দার্জিলিংয়ের গোলমালে গভীর ষড়যন্ত্র দেখছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

দার্জিলিংয়ের গোলমালে গভীর ষড়যন্ত্র দেখছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

কলকাতা প্রতিনিধি,
শেয়ার করুন

দার্জিলিং পাহাড়ের পরিস্থিতির ক্রমানবতির পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে মনে করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যেপাধ্যায়। শুক্রবার কলকাতায় রাজ্য সচিবালয় নবান্নে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, পাহাড়ের আন্দোলনকারীদের সঙ্গে জঙ্গী যোগ রয়েছে। মমতা সরাসিরি অভিযোগ করেছেন, গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার আন্দোলনের পেছনে মোর্চার আন্দোলনের পেছনে উত্তর পূর্ব ভারতের এবং বিদেশি জঙ্গীদের মদত রয়েছে। তিনি বলেন, পাহাড়ে যা হচ্ছে তা ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। বিষয়টি কেন্দ্রীয সরকারকে খতিয়ে দেখতে বলেছেন তিনি।

তবুও তিনি পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দার্জিলিং পরিস্থিতি নিয়ে আরোচনার জন্য ২২ জুন সর্বদল বৈঠক ডেকেছেন। মোর্চাকেও আন্দোলনের রাস্তা ছেড়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। 

ভূরাজনৈতিকভাবে দার্জিলিংয়ের অবস্থান কৌশলগত কারণেই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সেই দার্জিলিংকে মাঝে মাঝেই হিংসাত্মক আন্দোলনে উত্তপ্ত করার চেষ্টা চলছে। আলাদা গোর্খা রাজ্যের দাবিও শতাধিক বছরের পুরনো। তবে আশির দশকে গোর্খা জাতিসত্তার আবেগকে উসকে দিয়ে  নতুনভাবে আন্দোলন শুরু করেছিলেন সাবেক সেনা সুবেদার সুভাষ ঘিসিং। পরবর্তী সময়ে ঘিসিং ঘনিষ্ট বিমল গুরুং পাহাড় থেকে ঘিসিংকে বিতাড়িত করে পাহাড়ে একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। তবে কিছুদিন চুপ করে থাকার পর ভাষা বিতর্ককে ইস্যু করে তিনি ফের আলাদা গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছেন। রাজ্য সরকার পশ্চিমবঙ্গের সব স্কুলে বাংলা পড়ানো বাধ্যতামূলক বলে ঘোষনা করেছে। তবে সেই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন যে, পাহাড়ে নেপালিই হবে প্রথম ভাষা। বাংলা পড়তে হবে ঐচ্ছিক হিসেবে। কিন্ত মোর্চা নেতারা কথা মানতে চান নি। 

পশ্চিমবঙ্গ সরকার বারে বারে ঘোষনা করেছে যে, রাজ্যকে ভাঙতে দেওয়া হবে না। আর তাই মোর্চার আন্দোলন দমনে মুখ্যমন্ত্রী কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। অতিরিক্ত আধা সামরিক বাহিনী পাঠিয়েছেন পাহাড়ে। ছয় কলাম সেনাও রয়েছে সেখানে। আরও চার কোম্পানি আধাসেনা চেয়েছেন কেন্দ্রের কাছে। ইতিমধ্যেই কলকাতা থেকে আন্দোলন মোকাবেলায় জন আইপিএস অফিসারকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে সেখানে পাঠিয়েছেন। 

কিন্তু রাজ্য সরকারের কড়া অবস্থানের ফলে পাহাড়ের সব কটি আঞ্চলিক দল এক জোট হয়ে পড়েছে আলাদা রাজ্যের আবেগকে ইস্যু করে। এমনকি একসময়ের মমতা ঘনিষ্ট গোর্খা নেতারাও মোর্চার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। মমতার সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা করা গোর্খা জাতীয় মুক্তি মোর্চা জিএএলএফও সমস্ত বিভেদ খুলে মোর্চার সঙ্গে আন্দোলনে সামিল হযেছেন। আর তাই পরিস্থিতি ক্রমশ অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। 

