ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজেপির বিস্ময়কর প্রার্থী রামনাথ কোবিন্দ

ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজেপির বিস্ময়কর প্রার্থী রামনাথ কোবিন্দ

শেয়ার করুন
বিহারের গভর্নর ও এনডিএ’র প্রেসিডেন্ট প্রার্থী রাম নাথ কোবিন্দ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি’র সঙ্গে সাক্ষাত করেন, ছবি: এএনআই

ভারতের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে ভারতীয় জনতা পার্টি শেষ পর্যন্ত বিস্ময়কর প্রার্থী বিহারের গভর্নর রামনাথ কোবিন্দের নাম ঘোষণা করেছে। গত মাসাধিককাল নিয়ে অনেকের নাম প্রার্থী হিসেবে চর্চায় এলেও রামনাথ কোবিন্দের নাম কখনও শোনা যায়নি। ফলে এই ঘোষণায় বিজেপি সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সোমবার নেদারল্যান্ড যাবার পথে দুবাই বিমান বন্দরে বিদ্রুপের সঙ্গে বলেছেন, ‘কে কোবিন্দ ? তাঁকে চিনি না। নামও কোনও দিন শুনিনি। দেশে তো অনেক দলিত নেতা রয়েছেন। বিজেপির দলিত নেতা বলেই প্রার্থী হয়ে গেলেন। আগামী ২২ জুন বিরোধীদের বৈঠকে যা বলার বলা হবে। আমার তো মনে হয় সুষমা স্বরাজ, আদবানী বা প্রণব মুখার্জিকেই প্রার্থী করলে ভাল হত।’ বিজেপির অন্যতম সহযোগী দল শিবসেনাও রীতিমতো ক্ষুব্ধ। শিবসেনার তরফে সঞ্জয় রাউত বলেছেন, ‘বিজেপি একাই রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীর নাম ঠিক করেছে। এ নিয়ে ন্যাশনাল ডেমোক্রাটিক এলায়েন্সের (এনডিএ) কারও সঙ্গে আলোচনা করেনি।’ কমিউনিষ্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (সিপিআই) তরফে ইতিমধ্যেই বিরোধী প্রার্থী দাঁড় করানোর কথা জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

সবাইকে বিস্মিত করে দিয়ে সোমবার বিকেলে বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে বিহারের বর্তমান গভর্নর রামনাথ কোবিন্দের নাম ঘোষণা করেছেন। শাহ বলেছেন, ‘দীর্ঘদিন দলিত ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর জন্য লড়াই করেছেন কোবিন্দ।’ সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি জানান, বিজেপির সংসদীয় দলের বৈঠকে এনডিএ প্রার্থী হিসেবে কোবিন্দের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী নিয়ে কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং। তবে কংগ্রেস সভানেত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, আলোচনা করেই উত্তর জানানো হবে। রাষ্ট্রপতি পদে সর্বসম্মত প্রার্থী দেয়ার প্রস্তাব নিয়ে ক’দিন আগেই কংগ্রেস সভানেত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন বিজেপির দুই বর্ষীয়ান নেতা রাজনাথ সিং ও বেঙ্কাইয়া নাইডু। গত সপ্তাহেই এনডিএর শরিক দল এবং বিরোধী দল গুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ঐকমত্য তৈরির জন্য বিজেপি সভাপতি বিজেপির তিন বর্ষীয়ান মন্ত্রী, রাজনাথ সিং, অরুণ জেটলি এবং বেঙ্কাইয়া নাইডুকে নিয়ে একটি প্যানেল গঠন করে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এরা সকলের সঙ্গেই সর্বসম্মত প্রার্থী দেবার কথা বললেও বিজেপি আগে থেকে কোনও নাম প্রস্তাব করেনি। বরং বিরোধীরা কাকে পছন্দ করেন সেই নামই জানতে চেয়েছিলেন বিজেপির মন্ত্রীরা।

গত এক মাস ধরে সুষমা স্বরাজ থেকে শুরু করে সুমিত্রা মহাজন, আরএসএস নেতা মোহন ভাগবত, আদিবাসী নেতা দ্রৌপদী মুর্মু, ইনফোসিসের প্রতিষ্ঠাতা এনআর নারায়ণ মূর্তি, শিল্পপতি রতন টাটা, অর্থনীতিবিদ স্বামীনাথন-এমন অনেক নাম নিয়েই আলোচনা হয়েছে। বিরোধী শিবিরেও মহাত্মা গান্ধীর প্রৌত্র পশ্চিমবঙ্গের সাবেক গভর্নর ও কূটনীতিক গোপাল কৃষ্ণ গান্ধী ও আইনজীবী ফলি নরিম্যানের নাম নিয়ে র্চ্চা হয়েছে।

বিজেপির মেন্টর হিসেবে পরিচিতি সংঘ পরিবার বারে বারে বিজেপির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী মোদীকে নানা ঘরোয়া আলোচনায় আগেই জানিয়ে দিয়েছিল যে, সংঘ মতাদর্শে বিশ্বাসী কাউকে প্রার্থী করার সুযোগ হাতছাড়া করা চলবে না। মোদীও এক আলোচনায় লালকৃষ আদবানীকে প্রার্থী করে গুরু দক্ষিণা দেবার কথা বলেছিলেন। কিন্তু আদবানী বা মুরলী মনোহর যোশীর মত বিজেপির শীর্ষ নেতারা ইতিমধ্যে বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলায় ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে অভিযুক্ত হয়েছেন। তাই এদের নাম বিজেপির প্রার্থী তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে আগেই। অবশ্য আগামী দিনের রাজনীতির কথা মাথায় রেখে বিজেপি দলিতদের থেকে প্রার্থী করার ভাবনা নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল বলে বিজেপির সূত্রে জানা গিয়েছিল।

এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজেপির দখলে রয়েছে প্রায় ৪৮.৪ শতাংশ ভোট। কিছুদিন আগে উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখন্ডের বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল সাফল্য এবং চারটি রাজ্যে সরকার গঠনের পরে বিজেপির ঘরে জয়ের জন্য ভোটের ঘাটতি সামান্যই।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ইলেক্টরাল কলেজ তৈরি হয় দেশের ৭৭৬ জন সাংসদ এবং ৪১২০ জন বিধায়কের ভোটের সমন্বয়ে। ইলেক্টোরাল কলেজের মোট ভোট মূল্য হল ১০,৯৮,৮৮২। জিততে হলে দরকার ৫,৪৯,৪৪২ মূল্যের ভোট। জটিল আনুপাতিক পদ্ধতিতে এই ভোটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এনডিএ-র দখলে ছিল ৪,৭৪, ৩৬৬ মূল্যমানের ভোট। তবে বিধানসভা নির্বাচনে সাফল্য ও চার রাজ্যে সরকার গঠনের ফলে তা বর্তমানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৫,২৯৩৯৮। অর্থাৎ সামান্যই ঘাটতি রয়েছে। তবে এই ঘাটতি মেটাতে তামিলনাডুর অল ইন্ডিয়া দ্রাবিড় মুনেত্রা কাঝাঘাম (এআইডিএমকে) (ভোটমূল্য ২৩,৫৮৪) বা গোয়ার গোয়া গোমন্তক দল এবং অন্যান্য ছোট ছোট দল ও নির্দলীয়দের এক জায়গায় এনে তা যোগাড় করা এনডিএ-র পক্ষে আদৌ কঠিন নয়।

বিজেপির ঘোষিত প্রার্থী যে পরিচিত রাজনীতিক নয় সেটা সকলেই স্বীকার করে নিয়েছেন। আর তাই এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

৭০ বছরের রামনাথ কোবিন্দ উত্তরপ্রদেশের কানপুরের দলিত সম্প্রদায়ের নেতা। পেশায় আইনজীবী কোবিন্দ কাজ করেছেন সুপ্রিম কোর্টে। ১৯৯৮ থেকে ২০০২ পর্যন্ত বিজেপির দলিত মোর্চার সর্বভারতীয় সভাপতিও ছিলেন তিনি। তার পাশাপাশি দীর্ঘদিন দলের জাতীয় মুখপাত্রের দায়িত্বও সামলেছেন। ১৯৯৪ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। ২০১৫ সালের ৮ আগস্ট বিহারের গভর্নর পদে কোবিন্দকে নিয়োগ করা হয়।

রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ঘোষণা করলেও উপরাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী নিয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি বিজেপির তরফে। অথচ উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারির মেয়াদও শেষ হয়ে যাবে বছরের শেষ দিকে।

এনডিএ–র বাইরের চারটি দলের সমর্থন ইতিমধ্যেই পেয়ে গেছে বিজেপি। সমর্থনের কথা জানিয়ে দিয়েছেন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী বিজু জনতা দলের নেতা নবীন পট্টনায়ক, টিআরএস নেতা তথা তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর রাও, ওয়াইএসআর কংগ্রেস নেতা জগন্মোহন রেড্ডি, ও পুদুচেরির এআইএনআরসি নেতৃত্ব। ফলে ভোটের দৌড়ে অনেকটা দূর এগিয়ে গেছে বিজেপি। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার তাঁর রাজ্যের রাজ্যপাল রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ায় ব্যক্তিগতভাবে সন্তোষপ্রকাশ করলেও সমর্থনের প্রশ্নে স্পষ্ট ইঙ্গিত না দিয়ে বলেছেন, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে বিরোধীদের বৈঠকে। ২২ তারিখে ইউপিএ ও সহযোগী দলগুলি প্রার্থী নিয়ে বৈঠকে বসবে। ইতিমধ্যে মায়াবতী জানিয়ে দিয়েছেন, দলিত প্রার্থীর প্রতি তাঁদের মনোভাব অবশ্যই সদর্থক, তবে বিরোধীরাও দলিত প্রার্থী দিচ্ছেন কিনা দেখে নিয়ে তাঁরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবেন।

তবে বিরোধী শিবির বিজেপির দলিত প্রার্থীর পাল্টা হিসেবে নিজেদের দলিত প্রার্থী বাছাই করার জন্য তোড়জোড় শুরু করেছে। কংগ্রেসের তরফে সাবেক লোকসভার স্পীকার মীরাকুমার বা সুশীল কুমার সিন্ধের নাম প্রস্তাব করা হতে পারে। বামপন্থীরা এখন বাবাসাহেব আম্বেদকারের পুত্র প্রকাশ আম্বেদকারের নাম নিয়ে ভাবনা চিন্তা করছে। বিরোধরিা দলিত প্রার্থী না দিলে মায়াবতী, নীতিশকুমার সহ অনেকের পক্ষে এনডিএ-র প্রার্থরে বিরোধীতা কঠিন হবে।

print
শেয়ার করুন