এয়ার করিডোর জরুরি, তবে আমরা রেল-সড়ক সংযোগের চেষ্টা চালিয়ে যাবো: আফগান রাষ্ট্রদূত

এয়ার করিডোর জরুরি, তবে আমরা রেল-সড়ক সংযোগের চেষ্টা চালিয়ে যাবো: আফগান রাষ্ট্রদূত

তৃপ্তি নাথ,
শেয়ার করুন
ভারতে নিযুক্ত আফগান রাষ্ট্রদূত শাইলদা মোহাম্মদ আবদালি, ছবি: তৃপ্তি নাথ

ভারতে নিযুক্ত আফগান রাষ্ট্রদূত শাইলদা মোহাম্মদ আবদালি ‘দি ওয়্যার’ ম্যাগাজিনের সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে সম্প্রতি চালু হওয়া ভারত-আফগানিস্তান এয়ার করিডোর, আঞ্চলিক কানেকটিভিটি, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যসহ আরো অনেক বিষয়ে কথা বলেছেন।

গত সপ্তাহে চালু হওয়া এয়ার করিডোর দিয়ে নয়াদিল্লি থেকে ১০০ টন পণ্য কাবুলে যায়। এরপর ফিরতি ফ্লাইট নয়াদিল্লি পৌছে। এই এয়ার করিডোর সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য যে দু’দেশের মধ্যে বণিজ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি, এটা স্পষ্ট। বর্তমানে দু’শের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৭০০ মিলিয়ন ডলার।

এয়ার কানেকটিভিটি ভূবেষ্টিত আফগানিস্তানকে ভারতীয় বাজারে প্রবেশ সুবিধা দেবে। শুধু দিল্লি-কাবুল নয়, অন্য শহরগুলোর মধ্যেও এয়ার কানেকটিভিটি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।

ভারতের বাজারে আফগান পণ্য প্রবেশের অনেক সম্ভাবনা দেখছেন রাষ্ট্রদূত আবদালি। তার মতে আফগানিস্তান শুষ্ক ও তাজা ফল, কার্পেট, ওষুধের কাঁচামাল, জাফরান, আধা-মূল্যবান পাথর, ইত্যাদি ভারতে রফতানি করতে পারে।

আফগানিস্তানের সাবেক ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি এডভাইজার (২০০৯-১২) আবদালি ২০১৪ সালে তার দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক ‘ওয়াজির মোহাম্মদ আকবর খান’ লাভ করেন। ২০১২ সাল থেকে তিনি ভারতে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করছেন। দিল্লিতে আবদালি’র কার্যালয়ে নেয়া এ স্বাক্ষাতকার নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন: আফগানিস্তান ও ভারতের মধ্যে এয়ার করিডোর চালু হয়েছে। এই সময়ে কেন এই করিডোর চালু করা হলো?

উত্তর: যেকোন উদ্যোগ নেয়ার পর তা বাস্তবায়িত হতে সময় লাগে। গতবছর অমৃতসরে ‘হার্ট অব এশিয়া কনফারেন্স’-এ আফগানিস্তান ও ভারতের দুই নেতা এ ব্যাপারে একমত হন। এরপরও এয়ার করিডোর বাস্তবায়ন করতে এক বছর সময় লেগেছে। বাণিজ্য বা ব্যবসায়িক প্রয়োজনেই আফগানিস্তানের আরো অনেক এয়ার রুট প্রয়োজন। আঞ্চলিক কানেকটিভিটির ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের সামনে অনেক বাধা রয়ে গেছে। আর তাই বিকল্প রুট খোলা ছাড়া তার আর কোন বিকল্প নেই।

এয়ার করিডোর চালুর মুহূর্তটি ঐতিহাসিক। এই প্রথমবারের মতো আফগানিস্তান ও ভারতের মধ্যে একটি এয়ার করিডোর চালু হলো। এর মানে এই নয় যে আমারা শুধু এয়ার করিডোরের ওপর নজর দেব এবং এর ওপরই নির্ভরশীল থাকবো। এটা একটি বিকল্প। তাছাড়া, যেসব কানেকটিভিটি আছে সেগুলো ছাড়াও আমাদেরকে অন্য বিকল্পগুলো এগিয়ে নিতে হবে।

