জেএমবি’র সামরিক শাখার প্রধান সোহেল মাহফুজ বাংলাদেশে গ্রেফতার!

জেএমবি’র সামরিক শাখার প্রধান সোহেল মাহফুজ বাংলাদেশে গ্রেফতার!

সুবীর ভৌমিক,
শেয়ার করুন

জামাতুল মোজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)’র সামরিক শাখার প্রধান সোহেল মাহফুজ ওরফে ‘হাতকাটা নাসিরুল্লাহ’কে গ্রেফতারের দাবি করেছে বাংলাদেশের পুলিশ। ভারতের কর্মকর্তারা শুক্রবার রাতে সাউথ এশিয়ান মনিটরকে এ কথা জানান।

ভারতের ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি)’র এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সন্ত্রাস-বিরোধী অপারেশনে বাংলাদেশকে ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করছে। তারা এখন মাহফুজের ব্যাপারে বিস্তারিত জানাতে ভারতীয় সংস্থাগুলোকে অনুরোধ করেছে।

আইবি কর্মকর্তা বলেন, তারা [বাংলাদেশের কর্মকর্তারা] এখন গ্রেফতারকৃত সন্দেহভাজন ব্যক্তির ব্যাপারে বিস্তারিত যাচাই-বাছাই করে দেখবে।

নয়াদিল্লি’তে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ)’র আরেক শীর্ষ কর্মকর্তা সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বলেন যে, এক দিন আগে গ্রেফতার হওয়া সোহেল মাহফুজের পরিচয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে বাংলাদেশী কর্মকর্তারা তাদের কাছে সহায়তা চেয়েছেন।

বহুল আলোচিত খাগড়াগড় মামলায় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ মাহফুজকে খুঁজছে। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসি কার্যক্রম চালানো এবং অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক রাখার অভিযোগ রয়েছে।

মাহফুজের আরেক নাম ‘হাতকাটা নাসিরুল্লাহ’। সে মুর্শিদাবাদের মুকিমনগরে জিহাদিদের প্রশিক্ষণ শিবির এবং বর্ধমানের খাগড়াগড়সহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় গোপনে বোমা তৈরির কারখানা পরিচালনা করতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভারতে পালিয়ে থাকা ৪১ সন্দেহভাজন জঙ্গির তালিকায় মাহফুজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ ভারতীয় কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন।

২০১৪ সালের নভেম্বরে খাগড়াগড় ঘটনার পরপরই বাংলাদেশ ভারতের কাছে ওই তালিকা হস্তান্তর করে। ওই ঘটনার মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে জেএমবি’র বিস্তৃত নেটওয়ার্ক উদঘাটিত হয়। রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের পৃষ্ঠপোষকতায় জিহাদী-পন্থী গ্রুপগুলোর সঙ্গে মিলে জেএমবি এই নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে বলে অভিযোগ রয়েছে।

মাসরুল্লাহ নাম নিয়ে মাহফুজ ভারতে পালিয়ে ছিলো বলে নিশ্চিত করেছে মিয়ানমারের জঙ্গি খালিদ মোহাম্মদ ও পশ্চিমবঙ্গে’র জেএমবি প্রধান সাজিদ। এ দু’জনেই বর্তমানে কারাগারে আটক রয়েছেন।

নব্য-জেএমবি’র দায়িত্ব নিতে নাসরুল্লাহ বাংলাদেশ ফিরে গেছে বলে সম্প্রতি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বাংলাদেশী প্রতিপক্ষকে সতর্ক করে। বাংলাদেশে জেএমবি’র বিপর্যয় দেখা দেয়ায় নাসরুল্লাহ ফিরে যান বলে জানা গেছে।

আইবি’র একজন শীর্ষ কর্মকর্তা সাউথএশিয়ানমনিটর.কম’কে বলেন, “হলি আর্টিজান বেকারি’তে হামলার বর্ষপুর্তিতে মাহফুজ বড় ধরনের কোন হামলা চালাতে পারে বলে আমরা বাংলাদেশ কর্তৃৃপক্ষকে সতর্ক করেছি।”

কথিত সোহেল মাহফুজকে বৃহস্পতিবার (২৯ জুন) রাতে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী গ্রেফতার করে। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি যে জেএমবি’র সামরিক শাখা প্রধান এ ব্যাপারে বাংলাদেশী কর্মকর্তারা জোরালোভাবে সন্দেহ করছে বলে আইবি কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, “মাহফুজ গত কয়েক বছর ধরে ভারতে ছিলো এবং সে ভারত থেকে জেএমবি’কে অস্ত্র সরবরাহ করতো। তাই তার ব্যাপারে বাংলাদেশী গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ভারতের কাছ থেকে নিশ্চিত হতে চাইছে।”

