দার্জিলিং পরিস্থিতিতে যেভাবে সাড়া দিচ্ছে নেপাল

দার্জিলিং পরিস্থিতিতে যেভাবে সাড়া দিচ্ছে নেপাল

মহাবীর পাউদিয়াল,
শেয়ার করুন

ভারতের দার্জিলিংয়ে যে গোলযোগ চলছে তার প্রতিটি ঘটনা খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে নেপাল। দার্জিলিংয়ের প্রতি সমর্থন, সহানুভুতি, ভালোবাসা, ঘৃণা, নীরব উদাসীনতা এ সবগুলো আবেগই রয়েছে নেপালবাসীর মনে।

নেপালের সঙ্গে দার্জিলিয়ের ঘনিষ্ঠতা নতুন কিছু নয়। ১৮১৬ সালে সুগাওলি চুক্তির মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই ভূখণ্ড নেপালের কাছ থেকে আলাদা করে নেয়। ওই চুক্তি বর্তমান নেপালের ভৌগলিক সীমানা নির্ধারণ করেছে।

দার্জিলিংয়ের নেপালি-ভাষী জনগোষ্ঠী দেখতে নেপালীদের মতো। একই রকম পোশাক, কথা ও আচরণ। নেপালের ঝামপা, মুরং, ইলাম, ধারান ও ধানকুতা এবং সানসারি জেলার বহু পরিবারের সঙ্গে দার্জিলিংয়ের বৈবাহিক সম্পর্ক রয়েছে। নেপালের সাহিত্য ও সঙ্গিতেও দার্জিলিংয়ের অবদান প্রচুর।

সাহিত্যিক লাইন সিং বাংদেল, পারিজাত ও ইন্দ্র বাহাদুর রাই এবং সঙ্গীত শিল্পী ও গায়ক গোপাল উনজান ও আমবার গুরুংকে নেপালবাসী আইকনের মতো শ্রদ্ধা করে। ১৯২০’র দশকে দার্জিলিংয়ের সূর্য বিক্রম গাওয়ালি, ধরনিধর কৈরালা, পরশমনি প্রধান ও থাকুর চন্দ্র সিংয়ের মতো ব্যক্তিরা নেপালি ভাষা শক্তিশালী করার জন্য আন্দোলন করেছেন।

তাই জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে গোর্খাল্যান্ডের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে দার্জিলিংয়ে পুলিশের গুলিতে তিন তরুণ নিহতের খবর যখন নেপালে পৌঁছে, তখন সামাজিক গণমাধ্যমে অনেক নেপালি প্রশ্ন করেন: নেপালিদের যখন এভাবে হত্যা করা হচ্ছে তখন কাঠমান্ডু কেন নিশ্চুপ?

সাবেক শিল্প সচিব ২২ জুন এক টুইট বার্তায় লিখেন, দার্জিলিংয়ের গোলযোগের ব্যাপারে নেপালের পরারাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কি চুপ করে থাকবে? কঠিন সময়ে সেখানকার ভাইদের সমর্থন করা উচিত আমাদের।

গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের প্রতি নেপালের সমর্থন রয়েছে। নয়া শক্তি নেপালসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সমর্থন জানিয়েছে। আবার নেপালের দক্ষিণের সমতল তেরাই অঞ্চলের মাধেসরা নিজেদের সংগ্রামের যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্যও কেউ কেউ দার্জিলিংয়ের আন্দোলনকে সমর্থন করছে। মাধেসদের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এরা নেপালের পার্বত্য জনগোষ্ঠী থেকে নিজেদের আলাদা করে দেখাতে চায়।

দার্জিলিংয়ের বিক্ষোভ- সংগ্রামের ক্ষেত্রে নেপাল সরকারের নীরবতা বিচক্ষণতার পরিচায়ক। সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের পরিচালক ও পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ নিশ্চলনাথ পান্ডে বলেন, গোর্খাল্যান্ড ইস্যুতে নেপালের নেতৃবৃন্দ কথা বলা থেকে বিরত রয়েছে। কারণ এতে ভারতে নেপালী-ভাষী জনগণের জন্য উল্টো ফল বয়ে আনার আশংকা রয়েছে।

