বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে নেপালের বাণিজ্যিক সম্পর্ক

বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে নেপালের বাণিজ্যিক সম্পর্ক

হরি পি. চাঁদ,
শেয়ার করুন

ভারতের প্রচণ্ড চাপ সত্ত্বেও গত ১২ মে চীনের সাথে বেল্ট ও রোড উদ্যোগের চুক্তিতে সই করেছে। এ নিয়ে প্রাথমিক চুক্তি অবশ্য আরো তিন বছর আগেই হয়েছিল।

ধারণা করা হয়ে থাকে, গত বছর কে পি অলির নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন না ঘটলে নেপাল আরো আগেই চুক্তিটিতে সই করতো। ভারত ও কাঠমান্ডুভিত্তিক বেশিরভাগ পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, অলির পর ক্ষমতায় আসা প্রচণ্ডের নেতৃত্বাধীন সরকার নয়াদিল্লি বিবেচনার আলোকে নেপালের স্বার্থ রক্ষা করে।

অধিকন্তু, অনেক নেপালি বুদ্ধিজীবী বিশ্বাস করে, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গত বছর গোয়ায় অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আগ দিয়ে নেপাল সফর করে বেল্ট অ্যান্ড রোড কাঠামোর আলোকে বিপুল আর্থিক সহায়তার কথা ঘোষণা করতেন। কিন্তু নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন ধারা অবলম্বন করে।

গত মে মাসে চুক্তির পরপরই ভারতে নিযুক্ত নেপালি রাষ্ট্রদূত দীপ কুমার উপাধ্যায় বলেন, সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের ব্যাপারে ভারতের আপত্তির বিষয়টি আমরা অবগত রয়েছি। কিন্তু বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে যোগ দান করে আমরা ওই ইস্যুতে কোনো পক্ষ অবলম্বন করছি না।

উপাধ্যায়ের কূটনৈতিক জবাব বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ নিয়ে নেপালের ওপর ভারতের প্রচণ্ড চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে পাঁচটি বিষয় রয়েছে : নীতি সমন্বয়, স্থাপনা কানেকটিভিটি, বাধাহীন বাণিজ্য, অর্থনৈতিক একীভূতকরণ এবং জনগণের মধ্যে বন্ধন। সব মাত্রার আলোকে পরিকল্পনাটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।

নেপাল স্থাপনা কানেকটিভিটির দিকে অনেক বেশি নজর দিচ্ছে, অগ্রাধিকারও দিচ্ছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগটি অভিন্ন লক্ষ্যে একটি একক সম্প্রদায় সৃষ্টির উদ্দেশ্যে প্রণীত। নেপালের এখনো অনেক কিছু করার বাকি রয়েছে। নীতি সমন্বয় ছাড়াও স্থাপনা কানেকটিভিটি এবং বাধাহীন বাণিজ্য, অর্থনৈতিক একীভূতকরণ এবং জনগণের মধ্যকার বন্ধন প্রতিষ্ঠার ব্যাপার রয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ দিকের প্রতিবেশীর চাপের কারণে নেপাল দৃশ্যত সর্বাত্মকভাবে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারছে না।

বেল্ট অ্যান্ড রোড চুক্তিতে কেবল আন্ত:সীমান্ত রেললাইন ও মহাসড়ক, ট্রান্সমিশন গ্রিড, পার্ক, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিমানবন্দর ও ড্রাই পোর্ট নির্মাণে সীমাবদ্ধ। তবে চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ সব মাত্রায় বাস্তবায়নে জোর দিয়ে আসছে। চীনা বাণিজ্য এবং বিশ্বজুড়ে তার অর্থনৈতিক শক্তি সম্প্রসারণের জন্য অন্যান্য মাত্রাও দরকারি।

বিপরীতে, উদ্যোগটির অন্যান্য বিষয় নেপালের মতো দেশের সতর্কভাবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ এসব দেশ চীনের বিশেষভাবে প্রয়োজন কোনো কিছুই তৈরি করে না।

বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ একভাবে নেপালকে কিছু সহায়তা করতে পারে। সেটা হলো ভারতের সাথে তার বাণিজ্য ঘাটতি এবং অতিমাত্রার ভারসাম্যহীন নির্ভরশীলতা।

বেল্ট অ্যান্ড রোড চুক্তির আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী অলি ২০১৬ সালে চীনের সাথে ‘ট্রানজিট ট্রেড ট্রিটি’ সই করেছিলেন। এই চুক্তির ফলে নেপাল ও চীনা বন্দর তিয়ানজিনের মধ্যে সংযোগ ঘটে।

যদি বেল্ট অ্যান্ড রোড চুক্তি এবং ট্রানজিট বাণিজ্য চুক্তি পূর্ণ ও আন্তরিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে ভারতকেন্দ্রিক ভূ-রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে বিশ্বপর্যায়ের রাজনীতির সাথে যুক্ত হবে নেপাল। অর্থাৎ নেপালের সম্পর্ক ও বাণিজ্যকে বৈচিত্র্যকরণের জন্য নেপালি ইতিহাসে বিশাল মাত্রা সৃষ্টির জন্য ট্রানজিট ও বাণিজ্য চুক্তিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

নেপালি বুদ্ধিজীবী শ্রীধর কে খত্রি লিখেছেন, আন্তর্জাতিক পরিবেশ নেপালের বৈচিত্র্যকরণের জন্য খুবই উপযোগী। আর তা সম্ভব চীনের সাথে নতুন নতুন চুক্তির মাধ্যমে।

এসব চুক্তির মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলোকে ছাড়িয়ে গিয়ে নেপাল তার বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক নানা মাত্রায় নিয়ে যেতে পারবে।

লেখক : কাঠমান্ডুভিত্তিক নীতি বিদেশি নীতি বিশ্লেষক। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতি বিষয়ে ত্রিভূবন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স ডিগ্রি রয়েছে তার।

 

শেয়ার করুন