গোর্খাল্যান্ড, মমতা ও চীনা ফ্যাক্টর

গোর্খাল্যান্ড, মমতা ও চীনা ফ্যাক্টর

ইমরান চৌধুরী,
শেয়ার করুন

আমি কয়েকদিন আগেই পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিংয়ে ঘণীভূত হওয়া পৃথক গোর্খাল্যান্ড প্রদেশের দাবীতে শুরু হওয়া সহিংস আন্দোলনের ব্যাপারে সেখানকার দুই যুবা ছাত্রনেতাকে সতর্ক করেছিলাম যে, তারা যেন কোনমতেই গোর্খাল্যান্ডের দাবীর প্রতি সমর্থন না জানায়। কারণ এতে বহুমাত্রিক ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে। গোর্খাল্যান্ড প্রদেশ গঠিত হলে ১৯০৫ সালের পর এটা হবে বাংলার দ্বিতীয় স্থায়ী ভাঙ্গন। এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য হিমালয়ের মতো বড় আর একে ঠেকানোর ঐতিহাসিক দায়িত্ব এখন পশ্চিমবঙ্গের মানুষের উপর ন্যস্ত।

আমি শুরু থেকেই নিশ্চিত ছিলাম, চিকেন নেক তথা শিলিগুড়ি করিডোরে চাপ সৃষ্টির জন্যই হঠাৎ করে ফের দার্জিলিংয়ে অশান্তি শুরু করানো হয়েছে। দার্জিলিং নিয়ে আমি যা ভেবেছিলাম, ঠিক তাই প্রতিফলিত হয়েছে পি কে বালাচন্দ্রনের এই লেখায়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমেরিকা সফর চলাকালীন সময়ে বেশ কয়েক বছর ধরে শান্ত সিকিম সীমান্তে চীনের হামলার বিষয়ে তিনি লিখছেন,

“… সোমবার এ পদক্ষেপের মাধ্যমে চীন দেখিয়েছে যে এটি সিকিম, ভুটান ও তিব্বতের মধ্যে ত্রিমুখী-জংশন এবং শিলিগুড়ির মতো ভারতের স্বার্থগুলির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। শিলিগুড়ি করিডোরটি পশ্চিমবঙ্গ ও আসামকে যুক্তকারী চিকেন নেকের মত সংবেদনশীল একটি জায়গা। বাংলাদেশের বৃহৎ ভূখণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের মধ্যবর্তী স্থানটি জুড়ে রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি এলাকায় একটি স্বশাসিত গোর্খাল্যান্ডের জন্য উত্তর বঙ্গের গোর্খাদের হিংসাত্মক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তা এখন বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।”

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, এতে কোন না কোনভাবে সহায়কের ভূমিকা পালন করেছে ভারতের শাসক দল বিজেপি ও পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রাদেশিক বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষ উভয়েই দার্জিলিংয়ে অগ্নি নির্বাপণের বদলে তাতে ঘৃতাহুতি দিয়েছেন। প্রথমে মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় এসে ‘গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ গঠন করে গোর্খাল্যান্ড নামটির স্বীকৃতি দেন। আর বিজেপি তো প্রকাশ্যেই গোর্খাল্যান্ড প্রদেশের দাবীকে সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছে। এমনকি গোর্খা নেতৃত্ব গতমাসে বিজেপির প্রাদেশিক নেতা দিলীপ ঘোষের প্ররোচনাতেই যে দার্জিলিংয়ে সহিংস নৈরাজ্যের জন্ম দিয়েছিলো, তা আর গোপন থাকেনি।

এগুলোকে যদি সমীকরণে ছকবদ্ধভাবে বিন্যস্ত করা হয়, তবে বিধ্বংসী ফল বের হয়। আমি কয়েকদিন আগেই লিখেছিলাম, চীনের বাংলাদেশে সক্রিয় হবার মানে পশ্চিমবঙ্গেও সক্রিয় হওয়া। নেপালের কথা তো আমরা অনেকেই জানি। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে চীন কখনো কনসাল জেনারেল, কখনো দিল্লীতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে কলকাতায় পাঠিয়ে মমতা ব্যানার্জির সাথে রিশতা পয়দা করতে চেয়েছে।

সেই ২০১১ সাল থেকেই আমি সবমসময়ই মনে করে এসেছি, মমতা ব্যানার্জিকে ভারতের অন্যান্য প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রীদের মতো আভ্যন্তরীণ নজরে দেখলে চলবে না। তিনি পশ্চিমবঙ্গে জেঁকে বসা বামপন্থী শাসন উৎখাতের সূত্রে আমেরিকার সুদৃষ্টিতে ছিলেন। ২০১২ সালে ঢাকা সফর শেষে ফেরার পথে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিনটন তাই মমতার পিঠ চাপড়ে দিতে কলকাতায় থেমেছিলেন।

মমতা এখন চীনের গুডবুকেও আছেন বলে প্রতীয়মান হয়। সেক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী প্রাদেশিক নির্বাচনে এর প্রভাব থাকবে। এটা আর গ্রামীণ নির্বাচনের মতো স্থানীয় পেশিশক্তি-সর্বস্ব থাকবে না…!

print
শেয়ার করুন