এর কারণ তিনটি। প্রথমত, নেপালের ভাষ্যকাররা গোর্খাল্যান্ডের পক্ষে কিছু বলা কঠিন। নেপাল একটি রাষ্ট্র। তাই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পার্বত্য জেলাগুলোর অধিবাসীদের ব্যাপারে নেপালীদের সহানুভুতি থাকলেও প্রকাশ্যে কিছু বলা যায় না।

প্রথমত, দার্জিলিং ভারতের অভ্যন্তরিণ একটি বিষয়। সাড়ে চার মাসের সড়ক অবরোধ নিয়ে ভারত-নেপাল সম্পর্কে যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছিলো, তা সবেমাত্র স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে। নেপালের নতুন সংবিধানে ন্যায্য অধিকার না দেয়ার প্রতিবাদের ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে মাধেসিরা ভারত থেকে নেপালে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য প্রবেশের পথগুলো বন্ধ করে দেয়।

এই অবরোধে সহায়তা দেয়ার জন্য কাঠমান্ডু অনানুষ্ঠানিকভাবে ভারতকে দায়ি করে। যদিও ভারত এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

দ্বিতীয়ত, তিব্বতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ক্ষমতা যেমন নেপাল রাখে না, তেমনি দার্জিলিংয়েও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির কোন ইচ্ছা তাদের নেই।

তৃতীয়ত, অতীতে নেপালের যে পরিচয় সংকট ছিলো তা থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে দেশটি। ২০০৭ সালে অন্তবর্তী সংবিধান ঘোষণার পর মাধেসিরা এর বিরোধিতা করে। তারা জাতিগত পরিচয়ভিত্তিক প্রদেশের দাবি তোলে।

তখন সরকার একটি স্বশাসিত মাধেস প্রদেশ গঠনে রাজি হয়। ২০১৫ সালে গণপরিষদ যখন সংবিধান ঘোষণা করে সেখানে একটি মাধেস-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ (প্রদেশ ২)’র বিধান রাখা হয়। তখনও ওই অঞ্চল থেকে প্রতিবাদ ওঠে।

এখন তারা সবগুলো মাধেসি এলাকা নিয়ে প্রদেশ গঠনের দাবি করছে। যার ফলশ্রুতিতে সীমান্ত অবরোধ, পাহাড়-সমতল বিভক্তি এবং নেপালের সমষ্টিগত চেতনার ওপর যে আস্থা তার ক্ষয়সাধন হয়। এসব কারণ আমাদের অর্থনীতি ও উন্নয়নকে থামিয়ে দিচ্ছে।

নেপাল এখন ফের নিজের পায়ে দাঁড়াতে শুরু করেছে। অর্থনৈতিক সূচকগুলো ইতিবাচক এবং সবার মধ্যে এই উপলব্ধি আসছে যে রাজনীতির ধারা পরিবর্তন করতে হবে। সাম্প্রদায়িক চরমপন্থা প্রশমিত হয়ে আসছে। জনগণের মধ্যে কসমোপলিটন দৃষ্টিভঙ্গী জোরদার হচ্ছে। গত বুধবার জনগণ দ্বিতীয় দফা স্থানীয় পরিষদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছে। প্রায় ২০ বছর পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। এই ধারা অব্যাহত থাকলে তা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে। এতে উন্নয়ন জোরদার হবে এবং নেপালের পরিচয়, ভাষা ও সাংস্কৃতিক সংকটগুলো দূর হবে।

এসবকিছুই হতে পারে বর্তমান সংবিধানের আওতায়। যে সংবিধানকে এখন পর্যন্ত নজরে রেখেছে ভারত, কিন্তু একে স্বাগত জানায়নি।

নেপালের সংবিধান প্রণয়ন ও প্রাদেশিক সীমানা নির্ধারণ প্রক্রিয়া ভারত কিভাবে ডিকটেট করতে চেয়েছে দেশটির জনগণের তা মনে আছে। এ নিয়ে দু’দেশের সম্পর্কে প্রায় এক বছর চরম তিক্ততা বিরাজ করে।

নেপাল সবসময় ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থেকেছে। কিন্তু দার্জিলিংয়ে কিছু হলে অনিবার্যভাবে তাতে এর জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ১৯৮০’র দশকে যখন সহিংস গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন হয় তখনো নেপাল নিশ্চুপ থেকেছে। এরপরও ওই আন্দোলনের পেছনে নেপালের হাত থাকা নিয়ে সন্দেহ করা হয়। আজও একই অবস্থা তৈরি হয়েছে।

