চীন- ভারত সীমান্ত উত্তেজনা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে পরিণতি পাবার সম্ভাবনা কতখানি?

চীন- ভারত সীমান্ত উত্তেজনা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে পরিণতি পাবার সম্ভাবনা কতখানি?

ফারাহ মাসুম,
শেয়ার করুন

চীন ভারত চলমান সীমান্ত উত্তেজনার কি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে পরিণতি লাভের আশঙ্কা রয়েছে? এ প্রশ্নটি এখন দক্ষিণ এশিয়ায় নানাভাবে আলোচিত হচ্ছে। গত কয়েক দশকের মধ্যে চীন এবং পাকিস্তান এই দুই দেশের সাথে একই সময়ে ভারতের উত্তেজনা সৃষ্টির ঘটনা দেখা যায়নি। আর দুই বা আড়াই ফ্রন্টে যুদ্ধ প্রস্ততির ঘোষণাও ভারতের কোন সেনা নায়ককে দিতে দেখা যায়নি অন্তত গত চার দশকের মধ্যে। এখন এমন এক সময় এ ধরনের উত্তাপ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে যখন এশিয়ার এই অঞ্চলে অন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারত চীন দুই দেশের বড় ধরনের সম্মিলিত উদ্যোগ সক্রিয় রয়েছে। ওবামা প্রশাসনের সময় সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু এশিয়ামুখি হবার বিষয়টি আলোচিত হয়। সেনাকুক দ্বীপ এবং দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে বিরোধে যুক্তরাষ্ট্রের এই অঞ্চলের চীন বৈরি শক্তি সমূহকে এক জায়গায় আনার উদ্যোগও প্রত্যক্ষ করা যায়। এর অংশ হিসাবে ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপান যৌথভাবে ১০ জুলাই থেকে বঙ্গোপসাগরে তাদের বৃহত্তম মালাবর যুদ্ধমহড়ার প্রতি নিচ্ছে।

এ ত্রি-পক্ষীয় মহড়ায় ১৫টির মতো যুদ্ধজাহাজ, দুটি সাবমেরিন এবং যুদ্ধবিমান, নজরদারী বিমান এবং হেলিকপ্টার স্কোর অংশ নেবে । এটি এমন একটা সময় হচ্ছে যখন ভারত ও চীনা সৈন্যরা সিকিম-ভুটান-তিব্বত সংযোগ স্থলের কাছাকাছি মধ্য জুন থেকে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। চীন ভারতকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে এখান থেকে ভারত তার সেনা প্রত্যাহার না করলে তাদের শক্তি প্রয়োগ করে বের করে দেয়া হবে।

মালাবার মহড়ার সময় ভারতীয় বিমান বাহিনীর আইএনএস বিক্রমাদিত্যের নেতৃত্বে ছয় থেকে সাতটি ফ্রন্টলাইনের যুদ্ধজাহাজ এবং একটি কিলো-ক্লাসের সাবমেরিন ফ্ল্যাটেল থাকবে। ২০১৪ সালের নভেম্বরে কমিশনড হওয়ার পর থেকে প্রথমবারের মত মিগ ২৯ কেএস সহ এটি বাইরের দেশগুলোর সাথে একটি পূর্ণাঙ্গ মহড়ায় অংশগ্রহণ করবে। এসব উদ্যোগ এশীয় অঞ্চলে এখনই কোন যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি না করলেও সংঘাতের একটি আবহ তৈরি করছে।

গত জুনের মাঝামাঝি দক্ষিণ পশ্চিম চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের ডোকলাম এলাকায় ভারতীয় সৈন্যরা বুলডোজারের সাথে নিয়ে ইয়াডং কাউন্টির একটি রাস্তা নির্মাণে চীনের সৈন্যদের প্রতিরোধের চেষ্টা করার সময় এই এলাকায় ঢুকে পড়ে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৯ জুন মধ্য-জুনের এই ঘটনাবলীর ছবি প্রকাশ করে। এতে দেখা যায় ভারতীয় বাহিনীর দুই দেশের মধ্যে নির্ধারণ করা সীমানা অতিক্রম করার প্রচেষ্টাকে থামানোর চেষ্টা করছে চীনের সৈন্যরা ।

