দিল্লির স্বার্থ রক্ষায় ভুটানকে ব্যবহার করছে ভারত

দিল্লির স্বার্থ রক্ষায় ভুটানকে ব্যবহার করছে ভারত

ওয়াংসা সাংগে,
শেয়ার করুন

সাম্প্রতিক ডোকলাম ঘটনার অনেক ধরনের ভাষ্য রয়েছে। ভারতীয় মিডিয়া স্বাভাবিকভাবেই তাদের সরকারের ভাষ্য প্রচার করছে। তবে তারা চীনাদের বক্তব্যও প্রকাশ করছে।

সত্য অনুসন্ধানের সর্বোত্তম উপায় হলো চীন-ভুটান সীমান্তের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনার ইতিহাস বিশ্লেষণ করা এবং সেগুলোকে কিভাবে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ও কৌশলে প্রচার করা হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা।

১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে এবং ১৯৭০-এর দশকে ভারত সরকার চীন-ভারত আন্তর্জাতিক সীমানা চিহ্নিতকরণের বিষয়ে চীনের সাথে আলোচনার উদ্যোগ নেয়।

ভারতের এসব উদ্যোগ পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে চীন। চীন সবসময় বলে আসছে, ভুটান একটি সার্বভৌম দেশ। ফলে তারই সরাসরি চীনের সাথে কথা বলা উচিত।

ফলে ভুটানকে চীনের সাথে সীমান্ত ইস্যুতে সরাসরি কথা বলতে দিতে হয় ভারতকে। আর এভাবেই ১৯৮০-এর দশকে ভুটান ও চীনের মধ্যে সীমান্ত আলোচনা শুরু হয়। এর পর থেকে আন্তরিক পরিবেশে ২৪ রাউন্ড বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে বেশ অগ্রগতিও অর্জিত হয়েছে। ভারতকে সবসময় এ সম্পর্কে অবগত রেখেছে ভুটান।

ভুটানের জনগণ ভাবতেই পারে, আলোচনা অনেক বেশি সময় ধরে হচ্ছে। ভুটানের জাতীয় পরিষদে এমন ধারণা প্রকাশও পেয়েছে। আমি এই নির্দোষ হতাশা বুঝতে পারি। অতীতের নিরঙ্কুশ রাজতান্ত্রিকব্যবস্থায় রাজার সিদ্ধান্তে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল লোকজন। অনেকেই আন্তর্জাতিক সীমানা চিহ্নিতকরণের সাথে থাকা জটিলতা বুঝতে পারে না। আবার চীনের কাছ থেকে আরো বেশি কৌশলগত ভূমি দাবি করার জন্য ভারত প্রবল চাপ দিতে থাকায় অনেক অস্বস্তিকর তথ্যও সরকার প্রকাশ না করায় বিষয়টি নিয়ে জটিলতা আরো বেশি হয়ে পড়ে।

ভারত-ভুটান আন্তর্জাতিক সীমানা চিহ্নিতকরণের কাজও হয়েছিল খুবই নীরবে। ভারতের সাথে সীমান্ত নিয়ে যে ভুটান আলোচনা করছে, সেটা দেশটির জনসাধারণ শুনতেই পায়নি। এর কারণ হলো, আলোচনা করার মতো কোনো অবস্থাতেই ছিল না ভুটান। চীনের চেয়ে ভারতের সামনেই ভুটান অনেক বেশি অরক্ষিত। ভারতকে পাশ কাটিয়ে অন্য কোনো দেশের সাথে যোগাযোগের কোনো সুযোগ নেই ভুটানের। অধিকন্তু ভুটানের অর্থনীতি ও বাণিজ্য পুরোপুরি ভারতের ওপর নির্ভরশীল। এমন ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে ভারতের জরিপে যা বলা হয়েছে, সেটাই ভুটানকে গ্রহণ করে নিতে হয়েছে। ফলে নীরবে এবং দ্রুততার সাথেই দুই পক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত নিয়ে ভুটানের সাথে চীনের আলোচনা করাটা আমি মনে করি ভুটানি সার্বভৌমত্বের দিক থেকে একটি বিশাল পদক্ষেপ। এই সার্বভৌম সৌজন্যের কারণে আমি চীনের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমি আরো বেশি কৃতজ্ঞ ভারতের কাছে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বাণিজ্য ও ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার জন্য। তবে আমি সবচেয়ে ভালোবাসি ভুটানকে।

আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই যে, ভুটান সক্ষম হবে চীন-ভুটান সীমান্ত আলোচনা চূড়ান্ত করতে এবং চুক্তিতে সই করতে। চীনের কাছে আমরা কতটা দাবি করতে পারি সে ব্যাপারে নিজেদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত আছে ভুটান। তবে একইসময় ভারতের কৌশলগত স্বার্থও অবজ্ঞা করতে পারে না ভুটান। এ ব্যাপারে প্রচ- চাপ রয়েছে। এতে করে ত্রিদেশীয় সীমান্তে অবস্থিত ডোকলাম বহুমুখী দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। চীন বা ভারত যদি বলপূর্বক ডোকলাম মালভূমি দখল করে নিতো তাহলে হয়তো মন্দের ভালো হতো। কারণ তথাকথিত স্থিতাবস্থা পুরো ভুটানের মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করছে।

ভুটানের কাছে রাজ্যের অন্যান্য অংশের তুলনায় ডোকলামের অতিরিক্ত কোনো কৌশলগত গুরুত্ব নেই। তবে ভারত ও চীনের কাছে আছে। এই ত্রিদেশীয় অংশটি উভয়ের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়ে আসছে। ভারতের দুর্ভাগ্য, দোকলাম ত্রিদেশীয় জংশনে সিকিম, ভারত, তিব্বত-চীনের সীমান্ত অনেক আগেই নির্ধারিত হয়ে গেছে। অথচ দোকলাম মালভূমিটি ভারতীয় সামরিক কৌশলগত স্বার্থের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভারত তার সিকিম রাজ্যের মাধ্যমে ওই গুরুত্ব পূরণ করতে পারবে না। দোকলাম না থাকলে সিকিমের দরজা ভারতের জন্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

এ কারণেই চীন-ভুটান সীমান্ত আলোচনায় ভারত তার স্বার্থসিদ্ধির জন্যই বারবার দোকলাম মালভূমি দাবি করার জন্য ভুটানকে বলে আসছে। ভারত নিজে চীনের সাথে আলোচনা ত্যাগ করলেও ভুটানের মাধ্যমে সে এটি দাবি করে আসছে। এখানে ভুটান খুবই কঠিন অবস্থায় রয়েছে। ভুটানের প্রতিটি ইি ভূমি পবিত্র। আমাদের নিজেদের জন্য ভূমি দাবি করাটা খুবই যৌক্তিক। কিন্তু ভারতের কৌশলগত স্বার্থের জন্য চীনের সাথে বিতর্কিত ভূমি দাবি করা মানে ভুটানকে বিপদে ফেলা। অতিরিক্ত দাবি করা মানেই যা তার বৈধ মালিকানায় আছে সেটাকেও পর্যন্ত নৈতিক প্রশ্নের মুখে ফেলে দেওয়া।

ভুটানের অবস্থান প্রায় অসম্ভব স্থানে। দোকলাম মালভূমিতে ভারতের সাথে আলোচনার সময় যে স্থানটুকু নিজের করে নিতে পেরেছে, সেই ভূমি সে কখনো ছেড়ে দেবে না। সিকিম-তিব্বত আন্তর্জাতিক সীমানায় চীনের সাথে আলোচনায় ভারত যা অর্জন করতে পারেনি, সেটাই আদায় করার জন্য সে ভুটানকে চাপ দিয়ে আসছে।

