শ্রীলঙ্কার মুসলিম পরিচিতি এবং বৌদ্ধ চরমপন্থা

শ্রীলঙ্কার মুসলিম পরিচিতি এবং বৌদ্ধ চরমপন্থা

শেয়ার করুন

পৃথক রাষ্ট্রের জন্য লড়াইরত তামিল টাইগার বিদ্রোহীদের ২০০৯ সালে পরাজিত করার মাধ্যমে দীর্ঘ দিনের গৃহযুদ্ধ অবসান ঘটানোর পর শ্রীলঙ্কা এখন ধর্মীয় ঐক্য রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে। যুদ্ধ-পরবর্তীয় সময়ে বিশেষ করে বড়ো বালা সেনার (বিবিএস) মতো বৌদ্ধবাদী কট্টর গ্রুপগুলোর আবির্ভাবে তাদেরকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। কেন এমনটা হলো সেটা বোঝার জন্য জাতীয় পরিচিতি, জাতিগত ও সংখ্যালঘুদের অনুমিত আনুগত্য ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার।

বৌদ্ধ প্রাধান্যবিশিষ্ট শ্রীলঙ্কায় মুসলমানরা হলো মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ ভাগ। তারাই বিবিএসের মতো সংগঠনগুলোর প্রত্যক্ষ টার্গেট। তারা চাচ্ছে, মুসলমানদেরকে আইএসআইএসের মতো চরমপন্থীদের সাথে গুলিয়ে ফেলতে। উগ্রপন্থী গ্রুপগুলোর এই চেষ্টা সিংহলি ও মুসলিমদের মধ্যে সামাজিক ও মনোস্তাত্ত্বিক ফাটলের সৃষ্টি করেছে। গত ৩০ বছর ধরে শ্রীলঙ্কার মুসলিমদের মধ্যে যে পরিবর্তন ঘটেছে, সেটাকে ব্যবহার করেই তা করা হচ্ছে।

সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশ শ্রীলঙ্কায় মাদরাসা প্রকল্পে বিপুল অর্থ দিয়ে এই পরিবর্তনে জোরালো ভূমিকা পালন করেছে। শ্রীলঙ্কায় উগ্র মুসলিম মতাদর্শ বিস্তারের নেপথ্য কারণও এটা। আগে যেখানে সুফি মতাদর্শের প্রবল আধিপত্য দেখা যেত, এখন সেখানে রক্ষণশীলতার উপস্থিতি নজর কাড়ে।

শ্রীলঙ্কায় মুসলিম ঐতিহ্যের সূচনা সপ্তম শতকে। আরব বণিকেরা শ্রীলঙ্কায় বসতি স্থাপন করে তামিল ও সিংহলি মেয়েদের বিয়ে করেছিল। বর্তমান মুসলিমরা তাদেরই বংশধর। ১৫০৫ সালে পর্তুগিজদের হাতে নির্যাতন শুরুর আগে পর্যন্ত ক্যান্ডির রাজা মুসলিমদের রক্ষা করতেন, তাদেরকে দেশটির পূর্বভাগে বসতি স্থাপনের সুযোগ করে দিতেন। শ্রীলঙ্কার স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিমদের বিপুল ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে ড. টি বি জয়া, ড. এম সি এম খলিল, স্যার রাজিক ফরহাদ এবং ড. বদিরুদ্দিন মাহমুদের নাম উল্লেখযোগ্য।
মুসলিমরা শ্রীলঙ্কার প্রধান সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ব্যবস্থার সাতে নিজেদের আত্মস্থ করে নিয়েছিল। অনেক স্থানে মুসলিম ও সিংহলি নারীদের রাস্তায় একসাথে বসে সব্জি বিক্রি করতে দেখা যেত। তারা একে অপরের সহায়ক ছিল। একে অপরের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিহত।

২০ বছর আগেও মুসলিম আর সিংহলি নারীদের আলাদা করা যেত না। উভয় গ্রুপই শাড়ি পরতো। পার্থক্য ছিল, মুসলিম নারীরা শাড়ি দিয়ে মাথাও ঢেকে রাখত। কিন্তু এখন মুসলিম নারীরা পুরো মুখম-ল এবং দেহ বোরকায় ঢেকে রাখে।

লঙ্কার গৃহযুদ্ধের সময় সেখানকার মুসলিমরা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ছিল। সেনাবাহিনীর সাথে ছিল তাদের অবস্থান। এজন্য যুদ্ধের সময় তাদের বিপুল আত্মত্যাগ করতে হয়েছে। এলটিটিই তাদের ওপর চড়াও হতো। ১৯৯০ সালে বন্দুকের মুখে প্রায় ৭৫ হাজার মুসলিমকে উত্তরের এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।

সাধারণভাবে শ্রীলঙ্কার মুসলিমরা সমৃদ্ধ। তারা মাতৃভাষা হিসেবে তামিলকে গ্রহণ করেছে। তবে ইংরেজিতে বেশ ভালো। এতে করে স্বাধীন শ্রীলঙ্কায় তারা বেশ সুযোগ সুবিধা পেয়ে যায়।

যুদ্ধপরবর্তী শ্রীলঙ্কায় বিজয়ী প্রেসিডেন্ট মহিন্দা রাজাপাকসে মুসলমানদের কাছে ছিলেন জনপ্রিয়। তবে অবস্থা বদলে যায় ২০১৪ সালের ১৫ জুনের মুসলিমবিরোধী দাঙ্গায়। দক্ষিণ উপকূলীয় শহর আলুথগামান্দ এবং এর আশপাশের দর্গা, বেরুবেলায় মারাত্মক দাঙ্গা হয়। এই দাঙ্গার আগে বিবিএস নানা প্রচারণা চালিয়েছিল।

