ওবিওআর উদ্যোগ: চীন- শ্রীলংকা সহযোগিতার উজ্জ্বল ভবিষ্যত

ওবিওআর উদ্যোগ: চীন- শ্রীলংকা সহযোগিতার উজ্জ্বল ভবিষ্যত

ইয়ি শিয়াংলিং,
শেয়ার করুন

১৪-১৫ মে, বেইজিংয়ে সফলতার সঙ্গে অনুষ্ঠিত হলো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক ‘বেল্ট এন্ড রোড ফোরাম’ (বিআরএফ)’র শীর্ষ সম্মেলন। বিশ্বের ২৯টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান এবং ১৩০টি দেশ ও ৭০টি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা এতে যোগ দেন।

শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমসিঙ্ঘের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সম্মেলনে যোগ দেয়। তাদের এই যোগদান ছিলো ‘বেল্ট এন্ড রোড’ উদ্যোগ ও সম্মেলনের প্রতি শ্রীলংকা সরকারের অঙ্গীকারের বহি:প্রকাশ। গ্রীষ্মের প্রারম্ভে যখন প্রতিটি জীবন্ত বস্তু পূর্ণ সতেজতায় পরিপূর্ণ তখনই সম্মানিত অতিথি ও মহান চিন্তানায়কেরা একবিংশ শতকের প্রকল্প বিআরআই এগিয়ে নিতে ও এ থেকে সুফল হাসিলের জন্য একত্রিত হন।

বিআরএফ’র আগে-পরে মিলিয়ে জাতীয় সরকার, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বহু সংখ্যক চুক্তি সই হয়। পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ২৭০টির বেশি চুক্তি সই হয়েছে। এই ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে নীতি, অবকাঠামো, বাণিজ্য, আর্থিক ও মানুষে-মানুষে কানেকটিভিটি।

১. সময়ের দাবি বিআরআই
ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি। সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ দুটিই হাজির করেছে এই পরিবর্তন। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক নতুন পরিকল্পনা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক ২০৩০ এজেন্ডা। এর কোর এজেন্ডা টেকসই উন্নয়ন। বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে বহু উন্নয়ন কৌশল ও কানেকটিভিটি সহযোগিতা উদ্যোগ সামনে হাজির করা হলেও বিশ্ব অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের গতি মাঝারি। মন্দার ঝুঁকি রয়ে গেছে এখনো।

বিশ্ববাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি এখনো থমকে আছে। বিধি-ভিত্তিক (রুলস-বেজড) বহুপক্ষীয় বাণিজ্য গোষ্ঠী এখনো শক্তিশালী হয়নি। বিশ্বব্যাপী অসংখ্য অবকাঠামো নির্মাণ তহবিলের অভাবে আটকে আছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো কিছু অভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখিন — দারিদ্র বিমোচন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন। তাই উন্নয়নের নতুন পথ খুঁজে পাওয়া ও প্রবৃদ্ধিতে নতুন গতি আনা যাবে কিভাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে বিশ্বকে একটি সুষ্পষ্ট কার্যপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।
আর তাই প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, “চীন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারে না। বরং সে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ও নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে চায়। চীন তার বক্তব্য শোনাতে চায়, এবং চায় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আরো বেশি করে চীনা উপাদান প্রবিষ্ট করতে।”

চীনের অর্থনীতির পাশাপাশি জাতীয় শক্তিমত্তা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় বিশ্বের অর্থনৈতিক শাসন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণে তার সামর্থ্য ও ইচ্ছাও বাড়ছে। বিশ্বয়ন কি আলিবাবার সাক্ষাত পাওয়া রত্মভা-ার, নাকি গোলযোগভর্তি প্যান্ডোরা বক্স তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে অনেকদিন ধরে বিতর্ক চলছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি ডাভোসে ২০১৭ সালের ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামের সম্মেলন ও বেইজিংয়ের বিআরএফ ফোরামে এর উত্তর দিয়েছেন। অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের পক্ষে চীনের কণ্ঠ এখন সবচেয়ে উচ্চকিত। বিআরআই উদ্যোগ নিয়েছে চীন। সে বিশ্বায়ন ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নিতে চায় বিশ্বের অর্থনীতিকে আরো বড় করে তুলতে। যেসব দেশ শান্তি ও উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে তারা যেন উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারে তাই তাদেরকে এ পথে আসতে সে উদ্বুদ্ধ করছে।

