অন্তবর্তীকালীন সরকারের কোন বিধান নেই বাংলাদেশের সংবিধানে

অন্তবর্তীকালীন সরকারের কোন বিধান নেই বাংলাদেশের সংবিধানে

সালেহউদ্দিন,
শেয়ার করুন

বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে অন্তবর্তিকালীন সরকারের কোন কাঠামো নেই। পঞ্চদশ সংশোধনীর পর নির্বাচনকালীন সময়ে সরকারের রূপ কি হবে কারা মন্ত্রিসভায় থাকবেন বা থাকবেন না তা নির্ধারণের একমাত্র অধিকার প্রধানমন্ত্রীর। তিনি চাইলে বর্তমানে যে মন্ত্রিসভা আছে সেটি নির্বাচনকালীন সময়েও রেখে দিতে পারেন। আবার তিনি চাইলে মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দিয়ে নতুন করে গঠনও করতে পারেন। মন্ত্রিসভার আকার কি হবে তাও তার ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর নির্ভরশীল। বর্তমানে যে অসীম ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর রয়েছে নির্বাচনকালীন সময়ে তা প্রয়োগে বাংলাদেশের সংবিধানে কোন বাধা নেই। তবে প্রতি দশ জনে একজন নির্দলীয় ব্যক্তিকে (সংসদ সদস্য নন) মন্ত্রি হিসাবে নিয়োগ দিতে পারবেন প্রধানমন্ত্রী। ওই নির্দলীয় ব্যক্তির হাতে প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক ঐক্যমত হলে নির্বাচনকালীন সময়ে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। তবে বিষয়টি নির্ভর করবে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে গঠিত সরকারকে “অন্তবর্তিকালীন সরকার”বলে অভিহিত করছিলো তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী। সেসময় মন্ত্রিসভার আকার ছোট করা হয়েছিলো। মহাজোটের শরিকদের নিয়ে গঠন করা হয়েছিলো মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রীসহ ওই মন্ত্রিসভার সকল সদস্যই নির্বাচনে অংশগ্রহন করেন। তাদের প্রায় সকলেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার প্রয়োজন না পড়লেও তারা সকলেই নির্বাচনকালীন সময়ে রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছেন। নির্বাচনী আচরণবিধিতে সরকারি সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণের উপরে নিষেধাজ্ঞা ছিলো। কিন্তু  মন্ত্রি, এমপিরা  স্বপদে থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহন করবেন এই কারণে রকিবউদ্দিনের নির্বাচন কমিশনও নির্বাচনী আচরণবিধিতে পরিবর্তন আনে।

উল্লেখ্য, ১৯৮৬ সালে এরশাদের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শর্ত অনুযায়ী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পূর্বে সংসদ ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছিলো এবং মন্ত্রিরা পদত্যাগ করে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হওয়ার পর নির্বাচনকালীন সরকার বলতে আমাদের সংবিধানে এখন আর কিছু নেই। ১৯৯৬ সাল থেকে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারে নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত  নেওয়ার এখতিয়ার ছিলো না কিন্তু বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সময় নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোন বাধা নেই।

ভারত এবং বৃটেনের মতো সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশে অন্তবর্তিকালীন সরকার কোন নীতি নির্ধারণী কাজ করে না। সরকার পরিচালনার অত্যাবশ্যকীয় দৈনন্দিন কাজগুলোই শুধু এই সরকারকে করতে হয়। ভারতের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার পর। যে কারণে সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন, রাষ্ট্রপতি তখন প্রধানমন্ত্রীকে অন্তবর্তীকালীন সরকার পরিচালনার অনুরোধ জানান। তবে ওই সরকার দৈনন্দিন কাজ ছাড়া নীতি নির্ধারণী কোন কাজে অংশ নেয় না। এছাড়া নির্বাচন পরিচালনায় যুক্ত সকল সরকারি কর্মকর্তা নির্বাচন কমিশনের অধীন ন্যস্ত থাকে। ভারতের ওই সময়কালের সরকার প্রকৃতপক্ষেই একটি নির্বাচনকালীন অন্তবর্তিকালীন সরকার। এই অন্তবর্তিকালীন সরকারের ব্যবস্থা ভারত দীর্ঘদিন ধরে লালন করছে। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর পর বাংলাদেশের সংবিধান যে আকার ধারণ করেছে তাতে রাজনৈতিক ঐক্যমত না হলে একটি দলীয় সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচন করতে হবে। এই সরকারকে ভারতের আদলে অন্তবর্তীকালীন সরকার বলার কোন সুযোগ নেই। কেননা ভারতের ওই সরকার তাদের ম্যান্ডেটের বাইরের সময়ে অর্থাৎ মেয়াদের পরে (সংসদ বিলুপ্তির পরেও) দায়িত্ব পালন করে। যে কারনে ওই সরকারকে অন্তবর্তীকালীন সরকার বলা হয়। কিন্তু বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সংসদের মেয়াদ শেষের ৯০ দিনের মধ্যে। ফলে সরকারের পদত্যাগের প্রশ্নই ওঠে না। কোন কারনে যদি প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগও করেন তাহলেও সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আস্থাভাজন কাউকে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিবেন।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী মেয়াদ অবসানের আগে সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার এখতিয়ার কারো নেই। প্রধানমন্ত্রী সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করতে পারেন। যদি তিনি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থা হারান অথবা রাষ্ট্রপতি সরকার গঠনের জন্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন কাউকে না পান, কেবলমাত্র ওই কারণেই রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙ্গে দিতে পারেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন কাউকে পাওয়া গেলে মেয়াদ অবসানের একদিন আগেও রাষ্ট্রপতির সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার ক্ষমতা নেই।
সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের আসন শূণ্য ঘোষণা না করেই তিনশ আসনের নির্বাচন করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। আর এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে সংসদের মেয়াদ শেষের ৯০ দিনের মধ্যে। এ প্রসঙ্গে সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়, “ সংসদ সদস্যের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে- মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে। ” এই বিধানের কারণে সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচন কমিশনকে আরেকটি সংসদ নির্বাচন করতে হবে।