দার্জিলিং ও মাধেসি
নেপালে অনেকে দার্জিলিংয়ের মতো মাধেসিরা পরিচয় সংকটে ভুগছেন বলে তুলনা করতে চান। কিন্তু কিভাবে তুলনা হয়? দার্জিলিংবাসী পশ্চিমবঙ্গ থেকে আলাদা হতে চান। গোর্খাল্যান্ডকে বাস্তব রূপ দিতে প্রস্তাবটি ভারতের পার্লামেন্টে তুলতে হবে, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তা পাস করলেই হলো। অন্যদিকে, ২০১৫ সালে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নেপালের সাংবিধানিক পরিষদ বর্তমান প্রাদেশিক কাঠামোর ব্যাপারে একমত হয়। নেপালের মাধেস-সংখ্যারিষ্ঠ প্রদেশ (প্রদেশ ২) ইতোমধ্যে বাস্তব রূপ নিয়েছে। এখানকার জনগণ স্থানীয় মাইথিলি, ভুজপুরি ও আওয়াধি ভাষায় কথা বলে। ছয়টি মাধেস-ভিত্তিক দলের জোট রাষ্ট্রীয় জনতা পার্টি নেপাল (আরজিপিএন)’র কিছু করার নেই মাইথিলি বা ভুজপুরি ভাষার উন্নয়নের ব্যাপারে। বরং, দলটি গোপনে হিন্দি বিস্তারের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর এ কারণেই দলটি তেমন জনসমর্থন আদায় করতে পারেনি বলে অনেকে মনে করেন। আরজেপিএন নেপালের পশ্চিম-মধ্য অঞ্চল ও একেবারে পশ্চিমে প্রদেশ ২-এর মতো আরো দুটি প্রদেশ চায়। কিন্তু ওই প্রদেশগুলোতে মাধেসিরা সংখ্যালঘু।

তাই দার্জিলিং হলো দার্জিলিং, আর মাধেস হলো মাধেস।

এখান থেকে দিল্লি কি বার্তা নিতে পারে?

দার্জিলিং ভারতের জন্য খুবই স্পর্শকাতর একটি ভূখণ্ড। কারণ, নেপাল, বাংলাদেশ, ভুটান ও চীনের আন্তর্জাতিক সীমানার সঙ্গে এর সীমান্ত রয়েছে। আর মাধেসের কারণে অঞ্চলটি নেপালের জন্যও স্পর্শকাতর। মাধেসের মধ্য দিয়েই আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে নেপালিরা ভারতে প্রবেশ করে।

দার্জিলিংয়ের গোলযোগ নেপালের জন্য আরেকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। আর তাহলো ফেডারেল সিস্টেম কতটা জটিল ও কপটতাপূর্ণ এই ঘটনা থেকে নেপাল শিক্ষা নিতে পারে। এখান থেকে দু’দেশই পরস্পরকে বুঝতে পারে।

সাম্প্রতিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নেপালে যেসব স্থানীয় সরকার গঠিত হবে তাদের হাতে ক্ষমতা থাকবে কোন ভাষায় শিক্ষা দিলে ভালো ফল পাওয়া যাবে তা নির্ধারণের। এই ব্যবস্থা যদি দার্জিলিংয়ের ব্যাপারে গ্রহণ করা হতো তাহলে হয়তো আজকের গোলযোগ এড়ানো যেতো। পশ্চিমবঙ্গ সরকার গোটা রাজ্যে বাংলা প্রচলনের যে উদ্যোগ নিয়েছে সেখান থেকেই মূলত দার্জিলিংয়ের আলাদা রাজ্য গঠনের বর্তমান আন্দোলনের সূচনা।

তবে, কাঠমান্ডু থেকে বর্তমানে যা বলা উচিত তা হলো: দার্জিলিংয়ের পরিস্থিতি মোকাবেলা করার পুরো দায়িত্ব ভারত ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উপর। নেপাল শুধু ভারত ও দেশটির জনগণের কল্যাণ কামনা করতে পারে।

লেখক নেপাল থেকে প্রকাশিত দি রিপাবলিক পত্রিকার সাংবাদিক

print
শেয়ার করুন