২. উন্নয়ন কৌশলকে শ্রেণীবদ্ধ করে বিশ্বকে সংযুক্ত করছে বিআরআই
বিআরআই মানে ঘনিষ্ট সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়ন কৌশলসহ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার। এর মধ্যে রয়েছে উত্তর-দক্ষিণ, দক্ষিণ-দক্ষিণ ও ত্রিভুজ সহযোগিতা এগিয়ে নেয়া। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ‘বেল্ট ও রোড’-এর দেশগুলোর ভৌত, প্রাতিষ্ঠানিক ও মানুষে-মানুষে যোগাযোগ উন্নত হবে। আর এ কাজটি করা হবে বৈশ্বিক মূল্য শেকলে যোগদানের জন্য শিল্পগত সহযোগিতা, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও আ লিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে।

মানুষে-মানুষে যোগাযোগ বাড়ানো; শন্তি, ন্যায়বিচার, সামাজিক সংসক্তি, অন্তর্ভুক্তি, গণতন্ত্র, সুশাসন, আইনের শাসন, মানবাধিকার, লিঙ্গ সমতা ও নারী ক্ষমতায়ন জোরদার; সব ধরনের ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই; সমাজের অবহেলিত শ্রেণীর প্রতি অধিকতর দায়িত্বশীল হওয়া; এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শাসন জোরদার এবং উন্নয়নের সুযোগ ও সুবিধায় সবার সমান প্রবেশ নিশ্চত করতে বিআরআই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

ভারসাম্য ও সমন্বিত পদ্ধতিতে ত্রিমাত্রিক টেকসই উন্নয়ন অর্জনের জন্য বিআরআই দেশগুলোকে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই পদ্ধতিতে রক্ষণাবেক্ষণ; মহাসাগর ও সাগর, সুপেয় পানি, বন, পর্বত ও শুষ্কভূমি সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার; জীববৈচিত্র, বাস্তুতন্ত্র ও বন্যপ্রাণীর সুরক্ষা; মরুকরণ, ভূমিক্ষয় ও পরিবেশ পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা বলে।

৩. শ্রীলর্ংকার প্রবৃদ্ধি সম্ভাবনা বাড়িয়েছে বিআরআই
অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর জন্য সুফল হাসিলের লক্ষ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিআরআই। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়া ই বলেন, “চীন এযাবতকাল যতগুলো আন্তর্জাতিক পণ্য সরবরাহ করছে বিআরআই সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উদ্যোগটি চীনের, বিন্তু এর ফলে যে সম্ভবনা তৈরি হয়েছে তার ভাগিদার গোটা বিশ্ব।”

শ্রীলংকা ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার অমিত সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে দ্বীপদেশটি ভারত মহাসাগরের একটি আর্থিক ও লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য লড়াই করছে। এই উন্নয়ন লক্ষ্য অনেকাংশেই একবিংশ শতকের সামুদ্রিক সিল্ক রোডের উদ্দেশ্যে সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। চীন ও শ্রীলংকা উন্নয়ন কৌশলগুলো সমন্বয় করতে পেরেছে এবং সংলাপ ও আলোচনার মধ্য দিয়ে যৌথভাবে একবিংশ শতকের সামুদ্রিক সিল্ক রোড নির্মাণ করছে।

অভিন্ন লক্ষ্য অনুসরণের মধ্য দিয়ে চীন ও শ্রীলংকা অবকাঠামো সুবিধা অবকাঠামো নেটওয়ার্ক জোরদার করতে পারে। শ্রীলংকার ভৌগলিক অবস্থান একে ভবিষ্যৎ জাহাজ শিল্পের জন্য এক বিপুল সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। তাই উন্নয়নের সুযোগ গ্রহণ করতে পারণে আন্তর্জাকি জাহাজ নির্মাণের বাজারে তাদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অনেক জোরদার হবে।
মুক্তবাণিজ্য অ ল গঠন ও মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা জোরদার করলে তা দু’দেশের জনগণের জন্যই কল্যাণকর হবে। বৈশ্বিক মূল্য শেকলের উন্নয়ন ও সরবরাহ শেকলে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের ব্যাপারে শ্রীলংকা সরকার প্রবল আগ্রহ দেখিয়েছে। হামবানতোতা লজিস্টিক ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন যত দ্রুত কার্যকর হবে তত দ্রুত শ্রীলংকার মৌলিক শিল্পব্যবস্থার ভিত্তি মজবুত হবে বলা যায়।
শ্রীলংকা কলম্বোতে একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক নগরী গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে। আমাদের দু’দেশ আর্থিক অবকাঠামো কানেকটিভিটি জোরদার করতে পারে। তারা একটি দীর্ঘমেয়াদি, স্থিতিশীল ও টেকসই আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে যৌথভাবে কাজ করতে পারে। ব্যাংক অব চায়না কলম্বোতে দক্ষিণ এশীয় শাখা খুলেছে। তাছাড়া শ্রীলংকা তার আর্থিক সামর্থ্য জোরদার করতে সিল্ক রোড তহবিল, চায়না উন্নয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক অব চায়না ও এশিয়া ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের সহায়তা নিতে পারবে।

পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা ক্ষেত্রেও দু’দেশ সহযোগিতা জোরদার করতে পারে। শ্রীলংকায় একটি ব্যাপকভিত্তিক দুর্যোগ সতর্কীকরণ, ব্যবস্থাপনা ও সাড়াদান কেন্দ্র ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চীন প্রস্তুত হয়ে আছে।

চীন ও শ্রীলংকা দু’দেশেরই দীর্ঘ ইতিহাস ও উজ্জ্বল সভ্যতার নিদর্শন রয়েছে। পর্যটন উন্নয়ন ও বিশ্বসংস্কৃতি ও প্রাকৃতি ঐতিহ্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে উভয় পক্ষ সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় নিয়ে সংলাপ জোরদার করতে পারে।

৪. অতীত কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে বিআরআই
শ্রীলংকার সবচেয়ে বড় অবকাঠামো নির্মাণ অংশীদার ও বিদেশী বিনিয়োগের প্রধান উৎস চীন। চীন-শ্রীলংকা অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতা শ্রীলংকায় হাজার হাজার কর্ম সৃষ্টি করেছে। হাজার হাজার প্রযুক্তিবিদ ও ব্যবস্থাপককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। ২০১৬ সাল পর্যন্ত চীনা কোম্পানিগুলো শ্রীলংকায় ১৫.৫ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শেষ করেছে। এছাড়া ২ বিলিয়ন ডলারের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ শ্রীলংকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।

বিআরএফ ফোরামে চীনা প্রেসিডেন্ট চলতি অর্থবছরে শ্রীলংকাকে ৮.৮ বিলিয়ন রুপি সহায়তা দেয়ার কথা ঘোষণা করেন। আগামী বছর এই সহায়তার পরিমাণ দাঁড়াবে ৪৪ বিলিয়ন রুপি। চীন ও শ্রীলংকা চারটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এগুলো হলো: চীন-শ্রীলংকা ইকনমিক এন্ড টেকনিক্যাল কোঅপারেশন এগ্রিমেন্ট, আউটলাইন অব দি মিডিয়াম এন্ড লং-টার্ম ডেভলপমেন্ট প্লান ফর ইনভেস্টমেন্ট, ইকনমিক এন্ড টেকনলজিক্যাল কোঅপারেশন এবং ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট ফর দি প্রমোশন অব ইনভেস্টমেন্ট এন্ড ইকনমিক কোঅপারেশন, ফাইন্যান্সিং কোঅপারেশন এগ্রিমেন্ট।
প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা ও প্রধামন্ত্রী বিক্রমসিঙ্ঘে উভয়েই বিআরআই-এ সক্রিয়ভাবে যোগদানের ব্যাপারে তাদের আগ্রহ ব্যক্ত করছেন। তারা শ্রীলংকাকে একটি ‘ইন্ডিয়ান ওশান হাব’-এ পরিণত করতে চান। সময় এগিয়ে যাচ্ছে, একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য আমরা একই সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহভবে অপেক্ষা করছি। বিআরআই একটি দীর্ঘ-মেয়াদি সহযোগিতার রূপরেখা। এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আমরা শ্রীলংকার সঙ্গে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। দেশটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে আমরা সহযোগিতা করতে চাই। চীন সর্বদা তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করে এসেছে। চীন যে শ্রীলংকার সত্যিকারের বন্ধু তা সময়ই বলে দেবে।

(লেখক শ্রীলংকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত)

print
শেয়ার করুন