সাংবাদিক নিপীড়ন অব্যাহত রাখছে মিয়ানমার

সাংবাদিক নিপীড়ন অব্যাহত রাখছে মিয়ানমার

ল্যারি জ্যাগান,
শেয়ার করুন

মিয়ানমারের মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসঙ্ঘ বিশেষ দূত অধ্যাপক ইয়াঙকি লি গত রোববার দুই সপ্তাহের সফরে আগমনের ফলে দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি আবারো লাইমলাইটে চলে এসেছে। আরাকান এবং সেখানকার রোহিঙ্গাদের দুর্দশার বিষয়টি এই সফরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেলেও (বিশেষ করে সরকার সম্প্রতি জাতিসঙ্ঘ তদন্ত কমিশনকে দেশটিতে সফর করতে দিতে অস্বীকার করায়) মিডিয়ার ওপর ক্রমবর্ধমান দমন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করাও অন্যতম অগ্রাধিকার পাবে।

মিডিয়ার ওপর কয়েক দশকের নির্মম নিয়ন্ত্রণ এবং অতীতের সামরিক শাসনকালে যেকোনো ধরনের সমালোচনার বিরুদ্ধে নির্মম দমন-নিপীড়ন চালানোর পর প্রেসিডেন্ট থিন সেনের ছদ্মবেশি বেসামরিক সরকার তরতাজা বাতাস গ্রহণের সুযোগ দিয়ে ১৯৫৮ সালের পর প্রথমবারের মতো মিডিয়াকে বৃহত্তর স্বাধীনতা দেয়। প্রাণবন্ত স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের আবির্ভাব ঘটে। একটি নির্ধারিত সীমার পর কড়াকড়ি থাকলেও এটা ছিল কিছুটা উৎসাহজনক বিষয়।
গণতান্ত্রিক আইকন আঙ সান সু চির নেতৃত্বে ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) ২০১৫ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয় পাওয়ার পর আশা করা হয়েছিল, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আরো বাড়বে।

কিন্তু ১৮ মাস আগে এনএলডি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ক্রমবর্ধমান আতঙ্কজনক পরিবেশে মিডিয়াকে ভীতি প্রদর্শন এবং দমন-নিপীড়ন চালানো ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে মিডিয়ার সমালোচনার বিরুদ্ধে দমন অভিযান পরিচালনার প্রতিটি সুযোগই সরকার গ্রহণ করেছে।

গত বছর নোবেলজয়ী সু চি দায়িত্ব গ্রহণের পর সংবাদপত্রের আর্টিক্যাল প্রকাশ কিংবা সামাজিক মিডিয়ায় পোস্টের কারণে সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্ট এবং অন্য অনেক লোকের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। মিয়ানমারের সাংবাদিকেরা এখন সামরিক শাসনের দিনগুলোর চেয়ে অনেক বেশি ভীতিকর পরিবেশে বাস করছে।

ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ করা এবং সংবাদমাধ্যমকে হয়রানি ও মুখ বন্ধ করার জন্য দুটি আইন ব্যবহার করছে। একটি হলো টেলিকমিউনিকেশন আইনের ধারা ৬৬ (ঘ) এবং উপনিবেশ আমলের অবৈধ সমাবেশ আইনের ধারা ১৭ (১)। এই আইনটি সশস্ত্র গ্রুপের সাথে যোগাযোগ নিষিদ্ধ করেছে। এই আইন লঙ্ঘনের শাস্তি হলো তিন থেকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড।

সম্প্রতি তিন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরা হলেন ইরাবতীর লাবি ওয়েং এবং ডেমোক্র্যাটিক ভয়েজ অব বার্মার (ডিভিবি) আয়ে নাই ও পিয়ে ফোন। তারা বিদ্রোহী তাঙ ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির (টিএনএলএ) মাদক পোড়ানো অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। এই সশস্ত্র গ্রুপটি চীন সীমান্তের নর্দার্ন শান রাজ্যের পার্বত্য এলাকায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে লড়াই করছে। ওই তিন সাংবাদিক এখনো কারাগারে রয়েছেন, কয়েক দিনের মধ্যে তাদের আদালতে হাজির করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তাদের আটকাদেশের বিরুদ্ধে মানবাধিকার গ্রুপ, সাংবাদিক সমিতি এবং নাগরিক সমাজ প্রতিবাদ করছে। সরকার বলছে, বিষয়টা এখন বিচারাধীন, তারা এতে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।

এখনো যে কয়েকটি জাতিগত সশস্ত্র গ্রুপকে অবৈধ সংগঠনের তালিকায় রাখা রয়েছে, তার অন্যতম টিএনএলএ। তারা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, শান্তি-প্রক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ নিয়ে প্রয়োজনীয় জাতীয় যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে (এনসিএ) সই করেনি। অবশ্য চীনাদের হস্তক্ষেপে তারা নেপিয়াডাওয়ে অনুষ্ঠিত সরকার আয়োজিত সাম্প্রতিক পাঙলঙ শান্তি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল। ফলে এই গ্রুপের সাথে যোগাযোগ রাখাটা অবৈধ এবং রাষ্ট্রদ্রোহিমূলক কাজ হিসেবে অভিহিত করাটা ভণ্ডামি।