সার্বভৌম ভুটানের সাথে আরো ভালো সম্পর্ক চায় চীন। কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠাসহ আরো ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জন্য সে ভুটানোর সাথে বিরোধের নিষ্পত্তি চায়। উত্তর সীমান্তের অন্যান্য অংশেও ভুটানের দাবির সাথে সমন্বয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। কিন্তু ভারতের সিকিম রাজ্যের সীমান্তে দোকলামে কোনো ধরনের ছাড় দিতে চায় না চীন। দোকলামের ব্যাপারে ভারতের কাছে চীন তার অবস্থান আরো অনেক আগেই চূড়ান্ত করে ফেলেছে। ভুটান ফ্রন্টে ভারতকে কোনো ধরনের ছাড় দিতে নারাজ চীন। ভুটান সরকার তা জানে। আর তা-ই বাস্তববাদী হয়ে আর কোনো দাবি না জানিয়ে চীন-ভুটান সীমান্ত চুক্তি সই করতে চায়। কিন্তু ভারতের সম্মতি ছাড়া তা করার সাহস নেই ভুটানের। সবশেষে বলতে হয়, দোকলামের ওপর চীন তার আইনগত কর্তৃত্ব বজায় রেখেছে, আর ভারতের করুণার ওপর ভর করে আছে ভুটান।

ভারত শিলিগুড়ির ‘চিকেন নেক’ এবং এর মাধ্যমে পূর্ব সীমান্ত রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। হয়তো সে কারণেই সে সিকিম দখল করেছে। একইভাবে চীনও তার সংকীর্ণ চুম্বি উপত্যকা এবং এর মাধ্যমে পুরো তিব্বতের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। ভারতের কাছে সিকিমের গুরুত্ব যেমন, চীনের কাছেও দোকলামের গুরুত্ব তেমন। আমি মনে করি, আমাদের বাস্তবতা মেনে নেওয়া উচিত। ভারতের সবুজ সঙ্কেতের জন্য চীন হয়তো সারা জীবন অপেক্ষা করে থাকবে না। ভুটানের সাথে কোনো ধরনের সম্পর্কের চেয়ে চীনের কাছে তার নিরাপত্তার ব্যাপারটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে পূর্ব সীমান্তে ভারতের সাথেও ভুটানের সীমান্ত চিহ্নিত হয়নি। একটি বিষয় হলো অরুনাচল প্রদেশ (দক্ষিণ তিব্বত)। অরুনাচল দাবি করছে চীন। ফলে দোকলামের মতো অরুনাচল নিয়েও ত্রিদেশীয় জটিলতা রয়েছে। এখানেও ভুটানের সাথে সুসম্পর্ক সৃষ্টির জন্য চীন তার জাতীয় স্বার্থে ছাড় দেবে না। সব দিক বিবেচনা করে বলা যায়, ভারতের উচিত, তার স্বার্থের জন্যই চীন-ভুটান সীমান্ত চুক্তিতে রাজি হওয়া। এটা হলে চীন-ভারত অরুনাচল সীমান্ত চুক্তি হতে পারে।

দোকলামে ভুটানি সেনাবাহিনী চীনের সাথে কোনো ব্যাপারেই সিকিমে অবস্থানরত ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে যেতে পারবে না। ভুটান ভালোভাবেই জানে, ভারতকে সরাসরি সম্পৃক্ত করার অর্থ হচ্ছে আরেকটি দেশের কাছে তার সার্বভৌমত্ব সমর্পণ করার মতো বিষয়। চীনের সাথে সরাসরি আলোচনার সুযোগ আদায় করতে ভুটানের অনেক বছর লেগেছে। চীন-ভুটান সীমান্ত চুক্তি সফলভাবে সই করার জন্য ভুটানি নেতাদের অবশ্যই আরো সাহস ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে।

