দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং ধানচাষে শ্রীলঙ্কাকে সহায়তার প্রস্তাব বাংলাদেশের

দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং ধানচাষে শ্রীলঙ্কাকে সহায়তার প্রস্তাব বাংলাদেশের

পি কে বালাচন্দ্রন,
শেয়ার করুন

বাংলাদেশ দুর্যোগ প্রস্তুতি, ধানচাষসহ অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কাকে সহায়তার প্রস্তাব দেবে। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মৈত্রিপালা সিরিসেনার আসন্ন বাংলাদেশ সফরের সময় এই প্রস্তাব দেওয়া হবে বলে শুক্রবার ইঙ্গিত দিয়েছেন শ্রীলঙ্কায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ।

সিরিসেনার ১৩ জুলাই থেকে শুরু হওয়া সফরকালে ১২ থেকে ১৩টি চুক্তিতে সই হবে বলে আশা করা হচ্ছে। উদ্ভাবনমুখী কৃষি উৎপাদন পদ্ধতি; ঘন ঘন বন্যা, সাইক্লোন ও খরা মোকাবিলা এবং বন্যা, সাইক্লোন ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হ্রাসের মতো বিষয়ে জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় বাংলাদেশের ভূমিকা পালনের অবকাশ রয়েছে বলে জানিয়েছেন হামিদুল্লাহ।

বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনীতি (বর্তমানে প্রবৃদ্ধির হার ৬%) শ্রীলঙ্কার বিনিয়োগকারীদের জন্য বিপুল সুযোগের ব্যবস্থা করেছে। সম্প্রসারণশীল বাংলাদেশী মধ্যবিত্ত শ্রেণী শ্রীলঙ্কার পণ্যের জন্য আকর্ষণীয় বাজারের ব্যবস্থা করছে।

হাই কমিশনার বলেন, ঢাকা-কলম্বো-ঢাকা বিমান ভাড়া বর্তমানের ৭২০ ডলার থেকে কমিয়ে যৌক্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে নামিয়ে আনা হলে হাজার হাজার বাংলাদেশী শ্রীলঙ্কায় যাবে, তারা শ্রীলঙ্কায় গিয়ে খরচ করবে। কারণ বাংলাদেশীরা খরুচে লোক।

তিনি বলেন, পর্যটকদের পাশাপাশি যাবে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। তাদের অনেকে শ্রীলঙ্কায় ব্যবসা করতে চাইতে পারে। এটা উভয় দেশের জন্য হতে পারে কল্যাণকর।

দুর্যোগ প্রস্তুতি
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কিংবা আগে প্রস্তুতির বিষয়টি শ্রীলঙ্কার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হাই কমিশনার জানান, ১৯৯০-৯১ সালের পর থেকে প্রশাসনিক কাঠামো সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ ও গবাদি পশুর মৃত্যু ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনতে পেরেছে। প্রতিটি জেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে এই কাঠামো গঠিত। তারা দুর্যোগের বার্তা পাওয়ামাত্র কাজে লেগে যায়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষ ২০-এ রয়েছে। দুর্যোগ বন্ধ করা যায় না। তবে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার বিষয়টি শিখেছে বাংলাদেশ।

তিনি বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিটি স্বেচ্ছাসেবককে একটি হলুদ জ্যাকেট, একটি বাইসাইকেল, একটি টর্চ দেওয়া হয়। প্রত্যেককে নির্দিষ্টসংখ্যক বাড়ির দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা ওই অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করে। সাইক্লোনের সময় তারাই আক্রান্ত এলাকার লোকজনকে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যায়।

শ্রীলঙ্কার আগ্রহ
বাংলাদেশ সফলভাবে সাইক্লোন ‘মোরা’র আঘাত সামাল দিতে পারলেও শ্রীলঙ্কায় এর আঘাতে কয়েক শ’ লোক মারা গেছে। ফলে এই বিপর্যয় রুখতে বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ কিভাবে এই দুর্যোগ প্রতিরোধ করে তা প্রত্যক্ষ করতে শ্রীলঙ্কার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী শিগগিরই বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা সফর করবেন বলে জানিয়েছেন হাই কমিশনার।

