সিকিমে অচলাবস্থার নেপথ্যে

সিকিমে অচলাবস্থার নেপথ্যে

সুবীর ভৌমিক,
শেয়ার করুন

ভুটান ও তিব্বত সংলগ্ন ত্রিদেশীয় সংযোগস্থলে ভুটানের দোকলাম উপত্যকায় চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) একটি সি-৪০ সড়ক নির্মাণের চেষ্টা করছে। মিডিয়ায় যেসব অসম্পূর্ণ রিপোর্ট পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় দু’পক্ষ সেখানে একে অপরকে ধাক্কাধাক্কি করছে, গোলাগুলি করছে না। আর পিএলএ সেনারা থামার আগে দু’টি বাংকার ধ্বংস করেছে। জুনের শুরুর দিকে এই ঘটনা শুরু হলেও মিডিয়া শুধু ‘সুত্র’ (এসব সূত্র কি সামরিক না বেসামরিক তার কিছু উল্লেখ করা হয়নি)’র বরাত দিয়ে জুনের শেষ দিকে খবর প্রকাশ শুরু করে।

এতে বলা হয় ভারতীয় সেনারা ‘মানব শেকল তৈরি করে’ পিএলএ সেনাদের থামিয়ে দিয়েছে। এর মানে হলো আমরা কোন স্বাভাবিক সীমান্ত সংঘাতের কথা বলছি না। সেখানে মুখোমুখি অবস্থানে উত্তেজনা থাকলেও তা যেন হিমালয়ের উঁচু অঞ্চলে কোন চীন-ভারত ‘হা-ডু-ডু ম্যাচ’ চলছে।এই ইস্যুর ব্যাপারে সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ড পুরোপুরি নিশ্চুপ। যদিও একজন ব্রিগেডিয়ার এই লেখককে জানিয়েছেন যে, সময়মতো একটি পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে পরিস্থিতির অবনতি থামানো গেছে। দু’দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে বলে মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হলেও কোন পক্ষ থেকেই আনুষ্ঠানিক কিছু বলা হয়নি। অথচ তারা অনেক তুচ্ছ ঘটনায় কিছু বলার জন্য মুখিয়ে থাকে। কাহিনী এখানেই।শত্রুর এই হানা’র ঘটনা ঘটেছে মোদি’র যুক্তরাষ্ট্র সফরের ঠিক আগে। তখন চীনের পররাষ্ট্র দফতর যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতকে দক্ষিণ চীন সাগর বা অন্যকোন জায়গায় একত্রে হস্তক্ষেপ করার যে কোন পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিয়েছিলো। ২০১৫ সালে মেকলডগঞ্জে তিব্বতি, উইঘুর, ফালুনগং ও ১৯৮৯ সালের ভিন্নমতাবলম্বীদের নিয়ে কোন রকম রাখঢাক ছাড়াই যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় তার পর থেকে তিব্বতের ব্যাপারে দিল্লির উদ্দেশ্য নিয়ে চীন সন্দিহান। সম্প্রতি অরুনাচল প্রদেশে দালাই লামার সফর নিয়ে চীন তীব্র বাক্যবান ছোড়ে। বেইজিং সম্ভবত আশংকা করেছিলো তেওয়াংয়ে গিয়ে দালাই লামা তার উত্তরসূরির নাম ঘোষণা করতে পারেন। তাই যে কেউ সিকিমের ঘটনাকে হিমালয় অঞ্চলে চীনের অব্যাহত এই শক্তিপ্রদর্শনের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখতে পারেন। এগুলো করে দিল্লিকে বুঝানো হচ্ছে যে চীনকে উত্ত্যক্ত করতে দিল্লি যেসব কাজ করছে সেগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হলে তাকে উদ্ধার করতে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আসবে না। এটা বেশ মজার।

