চীনের সর্বশেষ ভারতবিরোধী অবস্থানের নেপথ্যে রয়েছে ওবিওআরের প্রতি মালাবার মহড়ার হুমকি

চীনের সর্বশেষ ভারতবিরোধী অবস্থানের নেপথ্যে রয়েছে ওবিওআরের প্রতি মালাবার মহড়ার হুমকি

পি কে বালাচন্দ্রন,
শেয়ার করুন

ভুটান ও তিব্বতের মধ্যকার সীমান্ত নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যে যে সঙ্ঘাত চলছে, তা নিয়ে লেখালেখিগুলোতে একজনও ব্যাখ্যা করছেন না, কেন চীন এই সময়ে এসে ভারতের সাথে দীর্ঘ দিন ধরে সুপ্ত থাকা সীমান্ত সঙ্ঘাত নতুন করে জাগিয়ে তুলল।

চীন কেন ইস্যুটিকে সামনে নিয়ে এলো, এই প্রশ্নের জবাব ১০-১৭ জুলাই বঙ্গোপসাগরে অনুষ্ঠিত নজিরবিহীন বিশাল আয়োজনে হওয়া ‘মালাবার মহড়া’র মধ্যে রয়েছে বলে এখন মনে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ভারত মহাসাগরে হওয়া নৌমহড়াগুলোর মধ্যে এটিই বৃহত্তম। এতে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানি নৌবাহিনীর বৃহত্তর রণতরীগুলো অংশ নেয়।

এই মহড়ার অকথিত, তবে মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারত মহাসাগরে প্রাধান্য বিস্তার করা এবং ওই এলাকায় চীনের অনাধিকার চর্চা এবং দেশটির উচ্চাভিলাষী ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (ওবিওআর) বৈশ্বিক আন্তসংযোগকারী তথা কৌশলগত প্রাধান্যকর প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে নতুন করে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়াস ভ-ুল করে দেওয়া।

চীন মনে করে, ওবিওআরে সাফল্য লাভ করার জন্য ভারত মহাসাগরে প্রাধান্য বিস্তার করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ঠিক যেমন দক্ষিণ চীন সাগরে প্রভূত্ব বিস্তার অপরিহার্য বিষয়।

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র কিছু দিন হলো কৌশলগত অংশীদারে পরিণত হয়েছে। তবে মালাবার মহড়া চলছে সেই ১৯৯২ সাল থেকে। এবারই প্রথম স্থায়ী সদস্য হিসেবে জাপান এতে অংশ নিলো। এতে দেশটির বৃহত্তম রণতরী, হেলিকপ্টারবাহী ক্যারিয়ার, জে এস ইজুমো অংশ নেয়।

তিন দেশেরই নৌবাহিনীর উপস্থিতিতে মালাবার মহড়া এবাই প্রথম হলো। ভারতীয় নৌবাহিনী এতে আইএনএস বিক্রমাদিত্য মোতায়েন করে। ২০১৩ সালে কমিশনপ্রাপ্ত এই রণতরীটি রাশিয়ার তৈরী কিয়েভ-শ্রেণীর ক্যারিয়ার। যুক্তরাষ্ট্র পাঠিয়েছিল ইউএসএস নিমিটজ সুপার ক্যারিয়ার। জাপানি ইজুমো হলো দেশটির দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৃহত্তম দুটি রণতরীর একটি। এটিতে যুদ্ধবিমান উঠানামা করতে না পারলেও স্বল্প সময়ের জন্য এফ-৩৫বির কিছু সংস্করণ উঠা-নামা করতে পারে। সার্বিকভাবে মোট ১৬টি জাহাজ, দুটি সাবমেরিন এবং ৯৫টি বিমান এতে অংশ নেয়।

