোন দিন প্রেসিডেন্ট ভবনে গিয়ে চা খেয়ে আসতে পারেন।”

বিজেপি নেতারা মনে করছেন, আগামী ৪ জুন প্রধানমন্ত্রী ইউরোপ সফর শেষে দেশে ফেরার পর প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হবে।

অন্যদিকে, নিতিশ কুমার সটকে পড়ায় বিরোধী দলগুলোর এ ব্যাপারে কণ্ঠ কিছুটা ক্ষীণ হয়ে এসেছে বলে মনে হচ্ছে। ২৬ মে ১৭ দলীয় মধ্যাহ্নভোজ বৈঠকে যোগদানকারী নেতারা চান সরকার একজন ঐক্যমত্যের প্রার্থী দিক। তাই তারা কারো বিরোধিতা করার পরিবর্তে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে, ১৭ দলের একই একত্রিত হওয়া কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে উত্তর প্রদেশের সমাজবাদি পার্টি ও বহুজন সমাজবাদি পার্টি এবং পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (মাক্সসিস্ট) মতো পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো যোগ দেয়। কারণ, এটা কোন মহাগাটবন্ধন (মহাজোট)-এর সূচনা হতে পারে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি’কে সামাল দিতে তারা এ নিয়ে আলোচনা করছে। তবে, এখন হয়তো আরেকটি সাহসী ও অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।

শেয়ার করুন