কারণ দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর সীমান্ত বাণিজ্যের জন্য নথুলা গিরিপথ খুলে দেয়ার পর ১৯৯০’র দশকের শেষ দিকে ভারত ও চীন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো যে তারা পরস্পরের তিব্বত ও সিকিম নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কোন প্রশ্ন তুলবে না।চীনের মিডিয়ায় ‘সীমান্তে একটি গুলি ফোটেনি’ বলে মোদির সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রশংসা করা হলেও দিল্লিকে ১৯৬২ সালের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন দিল্লির সর্বাত্মক সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্র তিব্বতের বিদ্রোহীদেরকে সহায়তা করেছিলো। কিন্তু নেহেরু যখন আমেরিকার কাছে এক  স্কোয়াড্রন জঙ্গি বিমান চাইলেন তখন যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রস্তাবে কান দেয়নি।হিমালয় অঞ্চলে ভারতের মরিয়া হয়ে সামরিক স্থাপনা নির্মাণ নিয়েও চীন উদ্বিগ্ন। এর মানে হলো তাদের ১৯৬২ সালের মতো সামরিক সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।চীনের পররাষ্ট্র দফতর ধলা-সাদিয়ার মতো ভারতের সীমান্ত এলাকায় সড়ক সেতু নির্মাণের কেন বিরোধিতা করছে? তারা বলছে যে বিরোধ নিষ্পত্তির আগে বিরোধপূর্ণ সীমান্তে কোন সামরিক স্থাপনা নির্মাণ সঙ্গত নয়।চীনের সঙ্গে সাড়ে তিন হাজার কি.মি. সীমান্তের মধ্যে সিকিম সেক্টরে ভারতের কৌশলগত ও ভূখণ্ডগত সুবিধা রয়েছে। অর্থায়নের অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারত একটি ‘মাউন্টেন স্ট্রাইক কোর’ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে এই প্রথম মনে হচ্ছে তিব্বতকে কেন্দ্র করে কখনো সংঘাত দেখা দিলে তা কার্যকরভাবে মোকাবেলার জন্য ভারত পরিকল্পনা করছে। ভারতের পরিকল্পনা শুধু সীমান্তে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের জন্য নয়। এ ধরনের পাল্টা আঘাতের ঘটনা ঘটবে সিকিম সেক্টরে। তাই সীমান্ত বাণিজ্যের জন্য নথুলা খুলে দিতে রাজি হয়েও যেকোন সামরিক স্থাপনা সিকিমে ভারতীয়দের অবস্থান মজবুত করবে ভেবে চীন উদ্বিগ্ন।প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফরকালে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় (এলএসি) পিএলএ’র বহুল আলোচিত অনুপ্রবেশ নিয়ে উত্তেজনা পরে প্রশমিত হয়ে আসে। শি এবং তার আগে প্রধানমন্ত্রী লি কেকুইংয়ের ভারত সফরের সময় লাদাখ সেক্টরের দু’টি এলাকা দেপসাং ও চুমারে পিএলএ’র অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটে। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির পর গত তিন বছরে এ ধরনের ঘটনা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশংকর মেনন এই চুক্তির অন্যতম রূপকার।

তাই ভারতীয় সেনাদের অনুপ্রবেশের ঘটনাকে ‘এগেনস্ট দ্যা রান অফ দ্যা প্লে’ বলে মনে হচ্ছে। সিকিম সেক্টরের যে পথ দিয়ে ভারত হানা দিতে পারে (এবং যে কারণে মাউন্টেন স্ট্রাইক কোর গঠন করা হচ্ছে) সেখানে অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিরক্ষার ঘটাতি পূরণের চেষ্টা করছে চীন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতার ব্যাপারেও তারা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। এ সপ্তাহেই অনুষ্ঠিত হলো ভারত-জাপান-যুক্তরাষ্ট্র মালাবার নৌমহড়া। এই মহড়ায় ভারতের বিমানবাহী রণতরী অংশ নেয়। আক্রমণে উদ্ধত বাহিনীগুলোর মধ্যে ‘ইন্টার-অপারেবিলিটি’ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে এই মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। এই মহড়ায় জাপানিদের হেলিকপ্টার কেরিয়ার মোতায়েন করাও গুরুত্ব বহন করে। কারণ, এই তিন নৌবাহিনী (এবং সম্ভবত অস্ট্রেলিয়াও) এখন দক্ষিণ চীন সাগরে সম্মিলিতভাবে আক্রমণ রচনায় সক্ষম।চীন ভুটানকে ভারতের প্রভাব বলয় থেকে বের করে নিয়ে আসতে চচ্ছে। এটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভারতের পাশাপাশি ভুটানও গত মে’তে বেইজিংয়ে ওবিওআর সম্মেলনে যোগ দেয়নি। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার বাকি সব দেশ, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপানও তাতে যোগ দিয়েছে।তাই ভুটান যে অংশটিকে নিজের ভূখণ্ড  বলে মনে করছে সেখানে সড়ক তৈরির প্রচেষ্টার কারণেই সম্ভবত ভারত ১৯৪৯ চুক্তি অনুযায়ী ভূটানের স্বার্থ রক্ষায় সেখানে বিরোধ জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে।

print
শেয়ার করুন