উন্নত যোগাযোগ
বাংলাদেশ যোগাযোগ খাতে বিপুল অগ্রগতি অর্জন করেছে। আর তা সাইক্লোন ব্যবস্থাপনায় বেশ কার্যকর প্রতীয়মান হয়েছে। মোবাইল ফোন ব্যবহারের দিক থেকে বাংলাদেশ ১০ম স্থানে। ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে ছয় কোটির বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। হামিদুল্লাহ বলেন, কেবল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নেও এটা কার্যকর।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ
শিক্ষক প্রশিক্ষণে অনলাইন প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সাধারণভাবে তরুণরা প্রযুক্তিবান্ধব হলেও প্রবীণরাও পিছিয়ে নেই। ‘টিচার্স পোর্টালে’ নয় লাখ শিক্ষক নিবন্ধিত হয়েছেন। তাদেরকে দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে।

উদ্ভাবনমুখী কৃষি
হাই কমিশনার উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে দুর্যোগ প্রস্তুতিতে কৃষিতে উদ্ভাবনের ব্যবস্থাও করে দিয়েছে। বন্যা-প্রবণ এলাকার কৃষকেরা এখন নানা উপজাতের ধান চাষ করে। ধানচাষের এলাকা এখন দক্ষিণ দিকে সরে গেছে। উত্তরের শুষ্ক এলাকার চাষীরা এখন ভুট্টার মতো ফসলের আবাদ করে। এটা মানুষ খেতে পারে আবার পশু-খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। এতে করে পশু পালনের কাজ সহজ হচ্ছে।

বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন ১৯৭২-৭৩ সময়কালের ১০ মিলিয়ন টন থেকে ২০১৫-১৬ সময়কালে ৩৯ মিলিয়ন টনে দাঁড়িয়েছে। অথচ চাষযোগ্য জমি ৯.৮ মিলিয়ন হেক্টর থেকে কমে ৮.২৭ মিলিয়ন হেক্টরে নেমে এসেছে। নগরায়ন এবং অন্যান্য উন্নয়নের কারণে জমি কমছে।

বাংলাদেশ লবণাক্ততা প্রতিরোধী ফসলও উদ্ভাবনা করতে সক্ষম হয়েছে বলে দূত দাবি করেন।

বিশ্ব খাদ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উদ্যানজাত সামগ্রী উৎপাদনে বাংলাদেশ ৫ম বৃহত্তম দেশ। আর আম চাষে ৪র্থ। মিঠা পানির মাছচাষে চতুর্থ বা প ম।
হাইকমিশনার বলেন, ধানচাষে পানির ব্যবহার আমরা অর্ধেকে নামিয়ে এনেছি। এই প্রযুক্তি শ্রীলঙ্কা ব্যবহার করতে পারে।

সৌর জ্বালানি
শ্রীলঙ্কা নবায়নযোগ্য ও পরিবেশসম্মত জ্বালানির ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। বাংলাদেশের ৫০ লাখের বেশি বাড়িতে সৌর জ্বালানি ব্যবহৃত হয়। শ্রীলঙ্কা এই জ্ঞান কাজে লাগাতে পারে।

বাংলাদেশে সুযোগ
হেমাস, হেলেস, এইটকিন স্পেন্স, লাফস, সিলন বিস্কুটস ও ম্যালিবেনের মতো বড় বড় শ্রীলঙ্কান বিনিয়োগকারীর জন্য বাংলাদেশ প্রিয় গন্তব্য। বাংলাদেশে কুমারিকা চুলের তেল খুবই জনপ্রিয়।

হাই কমিশনার হামিদুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কানদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানো হয়। বাংলাদেশে ৪০ হাজারের বেশি শ্রীলঙ্কান কাজ করছে। তারা দেশে টাকা পাঠায়।

তবে তিনি দুঃখপ্রকাশ করে বলেন, শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশী শ্রমিক আমদানির ব্যাপারে প্রতিরোধ রয়েছে। অথচ বাংলাদেশ নির্মাণ খাতে শ্রমিকের ব্যবস্থা করতে পারে।

হাই কমিশনার বলেন, সুনির্দিষ্ট ও সময়-নির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক আমদানি করতে পারে শ্রীলঙ্কা। কৃষি মওসুমে স্বল্প সময়ের জন্যও শ্রমিক আমদানি করা যেতে পারে। তবে বিনিয়োগ আলোচনার সময় যখনই জনসংখ্যার চলাচলের কথা ওঠে, তখনই শ্রীলঙ্কার পক্ষ থেকে অস্বস্তি দেখা যায়।

হাই কমিশনার বলেন, আমরা সম্ভাবনা দেখছি বিপুল। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে আ লিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো দারুণ কাজ করেছে। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে তা বাস্তবায়নে তেমন উৎসাহ দেখা যাচ্ছে না।

print
শেয়ার করুন