চীন, ভারত ও ভুটানের মধ্যে দক্ষিণ তিব্বত সীমান্ত অঞ্চল নিয়ে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক বিরোধ রয়েছে। তিব্বতের পশ্চিম ও দক্ষিণে হাজার হাজার কিলোমিটার সীমানার মধ্যে এই বিতর্ক রয়েছে। এই রেখা বরাবর মাঝে মাঝেই সীমান্ত রক্ষীদের মুখোমুখি হবার ঘটনা ঘটে। কিন্তু যেখানে এবারের ঘটনাটি ঘটে সেটি বিতর্কিত সীমানা নয়।

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লু কং একটি ২৯ জুন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমরা ভারতীয় পক্ষকে আবারো প্রচলিত সীমান্ত রীতিনীতি মেনে চলা এবং চীনের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখানো আর চীনা সীমান্তে প্রবেশ করা ভারতীয় বাহিনীকে অবিলম্বে তাদের সীমান্তের ভেতরে নিয়ে যাবার আহ্বান জানাই যাতে পরিস্থিতির আরো অবনতি না ঘটে।’

ভুটানের সরকার এই ২৯ জুনই দাবি করে যে, চীনের সড়ক নির্মাণ তার ভূখন্ডে করা হচ্ছে। আর ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৩০ জুন এই বিষয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে, যার মধ্যে স্থানটির উপর ভুটানের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে বলা হয় যে, ‘এটি স্থিতাবস্থার এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটাবে যা ভারতের নিরাপত্তার উপর গুরুতার প্রভাব ফেলবে।’ একইসাথে এই সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান করারও আহ্বান জানানো হয়।

তবে, চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে যে, সর্বশেষ সংঘর্ষের অবস্থানটি ‘অবিতর্কিত’ এলাকায় অবস্থিত, আর এই অবস্থাটি ‘ভারত সরকার লিখিতভাবে বার বার স্বীকার করেছে।’

মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুসারে, তাদের নিজস্ব সরকারের বক্তব্যের বিরোধিতা করেই ভারতীয় গণমাধ্যম বলেছে যে, চীন তাদের ভূখণ্ডে ‘অনুপ্রবেশ’ করেছে। অনেক চীনা নাগরিক এ ব্যাপারে কঠোর প্রতিক্রিয়া প্রদর্শনের জন্য আহ্বান জানিয়েছে। টাংশান জিয়েনক নামের একজন ওয়েইবো ব্যবহারকারী বলেছেন, ‘সহনশীলতা এবং দুর্বলতা কেবল ভারতীয় সেনাবাহিনীর হুমকিপূর্ণ পদ্ধতিকে উৎসাহিত করবে। ভারতীয় সৈন্যরা যদি সীমান্ত অতিক্রম করে তবে চীনা সৈন্যদের তাদের জোরপূর্বক হটিয়ে দেয়া দরকার আর তাতে নিবৃত না হলে প্রয়োজন তাদের তাক করে গুলি করা।’

ডোকলাম ঘটনার পর ভারতের টাইমস অফ ইন্ডিয়ার মতে, ভারত ও চীন উভয়ই এই অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি শক্তিশালী করেছে, প্রায় ৩ হাজার সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে এখানে।

উসকানি কি উদ্দেশ্যমূলক?

গত ২৬ জুন ১৪০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রকাশ করে ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, ভারতীয় সৈন্যরা তাদের চীনা প্রতিপক্ষের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়ছে।

টাইমস অব ইন্ডিয়া একটি উৎস থেকে ভিডিওটি পেয়েছে বলে দাবি করে জানিয়েছে যে, তাদের প্রতিবেদনটি প্রকাশের ১০ দিন আগে ভিডিওটি নেয়া হয়েছিল। পত্রিকাটি দাবি করে যে, সিকিম সীমান্তে চীনা সৈন্যরা ভারতীয় সীমান্তে ‘অনুপ্রবেশ’ করেছে এবং তারা ‘আক্রমণাত্মক’ এবং ‘ভারতীয় সৈন্যদের পেছনে ঠেলছে।’ সংবাদপত্রটি সূত্র উদ্ধৃত করে বলেছে যে, সীমান্ত পার হবার পর চীনা সৈন্যরা দু’টি ভারতীয় সেনা ব্যাংকার ধ্বংস করেছে।

