নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা: লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরির জন্য এখন করণীয় কিছু নেই:...

নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা: লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরির জন্য এখন করণীয় কিছু নেই: সিইসি

এসএএম স্টাফ,
শেয়ার করুন

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতির অংশ হিসাবে কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনের দেড় বছর আগে উন্মোচন করা এ রোডম্যাপে নির্বাচনের প্রস্তুতিমূলক বিষয়গুলো কখন কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে তা উল্লেখ করা হয়েছে। এই রোডম্যাপ ধরে ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠকে বসবে কমিশন।

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর ৬ মাসের মাথায় গতকাল রোববার কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে রোডম্যাপ ঘোষণা করে। আগারগাঁওস্থ ইসির ইটিআই ভবনে একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আগামী দেড় বছরের কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) তুলে ধরেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। রোডম্যাপ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলসহ সব অংশীজনের সুপারিশের পাশাপাশি সবার সহযোগিতা চান সিইসি। তিনি বলেন, বিদ্যমান আইনে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব। তবে সকলের সহযোগিতা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।

নির্বাচন কমিশনকে সাংবিধানিক বাধ্য-বাধকতায় ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে হবে। সে লক্ষ্যে ৭টি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে ১৫ পৃষ্ঠার রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে ইসি।

সিইসি বলেছেন, আগামী নির্বাচনে শুধু সরকার কেন, রাজনৈতিক দল বা যে কোনো দেশি-বিদেশি সংস্থার প্রভাবমুক্ত অবস্থায় নির্বাচন করবো আমরা।

এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি জানান, এই মুহূর্তে রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডে পুলিশের বাঁধা দেয়ার বিষয়ে ইসির কোনো ভূমিকা পালন করার এখতিয়ার নেই। তবে তফসিল ঘোষণার পর সব ক্ষমতাই ইসি’র নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তার আগে রাজনৈতিক দলের জন্য লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি করা ইসির এখতিয়ারভুক্ত নয়।

তফসিলের আগে সরকারকে অনুরোধ নয়

এক প্রশ্নের জবাবে কে এম নূরুল হুদা বলেন, লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরির জন্য এই মুহূর্তে সরকারের কাছে আমরা অনুরোধ করতে পারি না। সরকারের উপর প্রভাব ফেলতে পারি না। তফসিল ঘোষণার পরবর্তী ৯০ দিন নির্বাচনী আইন-বিধি অনুযায়ী আমরা কাজ করবো। তিনি বলেন, তফসিল ঘোষণার পর যদি নির্বাচনী কাজে ডিস্টার্ব ফিল করি বা কোনো ধরনের পরিবর্তনের দরকার হলে তখন আমরা সরকারকে বলতে পারি। আমাদের হাতে যেসব আইন ও বিধিবিধান আছে তা নির্বাচনের জন্য যথেষ্ট। এখন দেখার বিষয় আমরা তা প্রয়োগ করতে পারছি কি না। এর জন্য আমাদের যেমন দায়িত্ব আছে, তেমনি সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ও দলেরও দায়িত্ব রয়েছে। ভোটারদের বাধা দিলে আরপিওতে সাজার বিধান আছে। এক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ও দল এগিয়ে এলে নির্বাচনী আইন ও বিধি প্রয়োগ করতে সুবিধা হয়।

তফসিল ঘোষণার পর ব্যবস্থা

সংবাদ সম্মেলনে সিইসির কাছে প্রশ্ন করা হয়, ওয়ান ইলেভেনের সরকারের সময়ে ঘরোয়া রাজনীতি করা গেলেও সম্প্রতি একজন রাজনীতিবিদের বাসায় কয়েকটি দলের নেতাদের ঘরোয়া বৈঠক করতে পুলিশ বাধা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতি কি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য সহায়ক? জবাবে সিইসি বলেন, এই মুহূর্তে এটি দেখা আমাদের এখতিয়ারভুক্ত বিষয় নয়। আমরা তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনী পরিবেশ বজায়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেব।

ইসির এ ধরণের বক্তব্য দায় এড়ানো কি না—এমন আরেক প্রশ্নের জবাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, আমাদের দায় কী—তা আইন দ্বারা নির্ধারিত। আমরা সেই পথে হাঁটবো। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন, রাজনৈতিক দল, দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচনে সমান সুযোগ করে দেওয়া, আমরা তা করবো। আমাদের আইন ও ক্ষমতার সর্বাত্মক প্রয়োগ করে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের নিরাপত্তার বিধান করবো।