ওই দাঙ্গার সূচনা হয়েছিল বিবিএস প্রধান সন্ন্যাসী গালাগোড়া আথথে গনাসেরা উস্কানিমূলক বক্তব্যের পর। একটি অটো রিকশার মুসলিম মালিক এবং এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে পরিবহন করা এক ভ্যানচালকের মধ্যে কথা কাটাকাটি ১৯১৫ সালের পর শ্রীলঙ্কায় প্রথমবারের মতো বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূচনা ঘটায়। মুসলিমরা বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে আক্রমণ করেছে বলে প্রচার করে দাঙ্গার ভিত্তি প্রস্তুত করা হয়।

আলূথগামায় এক বক্তৃতায় ওই বৌদ্ধ নেতা মুসলিমদের সৌদি আরবে চলে যেতে বলেন। তিনি শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীকে সিংহলি সেনাবাহিনী এবং শ্রীলঙ্কার পুলিশকে সিংহলি পুলিশ হিসেবে অভিহিত করেন।

সাবেক প্রেসিডেন্টের ভাই এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী গোতাবায়া রাজাপাকসে বিবিএসকে পৃষ্ঠপোষকতা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ঘটনা যা-ই হোক না কেন, গৃহযুদ্ধে বিরাট কৃতিত্বের অধিকারী এই নেতা দাঙ্গা থামাতে তেমন কিছু করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

তিন বছর আগের ওই দাঙ্গাই রাজাপাকসে সরকারের শেষের সূচনা ঘটায় বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। এরপরের নির্বাচনে তামিলদের সাথে মুসলিমরাও একট্টাভাবে মাইথ্রিপালা সিরিসেনাকে ভোট দিয়ে রাজাপাকসেকে পরাজিত করে।

এরপর দুই বছর ধরে নতুন ঐক্য সরকারের চেষ্টা সত্ত্বেও ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ বেড়েই চলেছে। নতুন নতুন বৌদ্ধ উগ্রবাদী সংগঠনের বিস্তার ঘটেই চলেছে। একই অপরাধের জন্য মুসলিম কেউ দ্রুত শাস্তির মুখে পড়লেও বৌদ্ধরা নানা কৌশলে ছাড় পেয়ে যাচ্ছে।

এর ফলে যতই দিন যাচ্ছে, মুসলিমবিরোধী ভাবাবেগ বাড়তে দেখা যাচ্ছে। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে আলথগামা নগরীতে মোহাম্মদ সামসুদ্দিনের মালিকানাধীন মল্লিকাস নামের দোতলা একটি কাপড়ের দোকান পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ২০১৪ সালের দাঙ্গাতেও তার ব্যবসা পুরোপুরি ভস্মীভূত করা হয়েছিল।
তার দোকান পুড়ে যাওয়ার পর মুসলিম মালিকানাধীন আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একই পরিণতি বরণ করে।

মুসলিমরা বলছে, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে প্রায় ৩০টি। এমনকি মসজিদও আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু পুলিশ বলতে গেলে কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করেনি।

তবে সামসুদ্দিন এখনো মনে করছেন, তার দোকান পোড়ানোর ঘটনা বিচ্ছিন্ন একটি বিষয়। তার মতে, অন্তত ৯৬ ভাগ সিংহলি এগুলোকে জঘন্য অপরাধ মনে করে।

তবে এক সিংহলি ব্যবসায়ী পরিচয় প্রকাশ না করে বলেন, অর্থনৈতিক ঈর্ষা থেকে সিংহলি ব্যবসায়ীরা উগ্র বৌদ্ধদের দিয়ে এসব কাজ করিয়ে থাকতে পারে।

উগ্র বৌদ্ধদের সহিংসতায় মুসলিমদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। লরি ব্যবসায় জড়িত ৬২ বছর বয়স্ক এম এইচ জারুক বলেন, আমরা নমনীয় লোক। তবে এখন এসব কর্মকা- দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি। দাঙ্গায় আটটি গাড়ির সব এবং বাড়ি পর্যন্ত পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তিনি বাড়িটি আবার গড়েছেন, ব্যবসায় চালু করেছেন, কিন্তু তবুও রয়েছে আশা আর হতাশার মাঝামাঝিতে।

মুসলমানরা এখন সবসময়ই আতঙ্কে থাকে। গত মাসে বৌদ্ধ নেতার গ্রেফতারের সম্ভাবনা সৃষ্টি হতেই ভয়ঙ্কর কিছু ঘটনার আশঙ্কায় ভয়ে অস্থির ছিল মুসলমানরা।

দাঙ্গাপীড়িত এলাকায় মুসলিম ও সিংহলিদের সাথে আলাপকালে জানা যাচ্ছে, সমন্বয় কর্মসূচি গ্রহণ ছাড়াও সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আইন যাতে কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে সেটা নিশ্চিত করা। আলুথগামার শান্ত রাস্তাগুলো দিয়ে চলার সময় একসময় ভস্মীভূত বাড়িগুলোর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়াটা শান্তির বাণী প্রচার করে, শ্রীলঙ্কার সবার জন্য অভিন্ন জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির আবেদন জানায়।

print