ভারতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: দলিত বনাম দলিত

ভারতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: দলিত বনাম দলিত

শেয়ার করুন
মিরা কুমার এবং রাম নাথ কোবিন্দ’

ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স (এনডিএ)’র প্রেসিডেন্ট পদপার্থী হিসেবে দলিত সম্প্রদায়ের রাম নাথ কোবিন্দ’র নাম ঘোষণার পর থেকেই তার মোকাবেলায় কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো একজন দলিত প্রার্থী দাঁড় করানোর চেষ্টা করছিলো। অবশেষে বিরোধী দলগুলোর ঐক্যমত্যের প্রার্থী হিসেবে মিরা কুমারের নাম ঘোষণার পর ভারতে ১৭ জুলাইয়ের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন মূলত দলিত বনাম দলিতের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

শ্রেণীভিত্তিক হিন্দু সমাজ ব্যবস্থায় দলিতরা হলো সর্বনিম্ন শ্রেণীর। একসময় এদেরকে ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতিতে সামাজিক ন্যায়বিচার সর্বোচ্চ বিবেচনার স্থানে রাখা হয়।

বৃহস্পতিবার ১৭টি বিরোধী দল পার্লামেন্টের লবিতে আলোচনায় বসে। তারা এনডিএ প্রার্থী কোবিন্দের বিরুদ্ধে আরেক দলিত শ্রেণীভুক্ত ব্যক্তিত্ব লোকসভার সাবেক স্পিকার মিরা কুমারকে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেয়।

আলোচনার পর কংগ্রেসের এমপি গোলাম নবী আজাদ বলেন, ‘আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে বিরোধী দলগুলো সর্বসম্মতভাবে মিরা কুমারের নাম প্রস্তাব করে।’

মিরা কুমারকে ‘সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য একজন ক্রুসেডার’ হিসেবে আখ্যায়িত করে নবী বলেন, তার চেয়ে যোগ্য প্রার্থী আর হতে পারে না।
মার্ক্সবাদি কমিউনিষ্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেন, ‘মিরা কুমার, সুশিল কুমার সিন্ধি, বালাচন্দ্র মুঙ্গেকর ও প্রকাশ আম্বেদকরের নাম বিবেচনা করা হয়। এদের মধ্যে সবাই একটি পয়েন্টে মিরা কুমারের ব্যাপারে একমত হয়। তিনি বিরোধীদলগুলোর সর্বসম্মত প্রার্থী। তাকে সমর্থন দিতে আমরা অন্যান্য বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’

একজন বিরোধী দলীয় প্রার্থীর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ইয়েচুরি বলেন, ‘এটা একটি রাজনৈতিক লাড়াইয়ের প্রশ্ন – আমাদের সংবিধান কি সুরক্ষিত থাকবে, নাকি আরএসএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংজ্ঞ) দেশটিকে একটি হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করবে।

বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি)’র প্রধান লালু প্রসাদ পার্লামেন্টের বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বলেন, এনডিএ’র বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলো একটি আদর্শিক লড়াই লড়ছে। এখানে প্রার্থীর যোগ্যতা ও অযোগ্যতা নিয়ে লড়াই হচ্ছে না।

ঐক্যবদ্ধ জনতা দল (জেডিইউ) বাদে আর যেসব দল কংগ্রেস নেতৃত্বাধিন বৈঠকে যোগ দেয় সেগুলোর মধ্যে ছিলো তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি), জানাদা দল (জেডিএস), কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া-মার্ক্সিস্ট (সিপিআইএম), কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (সিপিআই), ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ (আইইউএমএল), অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এআইইউডিএফ), কেরালা কংগ্রেস, সমাজবাদি পার্টি (এসপি), বহুজন সমাজবাদি পার্টি (বিএসপি), ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি), ন্যাশনাল কনফারেন্স (এনসি), জেএমএম, রাষ্ট্রীয় লোকদল (আইএলডি), রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) ও দ্রাভিদা মুনেত্রা কাজাঘাম (ডিএমকে)।

বিরোধী দলীয় নেত্রী সোনিয়া গান্ধি যদিও বলছেন যে, তারা তাদের প্রার্থীকে জাত বা ধর্মের ভিত্তিতে বিবেচনা করছেন না, কিন্তু বিরোধী দলগুলো সম্মিলিতভাবে একজন দলিত মিরা কুমারকে মনোনীত করে মোদি-শাহ জুটির প্রার্থীর বিরুদ্ধে একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।

কোনিন্দ’র মতো মিরা কুমারও দলিত শ্রেণী থেকে এসেছেন। তিনি ছিলেন লোকসভার প্রথম নারী স্পিকার। কেন্দ্রিয় মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। ভারতে দলিত আইন হিসেবে পরিচিত পরলোকগত জগজীবন রামের মেয়ে মিরা কুমার একজন সাবেক কূটনীতিক।