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তিন দিনের সফর শুরু করার জন্য ওয়াশিংটন ডিসি-এ অবতরণ করার কয়েক ঘণ্টা পরে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। আর এটি দ্রুত চীনের সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত হয় এবং এতে বড় রকমের উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।

অনেকেই অভিযোগ করে যে, ভারত এর মাধ্যমে ‘চীনকে দমন করতে’ তার ‘কৌশলগত মূল্য’ প্রদর্শন করতে চায়। একজন উইবো ব্যবহারকারী বলেন, ‘ভারতের উসকানি সম্ভবত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তার একটি উপহার, যাতে তাদের মধ্যে বন্ধন বাড়তে পারে এবং আমেরিকানরা অনুভব করতে পারে যে দেশটি তাদের সহযোগী হতে পারে।’

প্রায় দেড় লাখ সমর্থক সম্মৃদ্ধ সামরিক ভাষ্যকার জিসং ড্যাবিং বিশ্বাস করেন যে, দোকলামে চীনকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য ভারতীয় সৈন্যরা উচ্চ পর্যায় থেকে আদেশ পেয়েছে । তিনি উল্লেখ করেন যে, ‘আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি কোনও সীমান্ত রক্ষিবাহিনীর দ্বারা এককভাবে এই ঘটনাটি ঘটেনি এবং হঠাৎ করে অযৌক্তিকভাবে কোনও ঝামেলা সৃষ্টি হয়নি। উচ্চ স্তরের কর্মকর্তাদের ‘দিকনির্দেশ’ ছাডা, তৃণমূল সৈন্যরা এত আগ্রাসী হবে না।’

ভারত বিশেষজ্ঞ সুন সিহাই বলেন, বিতর্কিত সীমান্তেও ভারতীয় প্ররোচনা বিরল। সুন উল্লেখ করেন, ‘কিন্তু এমন সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না যে, ভারতীয় সেনারা চীনের হুমকিকে তীব্র করে দেখিয়ে একটি টানাপোডন সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের আরও অর্থের প্রয়োজন মেটাতে চায়’।

‘ইন্ডিয়ান টুডে’র রিপোর্ট অনুসারে, ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী অরুণ জেটলি ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, ‘ভুটানের ভূমি দখল করার চেষ্টা করছে চীন’ আর ভারত ভুটানের ভূমিকে ‘সুরক্ষা প্রদান করছে।’ তবে, দোকলাম যে চীনের অংশ সেটি বেইজিং প্রাচীন কাল থেকেই সেই দলিল ও দখল রক্ষা করে এসেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লু কং বলেন, ‘এটা ঐতিহাসিক ও আইনশাস্ত্রীয় প্রমাণ এবং স্থল পরিস্থিতি দ্বারা সমর্থিত একটি অবিতর্কিত সত্য।’

শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়া

বেইজিং এবং নতুন দিল্লি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিতর্কিত অঞ্চলে টহল এবং অবকাঠামো নির্মাণ বৃদ্ধি করেছে। একইসাথে দুদেশের বাহিনীর মধ্যে বাস্তব সংঘাত সংঘর্ষও বেড়েছে, যার রিপোর্ট গণমাধ্যমে সাধারণ ঘটনা হিসাবে প্রকাশ হয়ে আসছে। ২০১৫ সালের অক্টোবরে ভারতীয় টেলিভিশন এনডিটিভি ২ মিনিটের একটি ভিডিও প্রচার করে দেখিয়েছে যে, দুদেশের এক ডজন সৈন্য সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে এবং এ জন্য একে অপরকে দোষারোপ করছে।

চীন ও ভারত এর আগে একমত হয় যে, তাদের বিরোধগুলো কূটনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে। ২০০৫ সালে চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাওয়ের ভারত সফরের সময় বেইজিং ও নয়া দিল্লি এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে কয়েক দশকব্যাপী চলে আসা সীমান্ত বিরোধ দুপক্ষ শক্তি ব্যবহার না করে নিষ্পত্তি করতে সম্মত হয়।

