ভারতের দুই প্রধান কমিউনিস্ট পার্টির মিলন কি সম্ভব?

ভারতের দুই প্রধান কমিউনিস্ট পার্টির মিলন কি সম্ভব?

শেয়ার করুন

ইতিহাসের ডাকে কি সাড়া দেবে ভারতের কমিউনিস্টরা?

এই প্রশ্নটি গত এক দশকে অনেক বার আলোচনার বিষয়বস্তু হয়েছে। কিন্তু ভারতের দুই পুরনো কমিউনিস্ট পার্টির একীভূত হওয়ার বা মিলনের আলোচনা বশি দূর এগোয়নি। বরং বলা যায় ১৯৬৪ সালে পুরনো কমিউনিস্ট পার্টি (১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিআই) থেকে ভেঙ্গে বেরিয়ে আসা মার্কসিস্ট কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআইএম) এক দলে পরিণত হওয়ার আলোচনায় কোন রকম আগ্রহ দেখায়নি।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আগ্রহ না দেখানোর পেছনে প্রধান কারণ হলো সিপিআইএমের শক্তিশালি পার্টি হয়ে ওঠা। অন্যদিকে সিপিআইয়ের দ্রুত জনপ্রিয়তা হারানো। দল গঠনের কয়েক বছরের মধ্যেই সিপিআইএম ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। আর ১৩ বছরের মধ্যে রাজ্যে পুরোপুরি ক্ষমতাসীন হয়েছিল সিপিআইএম। সিপিআইসহ আরও অনেক কটি বাম ভাবাদর্শের দলকে নিয়ে সিপিআইএম ফ্রন্ট গঠন করেই ক্ষমতায়নকে প্রায় চিরস্থায়ী ব্যবস্থায় পরিণত করে ফেলেছিল। পশ্চিমবঙ্গে ও ত্রিপুরায় প্রায় তিন দশকের কাছাকাছি সময় এবং কেরলে এক মেয়াদ অন্তর অন্তর ক্ষমতায় থাকার ফলে সিপিআইএম নিজেদেরই প্রধান কমিউনিস্ট পার্টি বলে মনে করেছিল।

আর তাই ২০০৯ সাল থেকে সিপিআইয়ের ঐক্য আলোচনার প্রস্তাব সিপিআইএম এক রকম ফিরিয়ে দিয়েছে। তবে সিপিআই নেতারা অনেকদিন ধরেই আশা প্রকাশ করেছেন যে, অদূর ভবিষ্যতে দুই কমিউনিস্ট পার্টির মিলন হবেই। ২০০৯ সালে সিপিআইএর তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এ বি বর্ধন অবশ্য বলেছিলেন যে, একীভুত হওয়ার সিদ্ধান্ত একটি দলের উপর নির্ভর করে না। দুটি কমিউনিস্ট পার্টিকেই এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

গত বছর সিপিআই নেতা ডি রাজা হিন্দু পত্রিকার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বর্তমান সময়ে দুই কমিউনিস্ট পার্টির মিলন সময়ের চাহিদা। ইতিহাসের ডাকে সাড়া দিতেই হবে বলে তিনি বলেছেন।

সিপিআইয়ের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সুধাকর রেড্ডির দৃঢ় বিশ্বাস আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে দুই কমিউনিস্ট পার্টির মিলন সম্ভব হবে।

সম্প্রতি দুই কমিউনিস্ট পার্টির মিলন নিয়ে আলোচনাকে বিশ্লেষকরা সময়ের প্রয়োজন বলে মনে করছেন। কলকাতার একটি কলেজের রাষ্ট্র বিজ্ঞানের শিক্ষক সুদর্শন ঘোষ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে সিপিআইএমের ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়াই প্রমাণ করেছে যে তারা কি মারাত্মক ধরণের অবক্ষয়ের কবলে পড়েছে। গত ৫ বছরে সেই অবক্ষয় থেকে বেরিয়ে এসে মনোবল শক্ত করার মত অবস্থাতেও আসতে পারেনি দলটি। আর সিপিআই সেই যে তিন দশক আগে জাতীয়তাবাদী কংগ্রেসের লেজুড় হয়ে দলের প্রভাবকে কমাতে কমাতে প্রায় শুন্যে নিয়ে এসেছিল তারপর আর তারা মাথা তুলতে পারেনি।