আরো অনেক বেসামরিক লোকজনকে আটক করতে গত কয়েক মাসে এই আইনটির প্রয়োগ করা হয়েছে। মানবাধিকার অ্যাক্টিভিস্টরা আইনটির অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে কাচিন, শান ও রাখাইনে সশস্ত্র ও রাজনৈতিক বিরোধীদের ভীতির মধ্যে রাখার জন্য ১৭(১) ধারায় অনেক লোককে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তবে মিডিয়ার প্রতি ৬৬(ঘ) ধারাটি সবচেয়ে বৈষম্যমূলক এবং উদ্বেগজনক।
সাংবাদিক ও সমালোচকদের ওপর নির্যাতন চালাতে সম্প্রতি অনেক আইন আনা হয়েছে। ২০১৩ সালের টেলিকমিউনিকেশন আইনে অনলাইনে মানহানি, গোলযোগ সৃষ্টি, অযাচিত প্রভাব বিস্তার বা হুমকিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিবেচনা করা হয়েছে। এই আইনে ৭২টি মামলা হয়েছে। অথচ থিন সিনের আমলে আনা হয়েছিল মাত্র সাতটি।

যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের মধ্যে ১৪ জন সাংবাদিক রয়েছেন। এছাড়া সরকার ও সামরিক বাহিনীর সমালোচকও রয়েছেন। গত বছরের একটি বহুল আলোচিত মামলা ছিল ইলেভেন মিডিয়ার প্রধান নির্বাহী এবং শীর্ষ সম্পাদকের বিরুদ্ধে। সু চির দলের এক শীর্ষ কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় দেশটির বৃহত্তম বেসরকারি মিডিয়া কোম্পানি হিসেবে পরিচিত ওই দু’জনের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়। জামিন ছাড়াই তাদের আটক রাখা হয়। কোম্পানি ক্ষমা প্রার্থনা করলে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়।

চলতি বছরের প্রথম দিকে সুপরিচিত স্থানীয় সংবাদপত্র দি ভয়েজের বিরুদ্ধে এই আইনের অধীনে মামলা করা হয়। তাদের অপরাধ ছিল, তারা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে একটি বিদ্রুপাত্মক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য সম্পাদকই একমাত্র দায়ী মর্মে সম্পাদক সাক্ষী প্রদান করার পর লেখককে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করার পরও সম্পাদক কিয়া মিন সুই এখনো জামিন ছাড়া কারাগারে আটক রয়েছেন।

বর্তমানে প্রধান ইস্যু হলো জামিনের বিষয়টি। মিয়ানমারের আইন ও সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ জ্যানেল স্যাফিনের মতে এটা হলো জামিনযোগ্য অপরাধ।

বর্তমান পার্লামেন্ট আইনটির ধারা সংশোধন করছে এবং ধারা ৬৬ (ঘ) পুরোপুরি বাতিল করতে চাইছে। কিন্তু এতে সময় লাগবে। তবে এর ফাঁকে যা করতে হবে তা হলো থিন সেনের আমলে পাস হওয়া মিডিয়া আইনটি জোরদার করা। ২০১৪ সালের মিডিয়া আইনে বলা হয়েছে, মিডিয়াকে আইনের আওতায় রাখার তদারকে একমাত্র সংস্থা হলো মিয়ানমার প্রেস কাউন্সিল। কিন্তু বাস্তবে এটা অনুসরণ করা হচ্ছে না।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য মিয়ানমারে এখনো অনেক কাজ করার বাকি। রিপোর্টাস উইদাউট বর্ডাসের (আরএসএফ) মতে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দিক থেকে ১৮০টি দেশের মধ্যে মিয়ানমারের অবস্থান ১৩১। সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে উত্তর কোরিয়া।

তিন সাংবাদিককে গ্রেফতার করার পর সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন এনএলডির প্রধান মুখপাত্র এবং সিনিয়র কর্মকর্তা। উইন থিন বলেছেন, তিনি সরকারি টিভি চ্যানেল এমএনটিভিকে বলেছেন, মিডিয়াব্যক্তিত্বদের জন্য স্বাধীনতা হলো অপরিহার্য বিষয়। কিন্তু আমাদের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে শান্তি, জাতীয় উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন। এরপর অগ্রাধিকার পায় সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ গণতন্ত্র, মানবাধিকার।

ব্যাপক পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত এবং সরকার যতক্ষণ না বুঝবে যে, কেবল সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সমাজের একটি বৈশিষ্ট্যের জন্যই নয়, বরং গণতন্ত্রায়ন ও উন্নয়নের একটি অপরিহার্য বাহন হিসেবেও স্বাধীন সংবাদপত্র প্রয়োজন, ততক্ষণ পর্যন্ত মিয়ানমারের সাংবাদিকদের দুর্দশার মধ্যেই থাকতে হবে।

লেখক ইয়াঙ্গুনভিত্তিক সাংবাদিক এবং মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ। মিয়ানমার বিষয়ক বেশ কয়েকটি বই এবং গবেষণা প্রবন্ধ লিখেছেন তিনি। ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এশিয়া অঞ্চলের ওপর লেখালেখি করছেন। প্রায় এক যুগ তিনি ছিলেন বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের এশিয়া বিষয়ক সম্পাদক। কলামটি southasianmonitor.com এর জন্য লেখা

print
শেয়ার করুন