ভারতে রাজ্য গঠনের সহিংস পথ

ভারতে রাজ্য গঠনের সহিংস পথ

শেয়ার করুন
গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে বিক্ষোভকারীদের ওপর টিয়ারগ্যাস ছুড়ছে পুলিশ, ছবি: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

গণতান্ত্রিক ভারতে বিতর্ক ও আলোচনার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য অসংখ্য প্রতিষ্ঠান-ইন্সটিটিউট গড়ে উঠলেও দেশটির গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের উল্লেখযোগ্য অংশ কিন্তু সাংবিধানিক পথে আসেনি। সহিংসতার হাত ধরে এসেছে।

সে জাতিগত, ভাষাগত বা ধর্মীয় যাই হোক না কেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও অন্যান্য নির্যাতিত গ্রুপগুলো শান্তিপূর্ণ উপায়ে যেসব দাবি জানাবে তা উপেক্ষা বা প্রত্যাখ্যান করা ভারতের ক্ষমতাসীন শ্রেণীর একটি স্বাভাবিক প্রবণতা। হতাশ হয়ে শেষ পর্যন্ত এসব আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠে। ক্ষমতাসীন মহল তখন এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে আধা সামরিক বাহিনী, নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনী লেলিয়ে দেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দাবিগুলো কমবেশি মেনে নেয়া হয়। ফলে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে সহিংস পথে গেলেই কেবল দাবি আদায় করা যেতে পারে।

অনগ্রসর সাব-গ্রুপগুলোর তরফ থেকে বৃহত্তর স্বায়ত্বশাসনের দাবি প্রায়ই ওঠছে। আর নতুন রাষ্ট্র বা প্রদেশ গঠনের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে সহিংসতা ভালো কিছু বয়ে আনছে।

ঊনিশ শতকের গোড়ার দিকে বঙ্গভঙ্গের পর থেকেই ভারতে প্রদেশগুলোর পূনর্গঠন একটি বিরোধপূর্ণ বিষয়। বঙ্গভঙ্গের পর ১৯০৬ সালে মহারাষ্ট্রের কংগ্রেস দলীয় স্টলওয়ার্ট বাল গঙ্গাধর তিলক বিশাল বোম্বাই প্রেসিডেন্সি ভাগ করে মারাঠিভাষী জনগণের জন্য আলাদা প্রদেশ গঠনের দাবি তোলেন। তখন বর্তমান গুজরাট রাজ্য, মহারাষ্ট্র ও কর্নাটকের কিছু অংশ এই প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত ছিলো। ১৯১৯ সালে কংগ্রেসের সম্মেলনে এই দাবি তোলা হয় এবং পরে তা অনুমোদন করা হয়। কারণ, তখন সবাই বুঝেছিলো প্রাদেশিক সরকারের কাজে গণতন্ত্র আনতে হলে ভাষার ভিত্তিতে প্রদেশের সীমানা নির্ধারণ জরুরি। আসলে তখন কংগ্রেসের বিভিন্ন ইউনিট ছিলো ভাষা-ভিত্তিক এবং এতে সেগুলো বেশ ভালোভাবে কার্যক্রম চালাতে পারতো।

১৯৩৮ সালে মারাঠিভাষী কিন্তু পিছিয়ে পড়া ও অবহেলিত বিধর্র্ভ এলাকা যখন আলাদা বিদর্ভ প্রদেশের দাবি তোলে তখন বিভিন্ন ভাষাভাষী গ্রুপগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি সামনে চলে আসে।

ভারত থেকে বৃটেন বিদায় নেয়ার পর, ১৯৪৮ সালে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দল ভারতের ভৌগলিক ইউনিটগুলো পুনর্গঠনের জন্য জওয়াহের লাল নেহেরু, বল্লভভাই প্যাটেল ও পাত্তাভি সিতারামাইয়াহ’কে নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টি; শত শত দেশীয় রাজ্যকে ভারতের অন্তর্ভুক্তি; কাশ্মির নিয়ে যুদ্ধসহ নানা কারণে স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতের সরকারগুলো এমনভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে প্রাদেশিক পুনর্গঠনের ইস্যুটি তখন চাপা পড়ে যায়।

