ইসরাইলের সঙ্গে অন্তরঙ্গতায় উদ্বিগ্ন ভারতের মুসলমানরা

ইসরাইলের সঙ্গে অন্তরঙ্গতায় উদ্বিগ্ন ভারতের মুসলমানরা

পি কে বালাচন্দ্রন,
শেয়ার করুন

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মঙ্গলবার (৪ জুলাই) যখন তেল আবিব বিমান বন্দরে অবতরণ করেন তখন সেখানে এক জমকালো সম্বর্ধনা অপেক্ষা করছিলো তার জন্য। বিমানের সিঁড়ি বেয়ে মোদি নেমে আসেন। নিচে অপেক্ষা করছিলেন তার ইসরাইলী প্রতিপক্ষ বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু। তারা পরস্পরকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করেন। দু’দেশের সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে তার প্রকাশ ঘটেছে এই আলিঙ্গনের মধ্য দিয়ে। মোদিকে স্বাগত জানাতে ইসরাইলের পুরো মন্ত্রিসভা বিমানবন্দরে হাজির হয়। এর আগে এরকম সম্বর্ধনা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের কোন প্রেসিডেন্ট ও খৃষ্টধর্মের প্রধান ব্যক্তিত্ব পোপকেই দেয়া হয়েছে।

মোদি’র তিন দিনের সফর অনেক দিক দিয়েই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯২ সালে দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর এটাই ইসরাইলে কোন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর। সফরকালে দু’দেশের মধ্যে অনেকগুলো চুক্তি সই হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে অস্ত্র কেনা, সন্ত্রাস দমন, কৃষি উন্নয়ন ও পানি ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে এসব চুক্তি হবে।

কাশ্মির নিয়ে পাকিস্তান এবং সীমান্ত বিরোধকে ঘিরে চীনের কাছ থেকে এই মুহূর্তে ভারত যে রকম হুমকির মুখে রয়েছে তাতে ইসরাইলের সমরাস্ত্র ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান নয়াদিল্লির প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ব্যাপারে ভারতীয় নেতারা ইসরাইলী মানসিকতায় আক্রান্ত হওয়ার আশংকাও প্রবল হয়ে উঠেছে।

ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীনরা ইতোমধ্যে দেশটির প্রায় ১৮ কোটি মুসলমানের বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদী ঝটিকা বাহিনীকে একরকম লেলিয়ে দিয়েছে। গরুর গোসত খাওয়া বা ‘পবিত্র’ গরু জবাইয়ের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এরকম অজুুহাত তুলে মুসলমানদের পিটিয়ে মারার অঘোষিত লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। মুসলমানদের পাকিস্তানের চর বা আইএস’র এজেন্ট হিসেবে সন্দেহের চোখে দেখা হয়।

ভারতের রাষ্ট্রযন্ত্র যদি ইসরাইলের কাছ থেকে গোয়েন্দা সরঞ্জাম ও অন্যান্য সন্ত্রাসদমন কৌশল গ্রহণ করে তাহলে দেশটির ইতোমধ্যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হওয়া এবং নির্যাতিত ও ভগ্নমনোরথ মুসলমানরা আরো বেশি বিচ্ছিন্নতার শিকার হবে। এখনকার ভীতু ও শান্তিকামী তরুণরা তখন ছত্তিশগড়ের মরিয়ম খাতুনের মতো হাতে অস্ত্র তুলে নিতে পারে। মরিয়মের স্বামী কয়লা ব্যবসায়ী আলিমুদ্দিনকে গরু ব্যবসায়ী সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করেছিলো উগ্র হিন্দুরা।

প্রতিরক্ষা চুক্তি

১৯৯০’র দশকে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়ার পর ভারত নিজেকে নিরপেক্ষতা থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। তখন থেকে ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামের প্রতি সমর্থন দানের পরিবর্তে ভারত ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করতে শুরু করে। ভারত সামরিক সরঞ্জামের ওপর সোভিয়েত নির্ভরতা কমিয়ে আনতে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি দৃষ্টি দেয়।

ইতোমধ্যে ইসরাইল বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় অস্ত্র নির্মাতা রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
আর ভারত পরিণত হয়েছে অন্যতম বৃহৎ ক্রেতায়। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত অস্ত্র আমদানির দিক দিয়ে ভারত বিশ্বে  দ্বিতীয়। এ সময়ে দেশটি ৩৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কেনে, যা সৌদি আরবের পর সবচেয়ে বেশি।

ভারতে এ পর্যন্ত ইসরাইলের অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ ৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এই অংক শিগগিরই আরো বাড়বে। ইসরাইলী মিডিয়ার খবরে বলা হয়, দু’দেশ প্রতিবছর গড়ে ১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি করছে।

পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে যে, ইসরাইলের রাষ্ট্রায়ত্ব এরোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (আইএআই) ভারতের কাছে ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র প্রযুক্তি বিক্রি করবে। যা হবে ইসরাইলের সঙ্গে ভারতের এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় চুক্তি। এই চুক্তির আওতায় আইএআই ভারতকে মাঝারি পাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, লাঞ্চার ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সরবরাহ করবে। পরে আইএআই থেকে ভারতের নৌবাহিনীকে ৬৩০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের কথা ঘোষণা করা হয়। এছাড়া ইসরাইলের দূরপাল্লার বারাক-৮ ক্ষেপণাস্ত্র কিনবে ভারত। এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ৭০ কি.মি. পাল্লার মধ্যে জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা যাবে।

ইসরাইলের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী কেনা অনেক অস্ত্র ভারতে সংযোজন করা হবে। এছাড়া যৌথভাবে অস্ত্র তৈরির একটি চুক্তিও করা হচ্ছে।

প্রযুক্তি ও দক্ষতা মানানসই হওয়া

ইসরাইলী অস্ত্র নির্মাতারা পুরো ব্যবস্থা তৈরির বদলে আংশিক ব্যবস্থা বা ‘সাব-সিস্টেম’ তৈরি করে। এতে যেসব দেশ ইসরাইলী অস্ত্র কেনে সেগুলোকে সমস্যায় পড়তে হয়। আবার অন্যদেশ যেসব অস্ত্র তৈরি করে সেগুলোর যন্ত্রাংশ ইসরাইলী অস্ত্রে ব্যবহার করা যায় না। তাই সোভিয়েত সমরাস্ত্রে ইসরাইলী যন্ত্রাংশ ব্যবহার ভারতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে।

নয়াদিল্লি’র ইন্সটিটিউট অব পিস এন্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজে’র সিনিয়র ফেলো অভিজিৎ আয়ার মিত্র তার এক সাম্প্রতিক লেখায় বলেন, এ ধরনের সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ভারত কখনো বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের পরিচয় দিতে পারেনি।

মিত্র বলেন, বিভিন্ন প্রযুক্তির যন্ত্রাংশের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য কোন প্রতিষ্ঠান ভারতের নেই। অত্যন্ত পরিবর্তনশীল বাজার, হুমকির ধরন দ্রুত পরিবর্তন হওয়া এবং দ্রুত উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তার কারণে ইসরাইলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি অস্ত্র শিল্প এতটা চাঙ্গা হতে পেরেছে। কিন্তু ভারতের অস্ত্রখাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। যাও বা আছে, সেগুলো ততটা অগ্রসর নয় এবং সেগুলো প্রযুক্তি গবেষণা ও উন্নয়নের পেছনেও তেমন খরচ করে না।

তাছাড়া নিরাপত্তার কারণে কোন পণ্যের সোর্স-কোড ইসরাইল কাউকে দেয় না। সোর্সকোড ছাড়া রাশিয়ান ব্যবস্থায় এগুলো সমন্বয় করা সম্ভব নয়।

খবরটি ইংরেজিতে পড়তে ক্লিক করুন

এ ব্যাপারে উদাহরণ দিতে গিয়ে মিত্র বলেন: নৌবাহিনীর ব্যবহারের জন্য এমএফ-এসটিএআর রাডার এবং দূরপাল্লার বারাক ক্ষেপনাস্ত্রের জন্য ভারত ইতোমধ্যে অর্থ পরিশোধ করেছে। এই ব্যবস্থা পুরোপুরি ইসরাইলে তৈরি। এর উন্নয়নে অংশ নিতে ভারত করুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

এমন কি প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও ভারতীয়দের দৈন্যদশা দেখা গেছে।

রাডারের জন্য গালিয়াম আরসেনায়েড চিপস সরবরাহ করা হলে দেখা গেলো এগুলো দিয়ে ভারতের ‘এ্যাওয়াকস রাডার ব্যবস্থা’ কাজ করছে না। কারণ, ভারতের প্রযুক্তিবিদরা ম্যাচিং সিগন্যাল প্রসেসিং আলগরিদম উন্নয়নে ব্যর্থ হন।

তাছাড়া, মিশ্রণ ও সমন্বয় ঘটিয়ে উন্নত পণ্য তৈরি করা যায় না। এতে ভালো পণ্যও নষ্ট হয়ে যায়। সুখুই-৩০ জঙ্গি বিমানের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছে।

ইসরাইল যেখানে সবেচেয়ে অর্থবহ অবদান রাখতে পারে তাহলো প্রযুক্তি উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ। ভারতের প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটগুলো অ-উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এখানকার গ্রাজুয়েটরা অদক্ষ। এদের দিয়ে বর্তমান যুগের দক্ষতা ও উদ্ভাবনী চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।

ভারত-ইসরাইল চুক্তির একটি হবে শিক্ষা ও দক্ষতার উন্নয়ন। তবে, একে সামনের কাতারে রাখতে হবে। অতীতের মতো পেছনের কাতারে ফেলে রাখলে তা কারো জন্য লাভজনক হবে না।

শেয়ার করুন