ভুটানের কাধে বন্দুক রেখে গুলি করছে ভারত!

ভুটানের কাধে বন্দুক রেখে গুলি করছে ভারত!

এসএএম রিপোর্ট,
শেয়ার করুন

ভুটান, ভারতের সিকিম রাজ্য ও চীনের সীমান্ত যেখানে এক বিন্দুতে এসে মিলেছে সেই দোকলাম এলাকায় সম্প্রতি বিরোধ সৃষ্টির পর থেকে ভারত দাবি করছে যে তিব্বত স্বশাসিত অঞ্চলের ইয়াডং এলাকাটি ভুটানের। আর এলাকাটি দখলের চেষ্টা করছে চীন। যদিও ১৮৯০ সালে তৎকালিন বৃটিশ রাজ ও চীনের কুইং সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে চীনের তিব্বত ও বৃটিশ নিয়ন্ত্রিত রাজ্য সিকিম হবে দুই দেশের সীমান্ত। আর দোকলাম এলাকাটি চীনের অংশে পড়েছে। ১৯৭৫ সালে ভারত সিকিম ভারতের সঙ্গে মিশে গেলে আগের সীমান্ত চীন ও ভারতের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমান্তে পরিণত হয়।

কিন্তু ভারত এলাকাটি ভুটানের অংশ বলে দাবি করছে। আর চীনের সঙ্গে বর্তমান অচলাবস্থায় অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে ভুটানকে।

চীনের একাডেমি অব সোশ্যাল সায়েন্স (সিএএসএস)’র চীনা ইতিহাস গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক ঝাং ইংয়পান গ্লোবাল টাইমস পত্রিকাকে বলেন, “ওই চুক্তি মানার আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এটা ঐতিহাসিক দলিল হোক অথবা হোক বাস্তবতা, দোকলাম যে চীনের অংশ তাতে কোন সন্দেহ নেই।”

তিনি বলেন, “ভুটানকে সামনে ঠেলে দিতে চাচ্ছে ভারত। কিন্তু ভুটানের সঙ্গে চীনের সুসম্পর্কে রয়েছে।”

সীমান্ত নিয়ে ১৯৮৪ সাল থেকে ভুটানের সঙ্গে চীনের আলোচনা চলছে। গত আগস্টে দু’দেশের মধ্যে ২৪তম আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
সিএএসএস’র আরেক গবেষক সান হংনিয়ান বলেন, দোকলাম নিয়ে বিরোধের সাম্প্রতিক কোন ইতিহাস নেই। ভারত ইচ্ছাকৃতভাবে এই বিরোধ সৃষ্টি করছে।
ঝাংয়ের মতে দোকলামে অবকাঠামো নির্মাণের গতি ধীর হলেও লাসা-সিগাতসি রেলপথ, ইয়াডং কাউন্টিতে সড়ক ও নাথুলাতে রাস্তাঘাট নির্মাণের পর ভারত এই অঞ্চলে চীনের কাছে কৌশলগত সুবিধা হারানোর অশংকা করে।

ভারতের আরো আশংকা দোকলামে অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারলে চীন ভারতের শিলিগুড়ি করিডোরের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দেবে। মাত্র ২৭ কি.মি. চওড়া এই করিডোর দিয়ে ভারতের মূল ভূখ-ের সঙ্গে উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো যুক্ত।

ভুটানের অতিনির্ভরতা

মাত্র পৌন আট লাখ জনসংখ্যার রাষ্ট্র ভুটানের সবখানে ভারতের প্রভাব দৃশ্যমান। স্থানীয় মুদ্রার পাশাপাশি ভারতের মুদ্রাও সমান মূল্যমানে এখানে চলে। বিদেশীরা সেখানে গেলে সরকার নির্ধারিত ট্যুর গ্রুপ হিসেবে বা কোন গাইড সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে হলেও ভারতীয়দের জন্য এই আইন মানার প্রয়োজন হয় না।
ভুটানের পররাষ্ট্র ও জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি ভারত নিয়ন্ত্রণ করে। তাই, ভারতীয়দের তৎপরতায় ভুটান কোন বাধা দেয় না। ভুটানে ভারতীয়রা অনেক বিলাসবহুল হোটেল পরিচালনা করে এবং এসব হোটেলের সব স্টাফ ভারত থেকে আনা।

সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ভুটানের মোট আমদানির ৭৯ শতাংশ আসে ভারত থেকে। অন্যদিকে, ভুটানের রফতানি পণ্যের ৯০ শতাংশ ভারতে যায়। ভুটানের সবচেয়ে বড় দাতা দেশ ভারত। জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে ভারত ভুটানকে সহায়তা করে।

দি হিন্দুতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয় বাইরের হুমকি থেকে ভুটানকে সুরক্ষা দেয়ার দায়িত্ব ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওপর। এতে বলা হয়, ভারতের ইস্টার্ন আর্মি কমান্ড ও ইস্টার্ন এয়ার কমান্ড ভুটানের সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ টিম ভুটানের নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়।

তাই ভারতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতার কারণে ভুটান এখানো কূটনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি। ১৯৪৯ সালের মৈত্রি চুক্তিতে ভুটান ভারতকে তার পররাষ্ট্র নীতি ‘গাইড’ করার অনুমতি দেয়। পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ভারতের প্রতি ভুটানের এই আনুগত্য বৃটিশ শাসনামল থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে এসেছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি আগের অবস্থান থেকে সরে আসার চেষ্টা করছে। ২০১৭ সালে ভুটানে রাজনৈতিক সংস্কার শুরু হওয়ার পর ভুটানের পরাষ্ট্রনীতি গাইডে’র ধারাটি পরিবর্তন করা হয়। তবে, পররাষ্ট্রনীতি যেন ভারতে স্বার্থ ক্ষুণ্ন না করে সেদিকে ভুটানের সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের সঙ্গে ভুটান এখনো কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেনি।

কৌশলগত গুরুত্ব

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুই রাষ্ট্রের মাঝে অবস্থিত হিমালয়ান দেশটির কৌশলগত গুরুত্ব অনেক। দি ডিপ্লোম্যাট পত্রিকা একে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘ফ্রন্টলাইন’ হিসেবে উল্লেখ করে।

ভারতে সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ভুটানের সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হয়। সিকিমের ভাগ্য তাদের জানা আছে। ভুটানকেও একই ভাগ্য বরণ করতে হতে পারে। নতুন শতকে এসে ভুটানের রাজা তার বেশিরভাগ রাজনৈতিক ক্ষমতা পার্লামেন্টের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। সেখানে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

অনেক পর্যবেক্ষকের বিশ্বাস ২০১৩ সালে ভুটানের নির্বাচনে ভারত ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। দি ডিপ্লোম্যাট পত্রিকা লিখেছে, ভারত তার অর্থনৈতিক আধিপত্য খাটিয়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি জনগণের মনোভাব ও নির্বাচনী ফলাফলেও পর প্রভাব বিস্তার করে।

ভুটানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জিগমে থিনলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করার উদ্যোগ নেন। এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে ভারত দেশটিতে সাবসিডি মূল্যে গ্যাসোলিন ও কেরোসিন সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে শেষ পর্যন্ত থিনলে সরকারের পতন ঘটে।

ওই সম্পর্ক মেরামত করতে ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে ভুটানকে বেছে নেন। তিনি সেখানে গিয়ে আগের বছরের চেয়ে সহায়তা ও ঋণ ৫০% বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়ে আসেন।

ভুটান যদিও তার সার্বভৌমত্ব জোরদার করা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তার অর্থনীতি ও সামরিক খাত এখনো নয়াদিল্লি’র মুঠোয় বন্দী। তাই এ থেকে পুরোপুরি মুক্তির পথ দেশটির জন্য সহজ হবে না বলে গ্লোবাল টাইমস মনে করে।

শেয়ার করুন