পাঞ্জাব ও বাংলা ভাগ করে পাকিস্তান সৃষ্টির পরেই দিল্লিতে নেহেরুর নেতৃত্বাধিন কংগ্রেস বুঝে নিয়েছিলেন ভারতকে আর ভাগ করতে দেয়া যাবে না। ফলে নেহেরু সরকার ভাষা বা উপ-আঞ্চলিক ভিত্তিকে ভারতের উপ-বিভাজন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। তার মনে তখন বিচ্ছিন্নতাবাদি উপ-জাতীয়তাবাদ উত্থানের আশংকা তৈরি হয়।

কিন্তু এই নির্লিপ্তভাব বেশিদিন থাকেনি। বহুভাষী মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে ফের ভাষাভিত্তিক প্রদেশ গঠনের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। কংগ্রেস নেতা পত্তি শ্রিরামউলু তেলেগুভাষী অন্ধ্রপ্রদেশ গঠনের জন্য আমরণ অনশন শুরু করেন। অনশনে শ্রিরামউলুর মৃত্যুর পরেই কেবল তার দাবি বাস্তবে রূপ লাভ করে। তখন থেকে ভূখ-গত ও ভাষাভিত্তিক স্বশাসন অর্জনের জন্য জবরদস্তিমূলক পন্থা অবলম্বনের আরেকটি প্রবণতা তৈরি হয়।

ভাষাভিত্তিক প্রদেশ গঠনের বিরোধিতা করলেও নেহেরু ১৯৫৫ সালে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন গঠন করেন এবং এক বছর পর ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের ব্যাপারে কমিশনের সুপারিশ তিনি গ্রহণ করেন।

এরপর থেকে ভারতের মানচিত্র নতুন করে অঙ্কনের কাজটি চলতে থাকে এবং এখনো অনেক ইস্যু কার্পেটের নীচে চাপা পড়ে আছে। এগুলোর একটি হলো বোম্বাই প্রেসিডেন্সি ভাগ করে মারাঠি ও গুজরাটি ভাষাভাষী প্রদেশ গঠন ও বোম্বাই শহরের মর্যাদা। এই শহরে মারাঠিরা সংখ্যগুরু হলেও এর অর্থনীতি গুজরাটি ও অন্য ভাষাভাষী মানুষের হাতে।

গোটা ভারতের প্রেক্ষাপটে বোম্বাইয়ের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে নেহেরু শহরটিকে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে আলাদা একটি প্রশাসনিক ইউনিট করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই ভাবনা প্রবল বিরোধিতার সম্মুখিন হয়। মারাঠিরা বোম্বাইকে মহারাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তোলে। অন্যদিকে গুজরাটিরা বলে হয় একে গুজরাটে রাখতে হবে, তা নাহলে আলাদা প্রশাসনিক ইউনিট করতে হবে। ১৯৬০ সালে গিয়ে মারাঠিভাষী মহারাষ্ট্র ও গুজরাটিভাষী গুজরাট প্রদেশের সৃষ্টি করা হয়।

উত্তর পশ্চিম ভারতে ১৯৫০’র দশক থেকেই পাঞ্জাবের শিখ সম্প্রদায় পাঞ্জাবিভাষী আলাদা পাঞ্জাবি সুবা রাজ্য গঠনের দাবি তোলে। কিন্তু শিখ সন্তু ফাতেহ সিং বেশ কয়েকবার আমৃত্যু অনশন করার পরেই কেবল ১৯৬৬ সালে পাঞ্জাবভাষীদের নিয়ে আলাদা পাঞ্জাব রাজ্য গঠন করা হয়।

