কিভাবে শেষ হতে পারে আফগান যুদ্ধ?

কিভাবে শেষ হতে পারে আফগান যুদ্ধ?

সালমান রাফি,
শেয়ার করুন

সাম্রাজ্যের কবরস্তান হিসেবে বর্ণিত দেশটিতে পুরনো আফগান যুদ্ধের যুক্তি নতুন করে প্রচার করে কি যুক্তরাষ্ট্র রক্ষা পাবে?

সাউথ এশিয়ান মনিটরে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে আমি উল্লেখ করেছিলাম, সাম্রাজ্য বিনির্মাণের যুগ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্র-আফগান যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হবে এমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বরং যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে যে বিতর্ক চলছে, চরমপন্থার ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় এবং ‘অচলাবস্থা’ নিরসনে আফগানিস্তানে কত মার্কিন সৈন্যর উপস্থিতি দরকার বা দরকার নয়।

এই বিতর্কের মধ্যেই অনেকটা অলক্ষ্যে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, আফগানিস্তানকে আইএসআইএসের ‘নিরাপদ স্বর্গে’ পরিণত না হতে দেওয়াটা। এটা মৌলিক প্রকৃতির দিক থেকে ২০০১ সালে বুশ প্রশাসনের আফগান যুদ্ধের মূল যুক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য ছিল আল-কায়েদা। এই সংগঠনের নেটওয়ার্ককে বিধ্বস্ত ও গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
মার্কিন নীতিনির্ধারণী মহল এবং সামরিক-প্রতিরক্ষা এস্টাবলিশমেন্টে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে আফগান যুদ্ধ। দেশটিতে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ অবস্থানগুলো নির্মূল করতে প্রায় ৪ হাজার সৈন্য খুব শিগগিরই পাঠানো হচ্ছে। এতে করে দীর্ঘ কাল ধরে ঘুরতে থাকা ভূ-রাজনীতির চাকাটা আরো শক্ত হলো।

তবে আসল প্রশ্ন হলো যা সমাধান করতে হবে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে পর্যাপ্ত মনোযোগ পেতে ব্যর্থ হয়েছে সেটি : তালেবান যখন আফগানিস্তানের প্রায় ২০০ জেলা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং যখন ওই দেশে আইএস-কে নামে পরিচিত সংগঠনটি দুর্দান্ত আক্রমণের মাধ্যমে তাদের উপস্থিতি ঘোষণা করেছে, তখন মার্কিন এই অবস্থান কি ভালো কিছু বয়ে আনবে?

মার্কিন সিনেটর এলিজাভেথ ওয়ারেন (তিনি মার্কিন সিনেটে আর্মড সার্ভিসেস কমিটিরও সদস্য) সম্প্রতি পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে সফরের পর ভিন্ন এবং প্রভাবশালী ভাষ্যের সাথে কিছুটা দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। তিনি কেবল মার্কিন সামরিক মোতায়েনেরই বিরোধিতা করেননি, সেইসাথে সঙ্কটটির অ-সামরিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, পরিস্থিতির প্রতি ন্যূনতম নজর না দিয়ে আফগানিস্তানে ‘কূটনৈতিক শূন্যতা’ সৃষ্টি করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনকে হুঁশিয়ার করে দেন। তিনি জানিয়ে দেন, তিনি সৈন্য বাড়ানোর পক্ষে নন।

তিনি এমনও বলেছেন, আফগানিস্তানে একজনও মনে করে না, সামরিকভাবেই সমস্যার সমাধান সম্ভব। তিনি আরো বলেন, রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে দূতাবাস কম্পাউন্ডে যে লোকটি এক ভবন থেকে আরেক ভবনে আমাদের সাথে হেঁটেছিল, তাদের একজনও তাতে বিশ্বাস করে না।

আরেক সিনেটর বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনকে এখন বলতে হবে, আফগানিস্তানে জয়ের কী আছে এবং আমরা কিভাবে তা পাবো। তিনি বলেন, তারা কেবল সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিকল্পনার আলোকে ব্যাপকভিত্তিক আমেরিকান কৌশলের আলোকে সৈন্য মোতায়েন করতে চায়।
তালেবান ও আইএস-কের অবস্থান-জনিত সমস্যা ছাড়া আর কিছুই বিস্তারিত বলা হয়নি। অথচ বাস্তবতা হলো, গত ২৫ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র যে রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণ করেছে, সেটা ধসে পড়ছে, আফগানিস্তানের রাজনৈতিক আবরণ এমনভাবে ছিন্নভিন্ন হওয়ার হুমকির মধ্যে পড়েছে যে, যার ফলে প্রায় নিশ্চিতভাবেই জঙ্গি বাহিনী আরো সম্প্রসারিত হবে। আফগানিস্তানবিষয়ক মহাপরিদর্শকের অনেক প্রতিবেদনে একথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে।
গ্রুপের মধ্যে হেকমতিয়ারকে অন্তর্ভুক্ত করাটা ‘ইতিবাচক ঘটনা’ হিসেবে দেখা হলেও আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি সংশ্লিষ্ট থাকলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আফগান সরকার নিজে (এর প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুল রাশিদ দোস্তাম তিন দলীয় সরকারবিরোধী আলাদা জোট গঠন করেছেন) রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সঙ্ঘাতের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