মাহফুজের ব্যাপারে ভারতের হাতে থাকা সকল তথ্য ‘যথাযথ চ্যানেলে’ মাধ্যমে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে নয়াদিল্লিতে এনআইএ সদর দফতরের একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।

এনআইএ কর্মকর্তা বলেন, ‘তাকে ধরতে পেরেছে বলে আমরা আশা করছি। সত্যি হলে এটা হবে একটি বড় সাফল্য। তাহলে নব্য-জেএমবি’র প্রতিষ্ঠাতা তামিম চৌধুরীর মতো তাকেও নিষ্ক্রিয় করে দেয়া যাবে।”

গত রাতে বাংলাদেশের ‘কাউন্টার টেররিজম এন্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম’ (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম এটিএন নিউজের এক আলোচনায় বলেন যে তারা হলি আর্টিজান হামলায় জড়িত কয়েকজন বড় মাপের নেতাকে ধরার কাছাকাছি রয়েছেন।

তবে, আলোচনার সাইডলাইনে যখন তাকে সোহেল মাহফুজকে গ্রেফতারের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয় তখন তিনি কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান।

মনিরুল ইসলাম বলেন, এখনো নব্য-জেএমবি’র কিছু নেতা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এদেরকে ধরা গেলে নব্য-জেএমবি’কে পুরোপুরি দমন করা যাবে।

এনআইএ কর্মকর্তারা মাহফুজের পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে থাকা ও জেএমবি’কে সংগঠিত করা বিষয়ে বলেন যে, সে ‘কাট-আউট’ কৌশলের আশ্রয় নেয়। এতে মাঠ পর্যায়ে যেসব কর্মীরা অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতায় অংশ নেয় ও হামলা চালায় তাদের সঙ্গে সিনিয়র নেতাদের কোন সংযোগ থাকে না।

একজন এনআইএ কর্মকর্তা জানান, এই কৌশলের কারণে জেএমবি কর্মীরা তাদের ওপরের নেতাদের সম্পর্কে একেবারে অন্ধকারে থাকে। তারা ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের মতো করে ওপর থেকে আসা নির্দেশ অন্ধভাবে অনুসরণ করে।

বর্ধমান বিস্ফোরণে আহত জঙ্গি আব্দুল হাকিম এসব তথ্য ফাঁস করে। বর্ধমান মডিউলের প্রধান ইউসুফ শেখ ও পশ্চিমবঙ্গে অপারেশনের প্রধান সাজিদের নাম তার কাছ থেকে জানা যায়।

এনআইএ’র জিজ্ঞাসাবাদে সাজিদের কাছ থেকে জেএমবি’র আসাম মডিউলের প্রধান শানুর আলমের নাম জানা যায়। নাসরুল্লাহ’র আসল পরিচয়ও জানা যায় তার কাছ থেকে।

অন্যদিকে, খোরশেদ আলম রুবেল নামে এক জেএমবি সদস্যের কাছ থেকে সোহেলের ব্যাপারে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ জানতে পারে।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের পুলিশ অনেকটা ভাগ্যগুণে তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। মিরপুর ফ্লাইওভারের কাছে চেকপোস্টে থামার নির্দেশ অমান্য করে চলে যেতে চাইলে তাকে বহনকারি অটোরিক্সা ধাওয়া করে পুলিশ আটক করে।

অটোরিক্সায় থাকা যাত্রীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় এতে একজন কর্মকর্তা ও একজন পথচারি আহত হয়। পুলিশ পাল্টা গুলি চালাকে রুবেল আহত হলে সঙ্গীরা তাকে রেখেই পালিয়ে যায়।

জিজ্ঞাসাবাদে রুবেল জানায়, ভারত ও বাংলাদেশে জেএমবি সদস্যরা তাদের ‘উর্ধ্বতনদের’ কাছ থেকে হত্যার টার্গেট সম্পর্কে নির্দেশ পায়। টার্গেট মর্নিংওয়াকে গেলে সেটাই হত্যার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় বলেও জানানো হয়।

বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালকে নিয়ে জেএমবি একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে বলেও গোয়েন্দারা জানিয়েছেন।

 

print
শেয়ার করুন