নির্বাচন বয়কটের ডাক অগ্রাহ্য করলো নেপালের মাধেসিরা

নির্বাচন বয়কটের ডাক অগ্রাহ্য করলো নেপালের মাধেসিরা

শেয়ার করুন
এক নেপালী বৃদ্ধাকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে

নেপালের দ্বিতীয় পর্যায়ের স্থানীয় নির্বাচন বয়কট করবে বলে এতদিন হুমকি দিয়ে আসছিলো ভারতীয় বংশোদ্ভুত মাধেসি জনগণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২৮ জুনের নির্বাচনে ভোটাররাই শুধু ভোট দিয়েছেন তা কিন্তু নয়, প্রার্থীও হয়েছেন মাধেসিদের অনেকে। নেপালের জনসংখ্যার ২০ শতাংশ মাধেসি। দেশটির দক্ষিণাঞ্চল তথা সমতলভূমি বা তেরাই অঞ্চলে এরাই সংখ্যাগুরু। এই অঞ্চলের ১, ৫ ও ৭ নং প্রদেশে দ্বিতীয় পর্যায়ের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

রাষ্ট্রীয় জনতা পার্টি অব নেপাল (আরজিপিএন)’র মতো মাধেসি দলগুলো সংবিধানে অধিকতর রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেয়। কিন্তু এই দলের ক্যাডাররা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেয়। আর ভোট দেয় মাধেসি জনগণ।

নির্বাচন বেশ শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে জানিয়েছেন নেপালের নির্বাচন কমিশন। আর ভোট পড়েছে ৭০%। তিনটি প্রদেশের ৩৫টি জেলায় ৩৩৪টি স্থানীয় পরিষদে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বাকি থাকা একমাত্র প্রদেশ ২-এ নির্বাচন হবে সেপ্টেম্বরে।

এর আগে গত ১৪ মে প্রদেশ ৩, ৪ ও ৬ -এ স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনেও বয়কটের ডাক দিয়েছিলো মাধেসিরা। তবে ওই বয়কটের ডাক রাজনৈতিকভাবে ছিলো অর্থহীন। কারণ, পাহাড়ি অঞ্চলে মাধেসিদের উপস্থিতি তেমন তাৎপর্যপূর্ণ নয়।

নেপালের ভাষ্যকারদের মতে, মাধেসিরা ক্রমেই বুঝতে পারছে যে নির্বাচন বয়কট বা অর্থনৈতিক অবরোধের মতো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড তাদের সাংবিধানিক দাবি আদায়ের সহায়ক নয়।

একজন ভাষ্যকার বলেন, মাধেসিদের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। কিভাবে ২৪০ বছরের পুরনো রাজতন্ত্রের অবসান ঘটেছে তা বুঝতে হবে। মাধেসিরা ১০ বছর সহিংস আন্দোলন চালিয়ে রাজতন্ত্র উৎখাতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু যখনই তারা মূলধারার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে এবং রাজনৈতিক দলের মতো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে তখনই তারা অন্য দলগুলোর সহায়তায় পুরনো ব্যবস্থা বিদায় করতে সক্ষম হয়েছে।

সাংবিধানিক সংস্কারের দাবি মেনে নিতে নেপালের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় পাহাড়ি অধিবাসীদের বাধ্য করতে সাম্প্রতিক অতীতে মাধেসিদের কর্মকাণ্ডের ব্যর্থতাও সাংঘর্ষিক রাজনীতির কার্যকারিতা নিয়ে ভাবতে অনেককে বাধ্য করেছে।
মাধেসিরা ২০০৭ ও ২০০৮ সালে সহিংস আন্দোলন চালায়। কৌশলে ভারতের সমর্থন নিয়ে ২০১৫-১৬ সালে তারা প্রায় সাড়ে চার মাস অর্থনৈতিক অবরোধ চালায়। কিন্তু এরপরও মাধেসিদের লক্ষ্যপূরণ এখনো স্বপ্নের জায়গায় রয়ে গেছে। কারণ মাধেসিরা সবকিছু এক সাথে পেতে চায়। তা না হলে কিছুই মানবে না। ধীরে ধীরে দাবি আদায়ে তারা বিশ্বাস করে না।

মূলধারার আদিবাসী নেপালিরা অর্ধেক পথ অগ্রসর হতে রাজি। এর বেশি নয়। নিরপেক্ষ বিচারে বলতে হবে ২০১৫ সালে গৃহীত সংবিধানে মাধেসিদের অনেক অধিকার দেয়া হয়েছে। কিন্তু মাধেসিরা এখনো চিৎকার করছে, আর নয়াদিল্লি’র সমর্থনের পেছনে দৌঁড়াচ্ছে। অবশ্য এ ধরনের নিষ্ফল সংগ্রামে ক্লান্ত হয়ে উপেন্দ্র যাদবের মতো সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ্যে আরজেপিএন’র আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে ১৪ মে’র স্থানীয় পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেন। উপেন্দ্র যাদব নিজের দলের নামও বদলে ফেলে করেন ফেডারেল সোশিয়ালিস্ট ফোরাম (এফএসএফ)। আগের নাম ছিলো মাধেস জন অধিকার ফোরাম (এমজেএএফ)। তিনি পুষ্প কমল দহল প্রচন্ডের কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (মাওবাদি কেন্দ্র)’র সঙ্গে জোট বাধেন এবং সাবেক সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী’র দায়িত্ব পালন করেন। বলা হয় যে তিনি সর্বনেপালি রাজনীতিক হওয়ার চেষ্টা করছেন এবং শেষ পর্যন্ত হয়তো প্রধানমন্ত্রীও হবেন একদিন।