রশিদ দোস্তামের নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের সাথে সম্পৃক্ত থাকার দৃশ্যত কারণ গনি প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির প্রয়াস হলেও এর মাধ্যমে তিনি সম্ভবত সাবেক প্রাদেশিক গভর্নর আহমদ ইশচির ওপর হামলায় তার কথিত সম্পৃক্ততা নিয়ে শুরু হওয়া তদন্তে অনুকূল ফলাফল কামনা করছেন। তবে এই সঙ্কট আফগাননীতিকে অত্যন্ত ভঙ্গুর হওয়ার বিষয়টিই তুলে ধরেছে। জোটের অন্যান্য শরিকের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা দরকার। এই জোটে সামিল হয়েছেন উত্তরা লীয় বালখ প্রদেশের ক্ষমতাধর গভর্নর মোহাম্মদ নূর এবং আফগানিস্তানের প্রধান নির্বাহী আবদুল্লাহ আবদুল্লাহর সহকারী মোহাম্মদ মোহাকিক। উল্লেখ্য, আবদুল্লাহ হচ্ছেন গনির প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি এবং প্রেসিডেন্ট পদে দাবিদার।

তুরস্কের উদ্দেশে যাত্রার এক সপ্তাহ আগে এক রাজনৈতিক সমাবেশে নূর বলেছিলেন, দেশের সমস্যা নিরসন করতে হলে আমাদের কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা থাকলে চলবে না। অন্যথায় আমরা সবচেয়ে শক্তিশালী ও সবচেয়ে বিপজ্জনক বেসামরিক আন্দোলন গড়ে তুলবো। উল্লেখ্য, তুরস্কেই তারা নতুন জোটের ঘোষণা দেন।

একইভাবে কয়েক মাস আগে বালখের গভর্নর সরাসরি গনির সাথে আলোচনা করে কয়েকটি বিষয়ে একমত হন বলে জানা গেছে। গনি-নূর আলোচনার পূর্ণ ফলাফল সম্পর্কে অস্পষ্টতা থাকলেও কিছু কিছু প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। এতে মনে হচ্ছে, রাজনৈতিক এবং সেইসাথে সামরিক- উভয় ফ্রন্টেই গনি ক্রমবর্ধমান হারে সমস্যায় পড়ছে।

তাহলে দৃশ্যত অনন্ত যুদ্ধ এবং অব্যাহত রাজনৈতিক ভঙ্গুরতা থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে এবং সেইসাথে আফগানিস্তানকে বের করতে আনতে আমেরিকার কোন কৌশল গ্রহণ করা উচিত?

নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, আফগানিস্তানে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতির উত্তপ্ত ইতিহাস এবং সামরিক সমাধান চাপিয়ে দেওয়া এবং রাজনৈতিকব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় অক্ষমতার প্রেক্ষাপটে আমেরিকার উচিত হবে আফগানিস্তানে সম্ভাব্য অসামরিকীকরণের বিষয়টি আমলে নেওয়া এবং আফগানিস্তান সীমানার ঊর্ধ্বেও শান্তি-প্রক্রিয়া ছড়িয়ে দেওয়া।

আর এটা শুরু করতে হবে যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে তালেবান এবং বিশেষ করে পাকিস্তান, চীন ও রাশিয়ার মতো দেশ সম্ভাব্য কী ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গি চুলচেরা বিশ্লেষণ করে। আবার এটাও শুরু করতে হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই ধারণার ভিত্তিতে যে, আফগানিস্তানকে ইউরেশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় ঘাঁটিতে পরিণত করার জন্য দেশটিকে দীর্ঘ স্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার চেয়ে যুদ্ধ বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রকে আগ্রহী।

সালমান রাফি শেখ পাকিস্তানভিত্তিক সাংবাদিক। দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতি, পররাষ্ট্র সম্পর্ক, নৃতাত্বিক সংঘাত ও বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধি লড়াই নিয়ে তিনি লেখালেখি করেন। কলামটি সাউথএশিয়ানমনিটর.কম এর জন্য লেখা।

শেয়ার করুন