বাংলাদেশ: ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে কি শূন্যতা দেখা দিয়েছে?

বাংলাদেশ: ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে কি শূন্যতা দেখা দিয়েছে?

ইকতেদার আহমেদ,
শেয়ার করুন
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সর্বসম্মতিক্রমে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে হাইকোর্টের রায়ের সাথে একমত পোষণ করে সরকারের আপিল খারিজ করে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের এ রায় ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ফিরে যাবার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসাবে কাজ করবে। সংসদে এমপিরাও এ রায়ের তীব্র সমালোচনা করেছেন। বর্তমান সরকারের সময় সংবিধানে আনা কোন সংশোধনী সুপ্রিম কোর্টে বাতিল হবার মতো এই প্রথম ঘটনার নানা ধরনের তাৎপর্য রয়েছে। এই রায় দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের সাথে যুক্ত থাকায় আগে থেকেই সরকারের আপিল শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করা হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় ছিল। এখন বড় প্রশ্ন হলো এই রায়ের কারণে বিচারপতি অভিশংসনের ক্ষেত্রে কোন আইনগত শূন্যতা তৈরি হলো কিনা।

বাংলাদেশে উচ্চ আদালত বলতে সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগকে বুঝায়। প্রধান বিচারপতিসহ উভয় বিভাগের বিচারকগণ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত। নিয়োগ পরবর্তী শপথ পাঠ ছাড়া উচ্চ আদালতের কেউ বিচারক পদে আসীন হন না। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নকালে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অবসরের বয়স ছিল ৬২ বছর। পরবর্তীতে সপ্তম ও চতুর্দশ সংশোধনী দ্বারা অবসরের বয়স প্রথমত: ৬৫ এবং অতঃপর ৬৭ করা হয়।

বাংলাদেশের মূল সংবিধান অর্থাৎ ’৭২ এর সংবিধানে বিচারকদের প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থের ক্ষেত্রে সংসদীয় অভিসংশন প্রথা কার্যকর ছিল। অভিশংসনের মাধ্যমে একজন বিচারকের অপসারণের জন্য তদন্ত পরবর্তী সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থিত প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে কার্যকরের বিধান ছিল। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে অভিসংশন প্রথা রহিত করে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক কারণ দর্শানোর যুক্তিসঙ্গত সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে বিচারকদের অপসারণের বিধান প্রবর্তন করা হয়। অতঃপর সামরিক ফরমানবলে প্রণীত দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (পঞ্চদশ সংশোধন) আদেশ, ১৯৭৮ দ্বারা বিচারকদের অপসারণ বিষয়ে সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিল প্রথা প্রবর্তন করা হয়। এ কাউন্সিলটি প্রধান বিচারপতি এবং অপরাপর বিচারকদের মধ্যে পরবর্তী যে দু’জন কর্মে প্রবীণ তাঁদের সমন্বয়ে গঠিত। কাউন্সিলকে একজন বিচারকের শারীরিক অথবা মানসিক অসামর্থ অথবা গুরুতর অসদাচরণ বিষয়ে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্দেশনা প্রদান পরবর্তী তদন্তের ক্ষমতা দেয়া হয়। দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (পঞ্চদশ সংশোধন) আদেশ সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী দ্বারা অনুমোদিত হয়।

’৭২ এর সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অবসর পরবর্তী প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে নিয়োগ বারিত ছিল। দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (পঞ্চদশ সংশোধন) আদেশ দ্বারা বিচারকদের অবসর পরবর্তী বিচারিক ও আধা-বিচারিক পদে নিয়োগের জন্য যোগ্য করা হয় এবং হাইকোর্ট বিভাগ হতে অবসর পরবর্তী আপিল বিভাগে ওকালতির জন্য যোগ্য করা হয়। এ বিধানটিও সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী দ্বারা অনুমোদিত হয়। অতঃপর সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অবসর পরবর্তী নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পদে নিয়োগের জন্য যোগ্য করা হয়।

