খুন, মুখোশধারীদের আনাগোনা নিয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে

খুন, মুখোশধারীদের আনাগোনা নিয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে

এসএএম রিপোর্ট,
শেয়ার করুন
বাংলাদেশের মিয়ানমার থেকে পালিয়ে রোহিঙ্গাদের বসতি

গত মাসের রোজা শেষে মুসলিম প্রধান বাংলাদেশের মানুষ যখন ঈদ উদযাপন করছিলো তখন রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরের নুর আনকিন ব্যস্ত ছিলো প্রতিবেশিদের সহযোগিতায় স্বামীর লাশ দাফনের কাজে। বহু বছর ধরে এই শিবিরে তার বাস। আনকিনের স্বামী মোহাম্মদ আইয়ুবের লাশ পাওয়া যায় গলা কাটা ও দু’হাত পেছনে বাধা অবস্থায়। শিবিরের এক কোনায় আইয়ুবের লাশ পাওয়া যায়।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান এই উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে।

গত কয়েক সপ্তাহে তিন রোহিঙ্গার লাশ উদ্ধার করা হয় উদ্বাস্তু শিবিরগুলো থেকে। প্রায় ২৫ বছর আগে বৌদ্ধ প্রধান মিয়ানমার থেকে মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের পালিয়ে আসার পর থেকে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে সবচেয়ে ভয়ংকর হিসেবে ত্রাণ-কর্মী ও শিবিরে দীর্ঘদিন ধরে থাকা বসতিরা অভিযোগ করেছেন।

গত বছর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর দমন অভিযানের পর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বেড়েছে। রাতের বেলা কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে দুটি ক্যাম্পের আশে পাশের রাস্তায় মুখোশধারী লোকজনের আনাগোনা শুরু হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুশিল ও ত্রাণকর্মীদের ধারণা এসব ক্যাম্পে ত্রাণ সরবরাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান জন্য এসব কাজ করা হচ্ছে।

আনকিস বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান যে, একদল লোক এসে তাকে ও তার মেয়েকে পিটিয়ে আহত করে তার স্বামীকে ধরে নিয়ে যায়। আনকিসের সাত ও তিন বছরের দুটি মেয়ে রয়েছে। সে জানায় যে অপহরণকারীরা তার স্বামীর মোবাইল ফোনে রিং দিয়ে তাকে হত্যার হুমকি দেয়। আল-ইয়াকিন নামে একটি গ্রুপের কাছ থেকেও সে হত্যার হুমকি পাচ্ছে বলে জানায়।

আনকিস মূলত ‘হারাকা আল-ইয়াকিন’ নামে একটি জঙ্গি সংগঠনের কথা বলছে। এই সংগঠনটিকে গত অক্টোবরে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীদের ওপর হামলার জন্য দায়ি করা হয়। ওই হামলার পর রাখাইন রাজ্যে ব্যাপক দমন অভিযান চালায় মিয়ানমার সেনারা। এসময় সেনাদের বিরুদ্ধে বেসামরিক রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন, ধর্ষণ, ঘড়বাড়ি জালিয়ে দেয়াসহ গণহত্যা চালানোর অভিযোগ ওঠে।

তবে রোহিঙ্গা শিবিরে হত্যার পেছনে কোন জঙ্গি গ্রুপের হাত রয়েছে কিনা সে বিষয়ে পুলিশের সন্দেহ আছে। তবে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা অন্য কেউ এতে জড়িত কিনা বা এসব গ্রুপের নামে কোন পক্ষ এসব হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে কিনা পুলিশ তা তদন্ত করে দেখছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ৭৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বালাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে থেকেই এখানে আরো কয়েক লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও নির্বিচার হত্যাকাণ্ড চালানোর খবর মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সরকার অস্বীকার করেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমার সন্ত্রাস-দমন অভিযান অবসান হওয়ার ঘোষণা দিলেও সম্প্রতি ফের উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে।

কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সোচ্চার কয়েকজন রোহিঙ্গার লাশ সম্প্রতি খুঁজে পাওয়া গেছে। তাছাড়া কয়েক দিন আগে একটি কথিত জঙ্গিদমন অভিযানে তিনজন রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে মিয়ানমারের সৈন্যরা।

বাংলাদেশের সরকারি হিসাব মতে কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে গত অক্টোবরের পর জনসংখ্যা ৪৯ হাজার থেকে বেড়ে ৮৬ হাজার হয়েছে। পাশেই আরেকটি শিবিরে ১৪ হাজার রোহিঙ্গা রয়েছে। এখানকার বেশিরভাগ অধিবাসী জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক হাই কমিশন থেকে খাদ্য ও চিকিৎসা সেবা পেয়ে থাকে।

বাংলাদেশের অভিবাসন দফতরের এক কর্মকর্তা জানান সম্পদের ঘাটতি নিয়ে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে উত্তেজনা চলে। সম্প্রতি বন্যা ও ঘুর্ণিঝড়ের কারণে ত্রাণকর্মীদের ওপর সরবরাহ নিয়ে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআর প্রধান শিনঝি কুবো জানান যে তারা নিবন্ধিত শিবিরের বাইরেও তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ দিতে স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন।

আইয়ুবের স্ত্রী আনকিস জানান যে তার স্বামীর সঙ্গে কিছুদিন আগে কুতুপালং ক্যাম্পে কিছু মাদকসেবীর ঝগড়া হয়। গত ১৪ জুন রাতে কিছু মুখোশধারী লোক হাতে চাপাতি-ছুরি নিয়ে তাদের ঘরের বেড়া ভেঙ্গে ঢুকে পড়ে। তারা আইয়ুবকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায়। ২৫ জুন দুই পাহাড়ের মাঝে একটি জলাশয় থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এর এক সপ্তাহ আগে একই জায়গায় একই অবস্থায় পড়ে থাকা অবস্থায় মোহাম্মদ সেলিম নামে আরেক রোহিঙ্গার লাশ উদ্ধার করা হয়।

আইয়ুবের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে, এই হত্যাকান্ডের মোটিভ পরিস্কার নয় বলে পুলিশের এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থাকে জানিয়েছেন।

রাতের বেলা কিছু মুখোশধারী মানুষের রহস্যজনকভাবে ঘোরাফেরার কারণেও শিবিরগুলোতে আতংক তৈরি হয়েছে। ৩০ বছর বয়সি এক নিবন্ধিত রোহিঙ্গা জানান কিছু দিন আগে ১০-১২ জন মুখোশ পরা লোক এসে তার নাম ধরে ডাকাডাকি করে। কিন্তু তিনি ঘরের দরজা খুলেননি। এরা প্রায় এক ঘন্টা ঘরের বাইরে ডাকাডাকি করে চলে যায় বলে জানিয়েছেন তিনি।

 

SOURCEরয়টার্স
শেয়ার করুন