২০১৩ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যখন চীন সফরে যান, তখন দুই রাষ্ট্র সীমান্ত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। উভয়ই ‘নিজেদের সর্বাধিক সংযত রাখার অনুশীলন করবে’, ‘বল প্রয়োগ করবে না বা বল প্রয়োগের হুমকি দেবে না’ এবং বিতর্কিত এলাকায় মুখোমুখি হলে গুলি বিনিময় বা সশস্ত্র সংঘর্ষ প্রতিরোধের চেষ্টা করবে মর্মে সম্মত হয় ।

এই প্রক্রিয়ার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সংঘাতের সবসময় শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। উভয়পক্ষের সৈন্যরাও সীমান্ত এলাকায় নতুন বছর উদযাপন করতে সমবেত হয়েছে।

তিব্বতে চাকরিরত একজন চীনা সেনা বলেন যে, ‘তারা প্রায়ই তাদের ভারতীয় সমকক্ষদের মুখোমুখি হন কিন্তু এই উত্তেজনার নিরসন করার জন্য তাদের নিয়ম ও পদ্ধতি রয়েছে। টহল দেয়ার সময় চোখোচোখি সংঘর্ষ প্রায়ই ঘটতে থাকে। কিন্তু আমরা বাস্তব সংঘাত থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকার চেষ্টা করি। আমরা অস্ত্র ব্যবহার করি না।’

আস্থার অভাব

২০০৩ সাল থেকে চীন ও ভারত ১৯ দফা সীমান্ত আলোচনায় বসেছে, কিন্তু এতে সামান্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। দুপক্ষের মধ্যে মতের ব্যবধান থেকে যায় বিশাল। কিন্তু উভয় পক্ষ সীমান্ত বিরোধ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং নিজেদেরকে যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত রাখে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কিছুটা ভাঙ্গন দেখা দেয়। গত মে মাসে বছরের মধ্যে চীনের সবচেয়ে বড কূটনৈতিক উদ্যোগ বেইজিং-এ অনুষ্ঠিত বেল্ট এবং রোড ফোরামে ভারত অনুপস্থিত থাকে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, চীন এবং পাকিস্তানের সাথে সীমান্তে ভারত উচ্চ-রেজোলিউশন নজরদারি ক্যামেরা, রেলপথ ও বিমানবন্দর নির্মাণ এবং উন্নত হালকা হেলিকপ্টার স্থাপনের মাধ্যমে সামরিক সুবিধাদি বৃদ্ধি করেছে ।

সাড়ে তিন লাখ অনুসারী সম্মৃদ্ধ চীনের প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক সমালোচক ওয়েইবো এর সিমা পাইংব্যাং মন্তব্য করেছেন, ভারত চীনকে বছরের পর বছরব্যাপী শত্রু হিসেবে দেখেছে কিন্তু চীনের আন্তর্জাতিক কৌশলে ভারত কখনোই বিপজ্জনক শত্রু হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়নি।’

ভারত দোকলামে চীনের কার্যক্রমের ব্যাপারে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন, কারণ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে দেশের বাকি অংশে সংযুক্তকারী শিলিগুড়ি করিডোরটি এখানকার সীমান্তের কাছাকাছি । নয়াদিল্লি এটিকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ নিরাপত্তা বাধা মনে করে এবং গুরুতর সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্রে বেইজিং সেখানে সৈন্য পাঠাতে পারে বলে উদ্বেগের মধ্যে থাকে।

সূন অবশ্য এ ধরনের সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ‘চীন ও ভারত উভয়ই স্পষ্টভাবে জানে যে যুদ্ধ হলো শেষ প্রয়াস এবং তারা স্ব-স্ব অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার উপর ফোকাস করবেন যা পরষ্পরকে লাভবান করবে ।’

১৯৬২ সালের সীমান্ত যুদ্ধের পর কয়েক দশক ধরে চলা চীন-ভারত সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৮০ সালের পর থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নত হওয়ার পর অবশ্য চীন সীমান্ত বাণিজ্যের জন্য কয়েকটি পথ উন্মুক্ত করেছে।