অথচ এই সময়ের মধ্যে দক্ষিণপন্থী হিন্দু মৌলবাদীরা ভারতে ক্ষমতাসীন হয়ে দেশকে হিন্দুত্বের দিকে ঠেলে দেবার ব্রত নিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের এই রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে কমিউনিস্টদেরই অগ্রণী ভুমিকা নিতে হবে বলে মনে করেন বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা। শুধু সেকুলারিজমের ঢেঁকুড় তুলে আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বরং সামাজিক ন্যায় ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইস্যুতে আন্দোলনের অভিমুখ ঠিক করতে হবে। আর এটা করতে হলে কমিউনিস্টদের মিলন হওয়াটা জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সিপিআইয়ের সাধারণ সম্পাদক সুধাকর রেড্ডি স্পষ্ট করে বলেছেন, ১৯৬৪ সালে যে সব কারণে পার্টির বিভাজন হয়েছেল, তা অধিকাংশই বর্তমান সময়ে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। তিনি মনে করেন, এই অবস্থায় দুই কমিউনিস্ট পার্টির মিলন যদি না হয় তাহলে দুই পার্টিই তার ফল ভোগ করবে।

সিপিআইএয়ের বিশ্লেষণ হল, বর্তমান সময়ে বাম আন্দোলন খুবই সংকটে রয়েছে। তাই একই ধরণের আন্দোলন নিয়ে দুই দলের আলাদা আলাদাভাবে মানুষের সামনে যাবার কোনও মানে হয় না।

ভারতের প্রাচীন এই কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা মনে করেন, দুই কমিউনিস্ট পার্টি যদি এক সঙ্গে মিলিত হয়ে কাজ করে তাহলে ভাল ফল পাওয়া যাবে। অবশ্য একদিনেই তা হবে না। তার জন্য সময় লাগবে। ইতিমধ্যেই সেকুলারিজম, গণতন্ত্র এবং সংবিধানকে তুলের ধরার মাধ্যমে দুই পার্টি এক সঙ্গে লড়াই করছে।
সিপিআইয়ের মতে, সিপিআইএমের ভিতর থেকেও দুই পার্টির মিলনের আকাঙ্খা ব্যক্ত হচ্ছে। তবে সিপিআইএম নেতারা বিভাজনের কারণগুলি নিয়ে আলোচনাতেই বেশি আগ্রহী।

কেরলের এক সিপিআইএম নেতা মনে করেন, এস এ ডাঙ্গের নেতৃত্বে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি যেভাবে ভুল পথে চলছিল এবং দলে স্বৈরতন্ত্রী প্রবণতা মাথা তুলেছিল তার প্রতিবাদ জানিয়ে ১৯৬৪ সালে আলাদা দল গঠন করার ফলে ভারতে শ্রমিক আন্দোলনের ব্যাপক প্রসার ঘটে।

অবশ্য আন্তর্জাতিক কারণও কমিউনিস্ট পার্টির বিভাজনের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সক্রিয় ছিল। সেই সময় আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিরোধ তীব্র হয়ে উঠেছিল। রাশিয়া ও চীন বাম ভাবাদর্শের দ্বারা পরিচালিত হলেও তাদের মধ্যে সক্রিয় ছিল প্রবল দ্বন্দ্ব।

সিপিআই প্রথম থেকেই রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্টতা রেখেই চলে এসেছে। কিন্তু দলের একাংশ তখন চীনের প্রতি ঝুঁকে ছিল। তারাই পরবর্তী সময়ে সিপিআইএম গঠন করেছিল।

কিন্তু এখন আর রাশিয়ায় কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় নেই। চীনও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভিন্ন পথে চলেছে। তাই এই অবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলিতে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রভাবও আর নেই।

কিন্তু সিপিআইএম নেতারা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দলের নীতির ক্ষেত্রে অনেক সমন্বয় সাধন করলেও তারা এখনই মিলন আলোচনায় যেতে চায় না। বরং সিপিআইএমের শীর্ষ নেতৃত্বে¡র মত হল, দুই পার্টির মিলনের চেয়ে বাম ঐক্যকে শক্তিশালী করাই সময়ের চাহিদা।

print
শেয়ার করুন