১৮ জুন প্রথম কার্গো নিয়ে দিল্লি থেকে একটি বিমান কাবুল পৌছে। পরদিন আরেকটি বিমান কাবুল থেকে ৬০ মে.ট. মালামাল নিয়ে দিল্লি যায়।

দিল্লি ও কাবুলের মধ্যে প্রতিদিন পাঁচটি যাত্রীবাহী ফ্লাইট চলাচল করে। এটা দু’দেশের মধ্যে এক ধরনের ট্রাফিকের মতো। আমরা ক্যাপাসিটি বিল্ডিং, দু’দেশের বিমানবন্দরে মালামাল উঠানামার জন্য বিশেষ জোন তৈরিসহ আরো কিছু বিষয়ে বিশেষ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের চেষ্টা করছি। এটি বর্তমানে ভারত সরকারের কাচে বিবেচনার জন্য দেয়া হয়েছে।

প্রশ্ন: আগামীতে এয়ার করিডোরে বিমান চলাচলের সংখ্যা কেমন হবে?

উত্তর: আমরা সবেমাত্র শুরু করেছি। কিছু দিনের জন্য মাসে দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে এর সংখ্যা বাড়বে। বর্তমানে দু’সপ্তাহে একটি করে ফ্লাইট যাওয়া-আসা করছে। শিগগিরই সপ্তাহিক ফ্লাইট শুরু হবে। পরে ক্রমে বাড়তে থাকবে।

বর্তমান পরিকল্পনায় কাবুল-দিল্লি ও কান্দাহার-অমৃতসর ফ্লাই চালুর কথা রয়েছে। পরে আফগানিস্তানের অন্যান্য শহর যেমন হেরাত, মাজার-ই-শরিফ ও জালাবাদ থেকেও ফ্লাইট চালুর পদক্ষেপ নেয়া হবে।

প্রশ্ন: কান্দাহার-অমৃতসর ফ্লাইট কবে চালু হবে?

উত্তর: বর্তমান পরিকল্পনাতেই এটা রয়েছে। শিগগিরই তারিখ ও সময় ঘোষণা করা হবে।

প্রশ্ন: আপনারা বাণিজ্যের জন্য বিভিন্ন রুট অনুসন্ধান করছেন। কিন্তু, খবরে প্রকাশ যে পাকিস্তানের অবরোধের কারণে আপনাদের ৯০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে। এটা কি সত্যি?

উত্তর: পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যের পরিমাণ ২৭% কমে গেছে বলে আমি শুনেছি। এটা দু:খজনক। আসলে যারা অবরোধ সৃষ্টি করেছে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তারাই। এটা স্পষ্ট যে অবরোধ সৃষ্টির কারণে পাকিস্তান ২৭% ব্যবসা হারাচ্ছে। আমরা আশা করবো তারা যেন নিজেদের ক্ষতির দিকে তাকায়। স্বল্প মেয়াদে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হব। কিন্তু আফগানিস্তানকে অবরোধ করে রাখা যাবে না, এটাও ঠিক। আফগানিস্তান নিজের পথ খুঁজে নেবে এবং এর আঞ্চলিক সম্ভাবনাও প্রচুর।

তারা বিষয়টি বুঝবে বলে আমরা আশা করছি। বিপদ কোন এক বা দু’দেশের জন্য নয়, তাদেরকেও ভুগতে হবে।

আমরা অবশ্যই পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে কানেকটিভিটি প্রতিষ্ঠা করতে চাইবো। কিন্তু এর মানে এই নয় যে আফগানিস্তানের সামনে আর কোন পথ খোলা নেই। আরেকটি অপশন হলো চাবাহার।

চাবাহারে বিনিয়োগের জন্য আমরা জাপানকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করে যাচ্ছি। কারণ, এটা কোন দ্বিপাক্ষিক বা ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ নয়, এটা একটি আঞ্চলিক উদ্যোগ। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এটা গোটা অঞ্চলকে উপকৃত করবে। এক্ষেত্রে ইরান, আফগানিস্তান ও ভারত বেশ এগিয়ে গেছে। দেশগুলোর মধ্যে ট্রানজিট ও বাণিজ্য চুক্তিও স্বাক্ষর হয়েছে।

এই মুহূর্তে আমরা অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর মনযোগ দিচ্ছি। পাইপলাইনে আরো অনেক উদ্যোগ রয়েছে। আমরা সার্ক-এর আওতায় উদ্যোগের জন্যও চাপ দিচ্ছি। আসলে কানেকটিভিটি প্রশ্নে আমরা চাই সম্মিলিত উদ্যোগ। পুরো অঞ্চলের সমৃদ্ধির সঙ্গে আমাদের সমৃদ্ধি জড়িত।

পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যের পরিমাণ ৫ বিলিয়ন ডলার। এ থেকে ২৭% কমে গেলে তা বড় ধরনের ক্ষতি। আমরা একে আত্মঘাতি বলে মনে করি।

একটি দেশ যদি দু’দেশের মধ্যে সেতুর মতো কাজ করে এতে ওই দেশেরই লাভ। এ কথা কেন তারা স্বীকার করে না তা ভেবে আমরা বিস্মিত হই।

আমরা এখন মধ্য এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার সেতুবন্ধন তৈরিতে আফগানিস্তানের সম্ভাবনা ভালোভাবে বুঝতে পারছি। আমরা এই কানেকটিভিটি সুবিধা কাজে লাগাতে পাকিস্তানসহ সবদেশের কাছে প্রস্তাব দিয়েছি। শুধু আমাদের জন্য নয়, নিজেদের জন্যই তারা এতে সাড়া দেবে বলে আমরা মনে করছি।

পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য সবসময়ই বেশি ছিলো। এখন তা ২৭% কমে গেছে। এই কমে যাওয়া অংশ নিশ্চিতভাবে ভারত, ইরানসহ যেসব দেশের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে সেসব দেশে চলে যাবে। এতে তাদেরই ক্ষতি হচ্ছে।

প্রশ্ন: কখন এবং কেন তারা অবরোধ শুরু করেছে?

উত্তর: মাঝে মধ্যে এমনটা হলেও গত বছর থেকে তীব্র আকার ধারণ করছে। এখন দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনার কারণে এটা হয়েছে। আমি বলবো এতে তাদের অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। আফগানিস্তানকে আটকে রাখা হলে কারো উপকার হবে না। একই কাজ আমরাও করতে পারি। এভাবে কোন দেশকে আটকে রাখা যায় না। সে কোন না কোন উপায় বের করে নেবে। আজ আমরা প্রমাণ করলাম কেউ যদি আমাদের রুট আটকে রাখার চেষ্টা করে তাহলে আমরা অন্য রুট খুঁজে নিতে পারি। আমরা সবসময় পাকিস্তানসহ সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে আমাদের সবার উচিত বাণিজ্যকে রাজনীতি ও অন্যান্য উত্তেজনার বাইরে রাখা। আমাদেরকে অর্থনৈতিক ইস্যুগুলো রাজনীতির রাইরে রাখতে হবে। আর তাই আমরা আফগান-পাকিস্তান বাণিজ্য ট্রানজিট চুক্তিতে ভারতের অন্তর্ভুক্তির কথা বলেছি। এর মাধ্যমে পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে ভারতও মধ্য এশিয়ায় যেতে পারবে। এটা পাকিস্তানের জন্য খুবই লাভজনক ও অত্যন্ত সম্ভাবনায় একটি ক্ষেত্র। কিন্তু আফগানিস্তানকে কোনঠাসা করে রাখা হলে প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি যেভাবে বলেছেন, আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানকে মধ্য এশিয়ায় যেতে দেয়া হবে না।
এয়ার রুট চালু হওয়ার পর পাকিস্তান এখন বুঝতে পারবে যে স্থলপথ বন্ধ করা নিরর্থক হয়ে গেছে।

প্রশ্ন: আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র আরো চার হাজার সেনা পাঠানোর উদ্যোগ নিচ্ছে বলে সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন। আপনারা কি একে স্বাগত জানান?

উত্তর: অবশ্যই। আফগানিস্তানের পরিস্থিতি স্থিতিশীল নয়। আমরা সন্ত্রাসবাদের সমস্যায় ভুগছি। তবে, শুধু সামরিক বাহিনী দিয়ে আফগান সমস্যার সমাধান হবে না।

আমরা অব্যাহতভাবে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছি। তাদের সঙ্গে আমাদের কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা চুক্তি রয়েছে। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে। নিরাপত্তা তারই একটি অংশ।

[তৃপ্তি নাথ দিল্লিভিত্তিক সাংবাদিক এবং পররাষ্ট্র, রাজনীতি ও সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতে লেখালেখি করেন]

print
শেয়ার করুন