সাউথ এশিয়ান মনিটরের কলামিস্ট সুবীর ভৌমিক এনডিএ’র প্রার্থী পছন্দের ব্যাপারে লিখেন, ‘ বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট ও মধ্য প্রদেশের মতো বিজেপি’র শক্তিশালী ঘাঁটিগুলোতে যখন কৃষক বিক্ষোভ চলছে, তখন নিম্নবংশের কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা কোবিন্দকে বেছে নিয়ে বিজেপি গ্রামীণ দরিদ্রদের প্রতি তার দরদ তুলে ধরতে পারবে। এতে শুধু উত্তর প্রদেশ নয় গোটা উত্তর ভারত জুড়ে নিম্নজাতের মানুষের কাছে বিজেপি’র জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘কোবিন্দ’র বিজয় নিশ্চিত করতে বিজেপি এখন নিম্নজাতভিত্তিক দলগুলোর সমর্থন সহজেই হাসিল করতে পারবে। শুধু তাই নয়, ক্ষমতাসীন দলটি সেক্যুলার বিরোধী শিবিরে বিভক্তি সৃষ্টির মাধ্যমে ২০১৯ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনের জন্যও ওইসব দলের সমর্থন নিশ্চিত করতে পারবে।’

কিন্তু, ফার্স্টপোস্ট পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক অজয় সিং লিখেন, ‘যদি মনে করা হয় যে দলিতদের বিজেপি শিবিরে নিয়ে আসতে কোবিন্দকে বাছাই করা হয়েছে তাহলে তা গুরুতর ভুল হবে। আসলে কোবিন্দকে বাছাই করা হয়েছে সমাজের ওই অংশটির মধ্যে হিন্দুত্বকে আরো গভীরভাবে প্রবিষ্ট করানোর জন্য। সংঘ পরিবারের ভাবদর্শীদের জন্য সমাজের ওই অংশ অগম্য হয়ে আছে। কোবিন্দ’র নির্বাচন নিশ্চিতভাবে ‘হিন্দুত্ব পরিচয়’ সুসংহত করার বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্পের একটি অংশ।

মজার ব্যাপার হলো, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নিতিশ কুমার ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি সোনিয়া গান্ধিকে বিজেপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে যৌথভাবে একজন প্রার্থী মনোনয়নের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনিই শেষ পর্যন্ত এনডিএ প্রার্থী রাম নাথ কোবিন্দকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ, বেশ শান্তিতে রাজ্য শাসন করছেন। তিনি কখনোই সরকারের সঙ্গে কোন সাংঘর্ষিক পথে যাননি।

যদিও নিতিশ কুমারের ডিগবাজি গেরুয়া শিবিরের বিরুদ্ধে বিরোধী শিবিরের আদর্শিক লড়াইয়ের জন্য একটি বড় আঘাত, কিন্তু জেডিইউ নেতা কে সি তেয়াগি জোর দিয়ে বলেছেন যে এতে বিরোধী দলগুলোর ঐক্যে কোন প্রভাব পড়বে না।

বিজেপি ও তার মিত্র দলগুলোর জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল একরকম সুনিশ্চিত। আঞ্চলিক দলগুলোর সমর্থন নিয়ে এখন তাদের হাতে ৬০ শতাংশ ভোট। কোবিন্দ’র পক্ষে রেকর্ড সংখ্যক ভোট নিশ্চিত করতে মোদি ও শাহ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ঊড়িষ্যার বিজু জনতা দল, তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি, অন্ধ্র প্রদেশের তেলেগু দেশাম পার্টি ও এআইডিএমকে’র একটি অংশ ইতোমধ্যে এনডিএ প্রার্থীর প্রতি তাদের সমর্থন ঘোষণা করেছে। কিছুটা ইতস্তত করার পর শিবসেনাও কোবিন্দ’র প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছে।

২১ জুন পর্যন্ত এনডিএ ৬,৯৩,৮৮২টি ভোট নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়।

অন্যদিকে, বিরোধী পক্ষের ভোট ৪,০৫,০২১। ইলেক্টরেট কলেজের মোট ভোট সংখ্যা ১০,৯৮,৯০৩।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি ৭,১৩,৭৬৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

তার প্রতিপক্ষ পি এ সাংমা পেয়েছিলেন ৩,১৫,৯৮৭ ভোট।

তবে, প্রেসিডেন্ট পদে যৌথ প্রার্থী দেয়া ২০১৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে বিজেপি’র বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর জন্য বৃহত্তর অংশীদারিত্বের একটি পরীক্ষাক্ষেত্রও বটে।

print
শেয়ার করুন