উচ্চ আদালত কর্তৃক সংবিধানের পঞ্চম, সপ্তম ও ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষিত হলে পঞ্চদশ সংশোধনী প্রণয়নের আবশ্যকতা দেখা দেয়। উচ্চ আদালত কর্তৃক উপরোক্ত সংশোধনীসমূহ বাতিলের ফলশ্রুতিতে জেনারেল ক্লজেজ অ্যাক্ট এর বিধান অনুযায়ী ভিন্নতর কোন উদ্দেশ্য ব্যক্ত না হলে যে সময় বাতিল কার্যকর হয় উক্ত সময় অকার্যকর বা অস্তিত্ববিহীন এমন কিছু পুনর্বহাল হয় না।

সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন হলেও জেনারেল ক্লজেজ অ্যাক্ট সংসদ প্রণীত অপরাপর আইনের ক্ষেত্রে যেভাবে প্রযোজ্য সংবিধানের ক্ষেত্রেও অনুরূপভাবে প্রযোজ্য। পঞ্চদশ সংশোধনী প্রণয়নকালে বিচারকদের অপসারণ বিষয়ে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক কারণ দর্শানোর সুযোগ দান এবং সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিল এ দু’টির কোনটিই কার্যকর ছিল না। উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত রায়ে অপসারণ বিষয়ক এ দু’টি বিধানের মধ্যে শেষোক্তটি অধিকতর স্বচ্ছ বিবেচনায় সেটির স্বপক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করে। অতঃপর পঞ্চদশ সংশোধনীতে সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিল প্রথাটি পুনঃসন্নিবেশিত হয়।

পঞ্চম সংশোধনী বাতিল পরবর্তী আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক সংশোধিত সংবিধানের যে অনুলিপি মুদ্রণ করা হয় তাতে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অবসর পরবর্তী পুনঃনিয়োগ বারিত বিষয়ে ৭২ এর সংবিধানে যে বিধান ছিল তা প্রতিফলিত হয়। যাহোক পঞ্চদশ সংশোধনী প্রণয়নকালে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রদত্ত এ বিষয়ের সুবিধা অক্ষুণ্ন রেখে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত সুবিধা রহিত করা হয়।

উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি অনুসৃত হয় তা প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার, সরকারি কর্ম কমিশনের সভাপতি ও সদস্য এবং মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

তাছাড়া অসাংবিধানিক পদধারী জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের অপসারণের ক্ষেত্রেও উচ্চাদালতের বিচারকদের অপসারণের অনুরূপ বিধান প্রযোজ্য।

সংবিধানের পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিল ঘোষিত হলেও এ দু’টি সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ, বয়স বৃদ্ধি ও অবসর পরবর্তী বিচারিক ও আধা-বিচারিক পদে নিয়োগ এবং আপিল বিভাগে ওকালতি করা বিষয়ক বিধান অক্ষুণ্ন রেখে পঞ্চদশ সংশোধনী প্রবর্তিত হয়। পরবর্তীতে ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিল প্রথার বিলোপসাধন করত: সংসদীয় অভিসংশন প্রথার প্রবর্তন করা হয়। উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ কর্তৃক ষোড়শ সংশোধনী বাতিলকালে সংবিধানে সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিল প্রথাটি অস্তিত্ববিহীন থাকায় ভিন্নতর উদ্দেশ্য ব্যক্ত ব্যতিরেকে উচ্চ আদালতের কোন আদেশ দ্বারা এটির পুনবর্হালের সুযোগ জেনারেল ক্লজেজ অ্যাক্ট এর বিধান অনুযায়ী অনুপস্থিত।

পৃথিবীর অধিকাংশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যথা যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত প্রভৃতিতে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষেত্রে সংসদীয় অভিসংশন প্রথা কার্যকর রয়েছে। সংসদীয় অভিসংশন প্রথাটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এ প্রথার মাধ্যমে অপসারণ পূর্ববর্তী সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিল কর্তৃক যেরূপ তদন্তের বিধান রয়েছে যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি সমন্বয়ে গঠিত কমিশনের মাধ্যমে অনুরূপ তদন্তের প্রথা চলমান রয়েছে।