ভারতীয় নৌবাহিনীর পি-৮১ সমুদ্র টহলযানও এই মহড়ায় অংশ নেয়। এটাই ছিল চলতি বছরের সাবমেরিন বিধ্বংসী যুদ্ধকৌশলের প্রধান বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রও পি-৮এ পোসেডন বিমান পাঠিয়েছিল। ভারত ৩.২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেনা ১২টি পি-৮১ বিমানের আটটি এখানে কাজে লাগায়। এসব বিমানে রাডার এবং ভয়ঙ্কর হারপুন ব্লক-২ ক্ষেপণাস্ত্র, এমকে-৫৪ হালকা টর্ডেডো, রকেটসজ্জিত ছিল।

মালাবার ২০১৭ উপকূল এবং সাগর – উভয় কার্যক্রমেই অংশ নেয়। মার্কিন নৌবাহিনীর বিবৃতিতে এই মহড়ার ব্যাপকভিত্তিক যুদ্ধকৌশলভিত্তিক কার্যক্রমের কথা প্রকাশ করা হয়।

ভারত মহাসাগরজুড়ে চীনা সাবমেরিন অবস্থান করার প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের মহড়ায় সাবমেরিনবিধ্বংসী যুদ্ধকৌশলের দিকে বেশি নজর দেওয়া হয়। দি ডিপ্লোমেটের মতে, ২০১৫ সাল থেকেই চীনা শাঙ-শ্রেণী এবং সঙ-শ্রেণীর সাবমেরিন ভারত মহাসাগরে মোতায়েন থাকায় ভারতের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। চীন সম্প্রতি তার প্রথম বিদেশ ঘাঁটি তৈরি করেছে আফ্রিকার জিবুতিতে।
শ্রীলঙ্কার সাবেক নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল (অব.) জয়ন্থ কলম্বাজ বলেন, এই মহড়ার মূল বিষয় ছিল পারস্পরিক নির্ভরশীলতায় কাজ করা, বিভিন্ন নৌবাহিনীর মধ্যে একসাথে কাজ করার ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে তারা একসাথে যাতে কাজ করতে পারে, সে জন্য তৈরি করা।

চীন ফ্যাক্টর
মহড়ার লক্ষ্য চীনকে সংযত করা হলেও চীনকে উসকানি দেওয়া কিংবা ভয়াবহ উদ্বিগ্ন হয়ে পাল্টা পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়, এমন পর্যায়ে উপনীত হওয়ার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।

ভারত ২০০৭ সালে জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চার দেশীয় নিরাপত্তা সংলাপে সম্পৃক্ত হয়। এই চার দেশই চলতি বছরের মালাবার মহড়ায় অংশ নেয়। এতে করে বেইজিংয়ের মধ্যে ঘেরাও হয়ে পড়ার আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে বলে দি হিন্দু পত্রিকা উল্লেখ করেছে।

ভারত মহাসাগরে চীনকে সংযত করার জন্যই এই মহড়া চালানো হয়েছে কিনা তা নিয়ে তিন দেশের কেউই কোনো মন্তব্য করতে চায়নি।

ইউএস স্ট্রাইক গ্রুপ ১১-এর কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল উইলিয়াম ডি বায়র্ন কেবল বলেছেন, মালাবার ২০১৭ সব নৌবাহিনীকে এই বার্তাই পাঠিয়েছে, ‘আমরা একসাথে থাকলেই আরো ভালো থাকবো।’ তিনি আরো বলেন, এই মহড়া ‘সব ভুল বুঝাবুঝির আশঙ্কা দূর করবে।’

জাপান ও শ্রীলঙ্কা
ইনস্টিটিউট ফর ফিউচার ইঞ্জিনিয়ারিং (স্ট্র্যাটেজি, ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি)-এর রিসার্চ ফেলো ড. সাতোরু নাগাও বলেন, জেএস ইজুমোর অংশগ্রহণ নিয়ে চীন খুবই উদ্বিগ্ন। কারণ দেশটি বিশ্বাস করে, জাপান এখন মার্কিন প্রতিরক্ষা বিষয়াদি থেকে স্বাধীন। এখন সে নিজের শক্তিতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মহড়ায় অংশ নিলো।