১৯৭০’র দশকের গোড়ার দিকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর আলাদা খালিস্তান রাজ্যের দাবিতে শিখরা সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। তবে ব্যাপক রক্তপাতের মধ্য দিয়ে ওই সংগ্রাম দমন করা হয়।

এদিকে, ভারতে পূর্বাঞ্চলে নাগারা পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। ভারত সরকার শক্তি দিয়ে এই সংগ্রামকে দমানোর চেষ্টা করলেও নয়া দিল্লি শেষ পর্যন্ত আলোচনায় বসে এবং ১৯৬৩ সালে আলাদা নাগাল্যান্ড রাজ্য গঠনে সম্মত হয়। মিজোরাও স্বাধীনতার দাবি তুললে সেখানে সামরিক অভিযান চালানো হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নয়া দিল্লি ১৯৮০’র দশকে আলাদা মিজো রাজ্য গঠন করে। কিন্তু আলাদা রাজ্যের জন্য বোড়োদের সশস্ত্র সংগ্রাম এখনো বাস্তবে রূপলাভ করেনি।

ভারতে অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর একটি হলো পশ্চিমবঙ্গে নেপালিভাষী গোর্খাদের আলাদা গোর্খাল্যান্ড গঠনের দাবি। দার্জিলিং, কালিম্পং ও শিলিগুড়ির কিছু অংশ নিয়ে এই রাজ্য গঠনের দাবি তোলা হয়েছে। ১৯০৭ সালে প্রথম এই দাবি তোলা হয়। কিন্তু বৃটিশ শাসকরা তা উপেক্ষা করে। ভারতের স্বাধীনতার পর ১৯৫০ সালে ফের এই দাবি সামনে এসে হাজির হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নেহেরু বিষয়টিকে হালকা করে দেন। ১৯৫৫ সালে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশনের কাছে বিষয়টি গেলেও তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।

কিন্তু ১৯৮১ সালে সুভাষ ঘিসিংয়ের নেতৃত্বে গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (জিএনএলএফ) গঠিত হলে এই ইস্যু চরম পন্থা ও সহিংতার দিকে মোড় নেয়। ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যে ১২,০০ জনের বেশি নিহত হয়। তবে, সেই একইভাবে ওই সহিংসতার জের ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই সীমিত ক্ষমতা দিয়ে গোর্খা টেরিটরিয়াল এডমিনিস্ট্রেশন সৃষ্টি করা হয়।

জিএনএলএফ’র উত্তরসূরি গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা (জিজেএম) নতুন প্রশাসন প্রত্যাখ্যান করে পুরোপুরি গোর্খাল্যান্ড গঠনের দাবি তুলেছে। তবে, এখন মৌখিকভাবে এই দাবি তোলা হয়েছে। জিজেএম নির্বাচনী রাজনীতি করে এবং কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পর্টি (বিজেপি)’র মিত্র।

কিন্তু সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি আকস্মিকভাবে সকল স্কুলের জন্য বাংলা ভাষা বাধ্যতামূলক বলে ঘোষণা দেয়ার পরই গত সপ্তাহে ব্যাপকভাবে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার সেনাবাহিনী তলব করে। সহিংসতা চলাকালে বহু যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করা হয়। পুলিশের গুলিতে একজন নিহত হয়েছে।

দার্জিলিংয়ের বিজেপি ইউনিট আলাদা গোর্খাল্যান্ড গঠনের পক্ষে হলেও পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি এর কট্টর বিরোধি। কারণ, পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যাগুরু বাংলাভাষী মানুষ আলাদা গোর্খাল্যান্ড গঠনের বিপক্ষে। একই কারণে কংগ্রেস ও মার্কসবাদিদের মনোভাবও একই।

‘কোন ছাড় দেয়া হবে না’ মনোভাব মমতার। “সন্ত্রাসীরা এই সহিংসতা উসকে দিচ্ছে। আমি জীবন দিয়ে দেবো, কিন্তু বাংলাকে ভাগ হতে দেবো না,” ঘোষণা তার।

শেয়ার করুন