আমি জানি, সীমান্তে অবস্থানরত ভুটানি সৈন্যরা আন্তরিকতা, সাহসিকতা ও স্বাতন্ত্র্যের সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করছে। ভুটানি বাহিনী তাদের নিজেদের শক্তিতে সীমান্তে চীনা বাহিনীর মোকাবিলা করতে না পারাটা ভুটানি সেনাবাহিনী এবং ভুটান জাতির জন্য অবমাননাকর। এ কারণে ভুটানি সেনাবাহিনীকে অবমূল্যায়ন করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর গুণগান করার তেনজিং লামসংয়ের ভাষ্যের ব্যাপারে আপত্তি জানাচ্ছি। ভারত হয়তো ভুটানি সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, অর্থ দিচ্ছে, কিন্তু প্রতিরক্ষা বাহিনীর রয়েছে নিজস্ব ভুটানি জাতীয় হৃদয় ও দায়দায়িত্ব। ভুটান সেনাবাহিনী সবসময় ভুটানি সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব পালন করছে, ভারতসহ যেকোনো দেশের অনুপ্রবেশকারীদের রুখে দিয়েছে।

উপসংহার
চীন-ভুটান সীমান্তে ভুটান সেনাবাহিনী তাদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করছে। আমাদের অফিসার ও সৈন্যরা তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ঠা-া পর্বতকে উষ্ণ করার জন্য সেখানে যায়নি। তারা তাদের জাতীয় প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালনের জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে সাহায্য চাইবে না। অতীতে চীন-ভুটানের মধ্যে অনেক ঘটনা ঘটেছে। ওইসব ঘটনার কোনো সময়ই ভুটান সেনাবাহিনী চীনাদের মোকাবিলার জন্য ভারতীয় বাহিনীর কাছে সাহায্য চায়নি।

সাধারণ পাঠকদের জন্য বলছি, আমাকে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলতে হবে। এটা সত্য, ভারতীয় বাহিনী ঘোষণা দিয়েই ভুটানে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। এটাও সত্য, ভারতই ভুটানি সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়, তাদের তহবিলের ব্যবস্থা করে। তবে এর কিছুই ভুটানের প্রতিরক্ষার জন্য করে না। সেটা করা হয় ভারতের প্রতিরক্ষার জন্য। চীনের সাথে নিজের সীমান্ত রক্ষার জন্যই ভুটানের সামর্থ্য বাড়াতে চায় ভারত। অর্থাৎ ভুটানে ভারতীয় সামরিক বাহিনী রাখা হয়েছে ভারতের প্রতিরক্ষার জন্য। একইভাবে দোকলাম মালভূমিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক তৎপরতা ভুটানের জাতীয় স্বার্থে নয়। এখানে ভুটানের কিছুই করার নেই।

নয়া দিল্লিতে ভুটান দূতাবাস চীনা দূতাবাসকে যে চিঠি দিয়েছে তা স্বাভাবিক বিষয়। সীমান্তে যেকোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি অবসানের জন্য চীন ও ভুটান উভয়েই কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। চীন-ভুটান সীমান্তে চীন ও ভুটানি সেনাবাহিনী কোনো ধরনের রূঢ় আচরণ করছে না। এটা অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে, ভুটান সরকার বলেছে, চীন সড়ক নির্মাণ করছে ‘বিতর্কিত এলাকায়’। ভুটান বলেনি, তাদের ভূখ-ে রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। ভুটান স্থিতাবস্থা বজায় রাখার অনুরোধ করেছে। অর্থাৎ চীনের বিরুদ্ধে ভুটান তার ভূখ-ে বলপূর্বক প্রবেশ এবং ভূমি দখলের অভিযোগ করেনি।

তবে ২৯ জুন ভুটানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে, তা রীতিবহির্ভূত। এটা এক ধরনের রাজনৈতিক ‘মায়া কান্না।’ ভুটান সাধারণত মর্যাদার সাথে আচরণ করে। এ ধরনের অস্বাভাবিক প্রপাগান্ডা ধরনের চিঠি ভারতের অনুরোধে প্রকাশ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের দুর্বল অবস্থান সুসহংত করার জন্য। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা করতে গিয়ে ভুটান সরকার হয়তো জটিল ইস্যুটিকে আরো জটিল করে ফেলেছে।

[লেখক : ভুটানের আইন বিশেষজ্ঞ]

print