ড. নাগাও বলেন, ইজুমো সিঙ্গাপুরে সফরের সময় সিঙ্গাপুরকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিল চীন। ইজুমো যখন ভিয়েতনাম সফর করেছিল, তখন ভিয়েতনামকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিল চীন। এখন ভারতে প্রবেশ করেছে ইজুমো। আর তাই ভারতকে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছে চীন। জাপানের সামরিক সম্ভাবনায় বিশ্বাস করে চীন। চীন জানে, এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও জাপানিদের বিরুদ্ধে সে কোনো বড় অভিযানে জয়ী হতে পারেনি।

মালাবার মহড়ায় শ্রীলঙ্কা অংশ নেয়নি। তবে অ্যাডমিরাল (অব.) জয়ন্থের মতে, এই মহড়ার গোপন উদ্দেশ্য ছিল চীনা সাবমেরিন তৎপরতা সীমিত করা।
তবে তিনি নিজে মালাবার মহড়ায় শ্রীলঙ্কার অংশগ্রহণের পক্ষে ছিলেন। কারণ দেশটির অবস্থান ভারত মহাসাগরের কৌশলগত অবস্থানে।

তিনি বলেন, বিশ্বের প্রধান বাণিজ্য রুটের ঠিক উত্তরে শ্রীলঙ্কার অবস্থান। ভারত মহাসাগর যাতে আইনভিত্তিকব্যবস্থার আলোকে সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত থাকে, তা নিশ্চিত করতে শ্রীলঙ্কা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

অস্ট্রেলিয়া
সাবেক মালাবার অংশগ্রহণকারী অস্ট্রেলিয়া ২০১৭ সালে অংশ নেয়নি। বলা হয়েছে, চীনকে খুব বেশি ক্ষ্যাপাতে চায়নি ভারত। এ কারণেই ভারত তাকে অংশগ্রহণ করতে দেয়নি। তবে গত জুনে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া আলাদা দ্বিপক্ষীয় মহড়ায় অংশ নিয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া সম্প্রতি একটি মহড়া চালিয়েছে।

তবে নরেন্দ্র মোদির মতো রাখঢাকহীন মার্কিনপন্থী ভারত সরকারের অস্ট্রেলিয়াকে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখাটা খাপছাড়া মনে হয়েছে। কারণ অস্ট্রেলিয়ার সাথে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করে যাচ্ছে ভারত। ২০১৪ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি সই করেছে। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুলকে নয়া দিল্লিতে স্বাগত জানানো হয়েছে। এই সফরে ভারতে ইউরেনিয়াম রফতানি করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে অস্ট্রেলিয়া। তাছাড়া পরমাণু সরবরাহ গ্রুপে ভারতের অন্তর্ভুক্তিতে অস্ট্রেলিয়া সমর্থন দেবে বলেও জানিয়েছে। ২০১৮ সালে যৌথ সেনা মহড়ার ব্যাপারে দুই দেশ একমত হয়েছে, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়েও তারা সমঝোতায় পৌঁছেছে।

তবে এই সম্পর্কে কিছু জটিলতাও আছে। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র যে ‘লজিস্টিকস সাপোর্ট এগ্রিমেন্ট’ সই করেছে, সে ধরনের কিছুতে সই করতে রাজি হননি টার্নবুল। ছয় বছর ধরে চলা ব্যাপকভিত্তিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি নিয়ে আলোচনায় অচলাবস্থার নিরসন হয়নি। নিয়োগকর্তার সমর্থনপুষ্ট সাময়িক ভিসা কর্মসূচি বাতিল করেছে অস্ট্রেলিয়া। এতে ভারতীয়রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মারাত্মকভাবে।

অবশ্য, তারপরও অস্ট্রেলিয়ার অংশগ্রহণ চায় যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে, বর্তমানের পরিবর্তনশীল ব্যবস্থার বদলে মালাবার মহড়ার একটি স্থায়ী সদস্যপদ থাকুক।

print
শেয়ার করুন