প্রভাবমুক্ত থাকবো

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুধু সরকার কেন? যেকোনো রাজনৈতিক দল এবং দেশি-বিদেশি প্রভাব এলেও আমরাও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারবো বলে আমাদের আস্থা আছে। বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করা কতটুকু সম্ভব- এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারবো।

কে বক্তৃতা করবে, কে দিতে পারছে না-তা দেখার বিষয় নয়

বর্তমানে রাজনীতিতে সবাই সমান সুযোগ না পেলে নির্বাচনে লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি হবে কী না- এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাজ টেকনিক্যাল। পল্টন ময়দান বা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কে কিভাবে বক্তৃতা করবে, কে বক্তৃতা দিতে পারছে না- সেটা দেখা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নয়।

তফসিলের সময়সীমা বলা যাবে না

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কখন অনুষ্ঠিত হবে – এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, এখনই নির্বাচনের সময়সীমা সম্পর্কে বলা যাবে না। যদি যেকোনো সময়ে সংসদ ডিজলভ (ভেঙে দেয়া) করা হয়, অথবা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙ্গে দেওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। তবে সংসদ না ভাঙ্গলে সংবিধান অনুযায়ী ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন করতে হবে।

প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রন আমাদের হাতে

নির্বাচনের সময়ে ইসি সহায়ক সরকারের দায়িত্ব পালনে সক্ষম কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, নির্বাচনের সময়ে সরকার সরকার কাঠামো কীভাবে থাকবে সংবিধান ও আইনে বলা আছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের সময়ে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে থাকবে। তফসিল ঘোষণা থেকে নির্বাচনের পরের ১৫দিন প্রশাসনের সব স্তর, আর্মিসহ সিভিল প্রশাসনে পদায়ন, বদলির ক্ষেত্রে কমিশনের অনুমোদন নিতে হয়। এ হিসাবে এ দায়িত্ব পালন করতে পারি। তবে নির্বাচনী প্রচারণায় হেনস্তার শিকার হলে- এর দায় কার? এ প্রশ্নের জবাবে সিইসি সোজাসাপ্টা বলেন, দায় ইসির। তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনী প্রচারণায় কেউ বাঁধা দিলে, নির্বাচনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে আমরা আইন দ্বারা ব্যবস্থা নেবো। আরপিওতে একটি অধ্যায়ে এ বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। ওই অধ্যায় অনুযায়ি প্রটেকশন দেয়া আমাদের দায়িত্ব।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, নির্বাচন নিয়ে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করি। ওই বৈঠকে স্বরাষ্ট্র সচিব, আইজি, বিভিন্ন সংস্থার প্রধানেরা অংশ নেন। নির্বাচনে তাদের কী দায়িত্ব তা ব্যাখ্যা করে জানিয়ে দেই।

ইভিএমে ভোটগ্রহনের দরজা বন্ধ করিনি

নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের কোনো পরিকল্পনা আছে কী না- এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, আমরা ইভিএম এ ভোটগ্রহণের দরজা বন্ধ করিনি। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে ইভিএম নিয়ে আলোচনা করবো। ২০১০-১১ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছিল। ভুলত্রুটির কারণে এটি বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে আমাদের কাছে বুয়েটের তৈরি ৭০০-৮০০টি ইভিএম রয়েছে, যা ৫-৬ বছর পুরানো। এখন প্রযুক্তিরও অনেক উন্নয়ন হয়েছে। আবার ইভিএম নিয়ে দেশে ও বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় বিতর্ক রয়েছে। আগামী নির্বাচনে বুথের সংখ্যা হবে আড়াই লাখ ও ভোটকেন্দ্র হবে ৪০ হাজার। ওই সময়ের মধ্যে ইভিএম তৈরি করা অসম্ভব তা নয়। তাই কমিশন স্কোপ রেখেছে।

রোডম্যাপ সূচনা দলিল

রোডম্যাপ প্রকাশকালে সিইসি বলেন, এটি একটি সূচনা দলিল। নির্বাচনের পথে কাজের জন্য এ কর্মপরিকল্পনাই সব নয়। সংশোজন-পরিমার্জন করে সবার মতামত নিয়ে আমরা কাজ করে যাবো। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রত্যয় নিয়ে কমিশন কাজ করে যাচ্ছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

নির্বাচন কমিশন সচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। এ সময় নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, মো. রফিকুল ইসলাম ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) শাহাদত হোসেন চৌধুরী ও অতিরিক্ত সচিব মোখলেসুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

SOURCEইত্তেফাক
শেয়ার করুন