পরিবর্তনের ইচ্ছা আরজেপিএন – এর মধ্যেও দেখা যাচ্ছে। তারা ক্ষমতাসীন জোট বিপিএন (এমসি)-নেপালি কংগ্রেসের সঙ্গে পাহাড়ি জেলাগুলোতে ১৪ মে’র নির্বাচনে অংশ নেয়। নির্বাচনী প্রচারণাকালে দলটির কর্মীদের হাতে ছিলো নেপালের পতাকা। মূল ধারার নেপালী দলগুলো থেকে আরজেপিএন মাত্র কয়েক পা দূরে। তাই সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য নতুন কোন সমঝোতায় আসাই দলটির জন্য ভালো হবে। মাধেসিদের দীর্ঘ সংগ্রাম তাদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করছে। তাদের মধ্যে জাতি ও সম্প্রদায়গত পার্থক্যগুলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে। এতে মাধেসিদের সংগ্রামের তেজ কমে যাচ্ছে।

ভারত ফ্যাক্টর

উপরে উল্লেখিত অনেক স্থানীয় কার্যকারণ ছাড়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহ্যিক কার্যকারণ হলো ভারত। ভারতীয় বংশোদ্ভুত এবং ভারতের উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের সঙ্গে মাধেসিদের ঘনিষ্ঠ সামাজিক ও বৈবাহিক সম্পর্ক থাকায় নেপালের আদিবাসীরা প্রায়ই মাধেসিদের “ভারতীয়” হিসেবে উল্লেখ করে। ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকায় নেপালের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিতে মাধেসিরা দিল্লির প্রক্সি বা এজেন্ট। এরা নেপালকে ভারতের অঙ্গীভুত বা সামন্ত রাজ্যে পরিণত করতে চায় বলে পাহাড়িরা মনে করে।

অন্যদিকে, নেপালের অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাহাড়ি গোষ্ঠীর মতো মাধেসিদেরকে নিজের স্বার্থ উদ্ধারের কাজে ব্যবহার করে ভারত। ১৯৫০ ও ১৯৬০’র দশকে ভারত রাজতন্ত্র বিরোধী ও গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনগুলোকে ব্যবহার করে। তখন দিল্লির যুক্তি ছিলো গণতান্ত্রিক নেপাল তার জন্য ভালো হবে। এরপর তারা কে পি অলি’র নেতৃত্বাধিন চীনপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনাইটেড মার্ক্সিস্ট লেনিনিস্ট)’কে ঠেকাতে চীন-বিরোধী দলগুলোকে ব্যবহার করে।

ভারত মাধেসিদের সাড়ে চার মাসের অর্থনৈতিক অবরোধে সমর্থন দেয়। কিন্তু ২০১৬ সালের আগস্টে কাঠমান্ডুর ক্ষমতায় যে পরিবর্তন ঘটে তাতে নেপাল ও মাধেসিদের আলাদা দৃষ্টিকোণ বিবেচনা করতে ভারত বাধ্য হয়।

চীনপন্থী প্রধামন্ত্রী কেপি অলি’র জায়গায় মাওবাদি থেকে গণতন্ত্রীতে পরিণত হওয়া পুষ্প কমল দহল প্রচন্ড ক্ষমতায় আসেন। তিনি জোটবাধেন ভারতপন্থী নেপালি কংগ্রেসের সঙ্গে। নয়াদিল্লি এই সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে চীনের প্রভাব কমানোর স্বপ্ন দেখেছিলো। এরই অংশ হিসেবে মাধেসিদের সংঘাতমূলক রাজনীতি বন্ধ করে সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও নির্বাচনে অংশ নিতে বলা হয়।

প্রথমদিকে মাধেসিরা ভারতের চাপ মোকাবেলার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ধীরে ধীরে তারা অঘোষিতভাবে তা মেনে নেয়। তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিগুলো বেশ যুদ্ধংদেহী মনোভাবের। কিন্তু মাধেসিদের মধ্যে কট্টরপন্থীদের প্রতি সমর্থন ক্রমেই কমছে। এ ব্যাপারে একজন ভাষ্যকার বলেন, কাঠমান্ডুর মাধেসি দলগুলো তেরাই অঞ্চলের বাস্তবতা থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলছেন।

সত্যিকারের ক্ষোভ

তবে, মাধেসিদের ক্ষোভ বেশিদিন কার্পেটের নীচে চাপা দিয়ে রাখা যাবে না। জনগণের ২০ শতাংশ হয়েও সরকারি চাকরিতে তারা মাত্র ১৪%। তাও আবার নিম্নপদে। নেপালি সেনাবাহিনী ও পুলিশে মাধেসিরা ১.৫%। সংসদের তাদের প্রতিনিধিত্ব কম। কারণ, নির্বাচনী আসনগুলো জনসংখ্যা ভিত্তিতে নয়, এলাকার আয়তন ভিত্তিতে। মাধেসিরা তাদের এলাকায় আরো বেশি স্থানীয় পরিষদ দাবি করছে। তারা প্রদেশগুলোর সীমানা এমনভাবে পুন:নির্ধারণের দাবি করছে যেন রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ে।

কাঠমান্ডুতে গেল সরকারি অফিসগুলোতে বৈষম্যের শিকার হতে হয় বলে দরিদ্র মাধেসিরা অভিযোগ করে আসছে। কেপি অলি এদেরকে ‘পোকা-মাকড়’ বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন। সিপিএন (ইউএমএএল)’র সাধারণ সম্পাদক শংকর তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে মাধেসিদের ‘কালো চামড়া’র মানুষ হিসেবে অভিহিত করেন। এসব মন্তব্য মাধেসিদের জন্য অনেক পীড়াদায়ক — এতে কোন সন্দেহ নেই।

শেয়ার করুন