গত কয়েকদিন ধরেই গোর্খা জনমুক্তি মোর্চ সমর্থকদের সঙ্গে পুলিশ নিরাপত্তা বাহিনীর ঘন ঘন সংর্ঘর্ষ হয়েছে। পুলিশ মোর্চার বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ কাদানে গ্যাস প্রয়োগ করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে সেনাবাহিনীকে নামাতে হয়েছে।  মোর্চার অভিযোগ শনিবার পুলিশের গুলিতে চার মোর্চা সমর্থকের মৃত্যু হয়েছে। নবান্নে সাংবাদিক সম্মেলনে অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী মেমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, পুলিশ গুলি চালায় নি। গুলি চালিয়েছে মোর্চাই। তবে মোর্চা নেতা বিনয় তামাং গুলিতে মৃত্যু নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। বনধকে পাহাড় থেকে সমতলে  ছড়িয়ে দিতে রবিবার ডুয়ার্সেও মোর্চা ১২ ঘন্টার বনধের ডাক দিয়েছে। এদিনই সিংমারি পুলিশ ক্যাম্পের কাছে কিরণ তামাঙ্গ নামে পুলিশের রিজার্ভ ব্যাটালিয়নের এক অ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ডান্টকে খুকরি দিয়ে মোর্চার বিক্ষোভকারীরা কুপিয়েছেন বলে অভিযোগ। তিনি মারা গিয়েছেন বলে প্রথমে সরকারি ভাবে ঘোষণা হলেও, পরে জানানো হয় তিনি আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন। 

প্রতিদিনই পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বিক্ষোভকারীরা পাথর বৃষ্টি করছে। গুলতি থেকে পাথর ছুড়ে পুলিশকে ঘায়েল করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। এর ফলে শনিবারই  ৩৫ জন পুলিশ কর্মী আহত হয়েছেন বলে পুলিশ দাবি করেছে।  মোর্চা সভাপতি বিমল গুরুং অজ্ঞাতস্থান থেকে এক বার্তায় বলেছেন, গোর্খাদের ওপর অত্যাচার চলছে। সবাইকে প্রশাসনের বিরোধিতা করতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে আন্দোলনে সামিল হতে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। পরে মোর্চার তরফে বিনয় তামাং বলেন, রাজ্যের সঙ্গে কোনও আলোচনা নয়, আলোচনা করা যেতে পারে একমাত্র কেন্দ্রের সঙ্গে। 

তবে কয়েকদিন আগেই কেন্দ্রীয স্বরাষ্ট্র মন্ততের তরফে দার্জিলিং নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকার সেই প্রস্থাব প্রত্যাখ্যান করায় কেন্দ্রীয সরকার আপাতত চুপ করে রয়েছে। তবে হঠাৎ পাহাড়ের পরিস্থিতির এমন অবনতি হল কেন তা রাজ্য সরকারের কাছে জানতে চেযেছে। রাজ্য সরকার ব্যাপারে একটি রিপোর্ট পাঠানোর প্রস্থুতি চালাচ্ছে। 

তবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোষণা করেছেন, মোর্চা ধরনের তান্ডব চালালে সরকার কড়া হাতেই তার মোকাবিলা করবে। নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী  পাহাড়ের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য যে ১৫টি উন্নয়ন পর্য়দ গঠন করেছিলেন তাদের প্রধানদের নিয়ে শনিবার  বৈঠক করেছেন। পরে সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, গণতন্ত্রে শান্তির কথা হয়। কথা বলতে আমাদের সমস্যা নেই। কিন্তু গন্ডগোল গণতন্ত্র দুটো এক সঙ্গে চলতে পারে না। তবে তিনি দাবি করেন,  শান্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সবাই কাজ করছে। 

শেয়ার করুন