তাছাড়া তদন্তকালিন এবং তদন্ত পরবর্তী সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে শুনানিকালে অভিযুক্ত বিচারকের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রয়েছে। সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিল ও সংসদীয় অভিসংশন প্রথার মাধ্যমে অপসারণের ক্ষেত্রে দেখা যায় সংসদীয় অভিসংশন প্রথায় সংসদে অপসারণ বিষয়ক প্রস্তাব উত্থাপন পূর্ববর্তী প্রথমত: কমিশন কর্তৃক তদন্ত এবং অতঃপর সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কর্তৃক আত্মপক্ষের সুযোগ দিয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমোক্ত তদন্ত ও শেষোক্ত শুনানির ক্ষেত্রে ভিন্নতর ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় পৃথিবীর যে সকল দেশে এ প্রথাটি চলমান রয়েছে সেখানে একজন বিচারকের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলকভাবে স্বার্থের পরিপন্থি সিদ্ধান্ত গ্রহণের নজির নেই।

আমাদের দেশের মতো পৃথিবীর অপরাপর দেশের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় সাধারণ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন এবং সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে দু’তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনের আবশ্যকতা রয়েছে। সংসদীয় নির্বাচনে একটি দলের ভূমিধ্বস বিজয় ঘটলেই দু’তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বলতর হয়। যে কোন দেশে সংসদীয় নির্বাচনে একটি দলের জন্য দু’তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের ঘটনা বিরল । সংবিধান সংশোধনের ন্যায় সংসদীয় অভিসংশনের মাধ্যমে একজন বিচারকের অপসারণের ক্ষেত্রে সংসদের দু’তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনের আবশ্যকতা থাকায় একজন বিচারকের যথাযথ হেতুবিহীন অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ নেই।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় একজন সংসদ সদস্য স্বীয় ইচ্ছানুযায়ী ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এ সুযোগটি অনুপস্থিত। আমাদের দেশে বড় দু’টি রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে দীর্ঘকাল যাবৎ দলীয় ও সরকার প্রধান একই ব্যক্তি হওয়ার কারণে এবং দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোটদানে সদস্য পদ শূন্য হওয়ায় একজন সংসদ সদস্যের পক্ষে দলীয় প্রধান ও দলের সিদ্ধান্তের বাইরে অবস্থান গ্রহণের সুযোগ নেই। আর তাই স্বভাবতই ধারণা করা যায় একজন বিচারকের অপসারণ বিষয়ে দলীয় প্রধান বা দলের যে সিদ্ধান্ত সংসদে দু’তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে দলীয় প্রধান বা দলের পক্ষে তা অনায়াশে কার্যকরের সুযোগ রয়েছে।

সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারকদের অপসারণের প্রথা স্বল্প যে কয়েকটি দেশে চালু রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো পাকিস্তান। পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ইতিহাস সুখকর নয় এবং দেশটি সৃষ্টি পরবর্তী অধিকাংশ সময় সামরিক শাসকগণ বিচার বিভাগের সহায়তা নিয়ে এর শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন। সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারকদের অপসারণ নিজের অন্যায়ের বিচার নিজে করার সমরূপ। এটি এ বিষয়ে পৃথিবীব্যাপি স্বীকৃত নীতি ‘No one should be the judge of his own cause’ এ বিষয়টির সাথে সাংঘর্ষিক।

বাংলাদেশের সংবিধানের বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের দু’তৃতীয়াংশের ভোটে অপসারণযোগ্য। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্র প্রধানরূপে রাষ্ট্রের অন্য সকল ব্যক্তির উর্ধ্বে স্থান লাভ করেন। প্রধান বিচারপতিসহ উচ্চ আদালতের সকল বিচারক রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ায় তাঁর অপসারণের ক্ষেত্রে যে বিধান প্রযোজ্য অনুরূপ বিধান বিচারকদের অপসারণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না হওয়া কোনভাবেই যু্িক্তগ্রাহ্য নয়।