২০০৬ সালে, সীমান্তের সিকিম অংশে ইয়াডংয়ে নাথু লা পাস, ব্যবসায়ীদের কাছে ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকার পর খোলা হয়। ২০১৪ সালের ভারত সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঘোষণা করেছিলেন যে, ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের জন্য এটি উন্মুক্ত করা হবে।

তবে, ভারতীয় সাম্প্রতিক অনুপ্রবেশের কারণে, চীন ঘোষণা করেছে যে নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ থেকে নাথু লা পাসের মাধ্যমে চীনে ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের প্রবেশাধিকার স্থগিত থাকবে।

জিয়াং জুন বলেন, ‘চীন-ভারত সীমান্ত বিরোধ মূলত পশ্চিমা উপনিবেশবাদীদের দ্বারা চাপানো একটি ঐতিহাসিক বোঝা … এলাকায় শান্তি বজায় রাখা উভয় পক্ষের নেতাদের একটি সাধারণ উপলব্ধি। ‘আমরা আশা করছি ভারতীয় পক্ষ এই প্রতিশ্রুতি রাখবে এবং বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য দৃঢ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’

যুদ্ধের সম্ভাবনা কতটুকু?

এ অবস্থায় যুদ্ধের সম্ভাবনা কতটুকু? যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠে যদি দু পক্ষই এতে লিপ্ত হওয়ার আকাঙক্ষা লালন করে। তা না হলেও অন্তত একটি পক্ষ যুদ্ধে লিপ্ত হতে চায় আর অন্য পক্ষ যুদ্ধ না চাইলেও স্বীয় স্বার্থে আঘাত এলে তা থেকে পালাতে চায় না। চীন -ভারত সংঘাতের ক্ষেত্রে বাস্তব অবস্থাটি কেমন সেটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের (কুণমিং) দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশীয় স্টাডিজের ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়ান স্টাডিজের সম্মানসূচক পরিচালক সুন সিহাই বলেন, ‘অবিতর্কিত সিকিম বিভাগে চীনা ও ভারতীয় সীমান্তের সৈন্যদের মধ্যে সংঘর্ষ বিরল ঘটনা,’ তিনি বলেন, ‘কিন্তু বল প্রয়োগের সুপারিশ সঠিক নয়। উভয় পক্ষ সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে সম্মত হয়নি। উভয়েই পারমাণবিক শক্তির দেশ, যে কোনও ধরনের যুদ্ধ অচিন্তনীয় ফলাফল নিয়ে আসবে।’

সুনের এই বক্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন আন্ত:মহাদেশ বাণিজ্য রোড তৈরির জন্য এক বিলাশবহুল রোড এন্ড বেল্ট প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যে কোন যুদ্ধে জড়ানো এই সময়ে দেশটির লক্ষ্য বলে মনে হয় না। তবে গায়ে পড়ে কেউ যুদ্ধ করতে চাইলে নিজের দুর্বলতা প্রকাশও দেশটির কৌশল বলে মনে হয় না।

ত্রিদেশীয় নৌ মহড়ার সময় ভারত মহাসাগরে রণতরী ও সাব মেরিন পাঠানো এবং অরুণাচলে দালাই লামার সফর ও সাম্প্রতিক দোকলামের ঘটনায় দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের সম্পাদকীয় ও প্রতিবেদন সমূহ দেখলে সেটিই মনে হয়।

অন্য দিকে ভারতে ক্ষমতায় রয়েছে উগ্র জাতীয়তাবাদী দল হিসাবে পরিচিত বিজেপি। দলটির বর্তমান নেতৃত্ব বাজপেয়ির মতো অপেক্ষাকৃত উদারমনা নয়। জাতীয়তাবাদকে চাঙ্গা রাখার জন্য অখন্ড ভারতীয় হিন্দু জাতীয়তাবাদ উসকে দেবার পাশাপাশি দেশের জনগণের মধ্যে একটি যুদ্ধংদেহি ভাব তৈরি দলটির কৌশলের অন্তর্ভুক্ত। উত্তরপ্রদেশসহ কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনের আগে পাকিস্তানের সাথে উত্তেজনা বৃদ্ধি করা হয়েছিলো। সিকিম বিভাগে উত্তেজনা তৈরির পেছনে মোদির যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগে চীনের সাথে বিবাদের একটি ঘটনা উপস্থাপনের প্রয়োজন হয়ে থাকতে পারে, যার ইঙ্গিত উপরে রয়েছে।