মেয়াদ শেষে সংসদ বিলুপ্তির পর প্রধানমন্ত্রী সাধারণত রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। রাষ্ট্রপতি তার উত্তরসূরি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে দায়িত্ব পালনের অনুরোধ করেন। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী এ ধরনের অন্তবর্তিকালীন সময় আর সৃষ্টি হচ্ছে না। যেহেতু সরকার এবং সংসদের মেয়াদের মধ্যেই সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ফলে অন্তবর্তিকালীন সরকার গঠনের কোন সুযোগ নেই। বর্তমান সংবিধানে একটি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের নির্দেশনা রয়েছে। সংবিধানের ৫৫(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “ প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা থাকিবে এবং প্রধানমন্ত্রী ও সময়ে সময়ে তিনি যেরূপ স্থির করিবেন সেইরূপ অন্যান্য মন্ত্রী লইয়া এই মন্ত্রিসভা গঠিত হইবে। ৫৬ অনুচ্ছেদের (২) উপ-অনুচ্ছেদের শর্তাংশে বলা হয়েছে, “ তবে শর্ত থাকে যে তাহার সংখ্যার অন্যূন নয়-দশমাংশ সংসদ সদস্যগণের মধ্য হইতে নিযুক্ত হইবেন এবং অনধিক এক দশমাংশ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইবার যোগ্য ব্যক্তিগণের মধ্য হইতে মনোনীত হইতে পারিবেন।” একই অনুচ্ছেদের ২ উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তাহার কর্তৃত্বে এই সংবিধান- অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত হইবে।” নির্বাচনকালীন সময়ে প্রধানমন্ত্রী এই সর্বময় ক্ষমতা প্রয়োগে সংবিধানে কোন বিধি নিষেধ নেই। এমনকি রাষ্ট্রপতির কর্ম সম্পর্কে সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদে যে নির্দেশনা রয়েছে নির্বাচনকালীন সময়েও একই ব্যবস্থা থাকবে। অর্থাৎ কেবলমাত্র প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতিকে সকল কাজ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী করতে হবে। ফলে বর্তমান সময়ে এবং নির্বাচনকালীন সময়ের মধ্যে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে কোন পার্থক্য সংবিধানে নির্দিষ্ট নেই।

১৯৯০ সালে গঠিত অন্তবর্তিকালীন সরকারের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছিলেন তৎকালীন সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহবুদ্দিন আহমেদ। প্রধান বিচারপতির প্রেসিডেন্টের দায়িত্বগ্রহন এবং দায়িত্বে ফেরা কোনটি সংবিধান সম্মত ছিলো না। কিন্তু সেটি সম্ভব হয়েছিলো রাজনৈতিক ঐক্যমতের কারণে। ফলে রাজনৈতিক ঐক্যমত হলে নির্বাচনকালীন যে কোন সরকারই গঠন করা সম্ভব। যার উদাহরণ বাংলাদেশে অতীতেও রয়েছে। কিন্তু তা নির্ভর করবে গণ আন্দোলনের সাফল্যের উপর। তত্তাবধায়ক সরকারের বিধান আমাদের সংবিধানে ছিলো না। তৎকালীন বিএনপি সরকার এই বিধানকে সংবিধান পরিপন্থী বলে দাবি করেছিলো। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং গণ আন্দোলনের মুখে ওই অসাংবিধানিক ব্যবস্থাটি সংবিধানে সংযুক্ত করতে বাধ্য হয়েছিলো বিএনপি। বর্তমান সরকারও হয়তো বাধ্য না হলে কোনরূপ পরিবর্তনে রাজি হবে না।

(লেখক: দৈনিক ইত্তেফাকের আইন নির্বাচন কমিশন বিষয়ক সম্পাদক)

শেয়ার করুন