বাংলাদেশের সংসদ সদস্যগণ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হওয়ার কারণে তাঁরা সংসদে নিজ নিজ এলাকার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন। প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ বিধায় তাঁরা যে আইন প্রণয়ন করেন তা জনগণের অভিপ্রায়ে প্রণীত হয় বলে ধারণা করা হয়। আইন প্রণয়ন বিষয়ে সংসদ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। যে কোন আইন জনগণের মঙ্গল ও কল্যাণে প্রণীত হওয়ার কারণে তার দ্বারা যে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠির স্বার্থ সংরক্ষিত হয় এ বিষয়ে কারো মধ্যে কোন ধরণের সংশয় থাকার কথা নয়।

সংসদ সদস্যগণ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হলেও নির্বাচন অস্বচ্ছ হলে অযোগ্য ও বিতর্কিত ব্যক্তির সংসদ সদস্য পদে বিজয় লাভের সুযোগ ঘটে। অনুরূপ বিচারক নিয়োগ বিষয়ে আইন বা নীতিমালা না থাকলে দলীয় মতাদর্শী ও দলীয় সুবিধাভোগীসহ অযোগ্য ও বিতর্কিতদের বিচারক পদে নিয়োগ লাভের অবকাশ ঘটে। উভয়ের কোনটিই গণতন্ত্র, বিচার ব্যবস্থা এবং দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য সহায়ক নয়।

সংসদ কর্তৃক প্রণীত যে কোন আইন সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হলে সে আইন বাতিল বলে গণ্য হবে মর্মে সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে। বিচাকরদের অপসারণ বিষয়ে অভিসংশন প্রথার বিষয়টি ৭২ সালে প্রণীত মূল সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত থাকায় এটিকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সাথে সংঘাতপূর্ণ বলার অবকাশ আছে কিনা সে প্রশ্নটি এসে যায়।

উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ কর্তৃক ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ঘোষণার কারণে বর্তমানে সংবিধানে বিচারকদের অপসারণ বিষয়ে কোন বিধান বহাল নেই। স্পষ্টত: উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ কর্তৃক রায় ঘোষণার তারিখ বাতিল কার্যকর হয় এবং উক্ত সময় সংবিধানে সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিল অকার্যকর ও অস্তিত্ববিহীন ছিল। ভিন্নতর উদ্দেশ্য সচরাচর বাতিল আইনের অধীন কৃত কর্ম ও নিষ্পত্তির অপেক্ষমান বিষয় হেফাজতের নিমিত্ত ব্যক্ত করা হয়। বাতিল পরবর্তী একই বিষয়ে নতুন আইন অনুসৃত হলে উক্ত আইনে কোন ভিন্নতর উদ্দেশ্য ব্যক্ত হয়েছে কিনা তা লক্ষ্যণীয়। আর এ কারণেই দেশের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এর কণ্ঠে ব্যক্ত হয়েছে আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তটির কারণে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। এ শূন্যতা পূরণের দায়িত্ব সংসদের ওপর ন্যস্ত। যতক্ষণ পর্যন্ত সংসদ বিচারক অপসারণ বিষয়ে উচ্চাদালত কর্তৃক অভিসংশন প্রথা বাতিলের কারণে নতুন বিধান প্রণয়ন না করছে ততক্ষণ পর্যন্ত শূন্যতা থেকেই যাচ্ছে।

সংসদ আইন প্রণয়নের সময় দেশ ও জনগণের মঙ্গল ও কল্যাণের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়। আর তাই বিচারক অপসারণের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদ ও বিচার বিভাগের বিপরীতধর্মী অবস্থান দেশের গণতন্ত্র ও বিচার ব্যবস্থা উভয়ের জন্য সুখকর নয়। এখানে কার ক্ষমতা বেশি বা কার ক্ষমতা কম সেদিকে না তাকিয়ে যে ব্যবস্থা গণতন্ত্র ও বিচার বিভাগ এবং সর্বোপরি দেশ ও জনগণের জন্য মঙ্গলজনক ও কল্যাণকর তা উপলব্ধির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিভাগদ্বয় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই হয় বাঞ্ছনীয়।

E-mail: iktederahmed@yahoo.com

print
শেয়ার করুন