ফলে এই উত্তেজনার এখানে প্রশমন হয়ে যেতে পারে। জার্মানিতে জি২০ সম্মেলনের সময় চীনা প্রেসিডেন্ট শি এবং মোদির সাক্ষাতের পর বা আগে এটি শেষ হয়ে যেতে পারে। এই বছরের শেষ ভাগে চীনে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনের আগে দিল্লি বেইজিংয়ের সাথে কোন বিবাদে জড়াতে চাইবে না।

তবে দুটি কারণে চীনের সাথে সীমিত পর্যায়ে ভারতের যুদ্ধ সম্ভাবনা একেবারে নাকচ করে দেয়া যায় না। প্রথমত, ২০১৯ সালে ভারতের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হবার মতো ‘আচ্ছে দিন’ আনা অথবা ভারতীয়দের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কোন সম্ভাবনা এখনো দেখা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় বিকল্প হিসাবে বিজেপি নেতৃত্বকে একদিকে সাম্প্রদায়িক চেতনা জাগিয়ে তুলতে হবে, অন্য দিকে ভারতের শক্তিমত্তার ইমেজ জনগণের সামনে দেখাতে হবে। এ জন্য ভারতের এক শ্রেণীর গণমাধ্যমে দেশটির প্রতিরক্ষা সামর্থের ব্যাপারে নিয়মিতভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নির্বাচনের আগে ভারত ‘পাকিস্তানকে এখন গণনায় না ধরে তাদের পাল্লা চীনের সাথে’ এমন একটা আবহ তৈরির জন্য চীনের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হতে পারে। তবে সেটি হবার সম্ভাবনা এখন নয়, হতে পারে ২০১৮ সালের কোন এক সময়ে।

দ্বিতীয়ত, নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি ভারতের ক্ষমতায় এসেছে দেশি বিদেশি পুঁজিপতি লবির আনুকূল্য নিয়ে। এই লবির প্রত্যাশা অনুযায়ী তাদের জন্য ব্যবসা বাণিজ্যের ব্যবস্থার প্রতি শুরু থেকেই নজর দিয়ে আসছেন তিনি।

বিদ্যুৎ জ্বালানি ও অন্য বৃহৎ খাতে তিনি আদানি টাটা রিলায়েন্স এর মতো গ্রুপগুলোকে কাজ দিয়েছেন। এখন তাদেরকে প্রতিরক্ষা শিল্পে আসার বড় রকমের সুযোগ করে দিতে চান। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বড় ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন মোদি। ইসরাইলের সাথেও চলমান সফরে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করেছেন। প্রতিরক্ষা খাতের যে কোন কেনাকাটি আর চুক্তির জন্য দেশে এক ধরনের নিরাপত্তা সঙকট বা হুমকির আবহ তৈরি করে রাখতে হয়। মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সেটি করে আসছেন্ । দেশটির সেনা নেতৃত্বও এর সাথে তাল রেখে আড়াই ফ্রন্টে যুদ্ধের কথা বলছেন।

২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে ধর্মীয় উগ্র চেতনা এবং যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব দুটিই সক্রিয় রাখতে হবে বিজেপি ও মোদিকে। সেটি তিনি করতে পারলে ভোট যুদ্ধে যেমন এর ফল পাওয়া যাবে তেমনি ভাবে যে লবি ২০১৪ সালে নির্বাচনে অর্থ কড়ি ও প্রভাব বলয় দিয়ে তাকে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করেছে সেই একই লবি ২০১৯ সালেও ক্ষমতায় বহাল থাকতে সহযোগিতা করতে পারে। তবে এই কৌশল প্রয়োগ করতে গিয়ে মোদি সত্যিই সত্যিই যদি চীন বা পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন তাহলে এর মূল্য হবে অনেক বেশি ব্যাপক। সে বিবেচনা কতটা মোদির সামনে রয়েছে সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

print
শেয়ার করুন