ভুটানকে নিয়ে চীন-ভারত অচলাবস্থা নিরসনের লক্ষণ নেই

ভুটানকে নিয়ে চীন-ভারত অচলাবস্থা নিরসনের লক্ষণ নেই

পি কে বালাচন্দ্রন,
শেয়ার করুন

ভুটান-তিব্বত সীমান্তে চীনের সঙ্গে যে সামরিক অচলাবস্থা চলছে তা নিয়ে ভারত এখনই কোন চূড়ান্ত ম্যাচ খেলতে চায় না। তাদের আশা চীন শিগগিরই হুমকি-ধামকি বন্ধ করে আলোচনার মাধ্যমে সীমান্ত বিরোধ নিস্পত্তির জন্য এগিয়ে আসবে। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে দীর্ঘ সময় – গত দু’সপ্তাহ ধরে এই সংকট শুধু তীব্র হচ্ছে, চীন প্রায় প্রতিদিন নতুন নতুন হুমকি দিয়ে তার যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রকাশ করে চলেছে।

১৯৬২ সালের যুদ্ধের মতো আবারো ভারতকে গুড়িয়ে দেয়া হবে বলে হুমকি দিয়ে বেইজিং শুরু করে। এরপর তারা বলে সিকিম ও ভুটানে ভারতের নিয়ন্ত্রণ অবৈধ। তাই ভারতের শাসন ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে ভুটান ও সিকিমবাসীর বিদ্রোহ করা উচিত। এতে চীন সহায়তা দেবে। এরপর ভারতকে মনে করিয়ে দেয়া হয় যে বিদ্রোহী সংগঠনে ভর্তি উত্তরপূর্বাঞ্চলের ওপর দেশটির নিয়ন্ত্রণ খুবই দুর্বল। পরিশেষে এ কথাও বলা হয় যে পাকিস্তান চাইলে চীন কাশ্মিরে সামরিক হস্তক্ষেপ  করতে পারে।

চীন আলোচনাকে বাতিল করে না দিলেও যে শর্ত দিয়েছে ভারত তা মানতে পারে না যদি সে দেশ-বিদেশে মুখ রক্ষা করতে চায়। আলোচনা শুরুর জন্য ভারতীয় মিডিয়ার পক্ষ থেকে সনির্বন্ধ অনুরোধের প্রেক্ষাপটে চীন বারবার বলছে যে ভারতকে বিতর্কিত ভূখণ্ড থেকে একতরফাভাবে সেনা প্রত্যাহার করে নিতে হবে। চীন নাছোড়বান্দার মতো বলে চলেছে যে ১৮৯০ সালে বৃটিশ রাজ ও তিব্বতের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী এই সীমান্ত নিয়ে কোন বিরোধ নেই। ভূমির ওপরেও এই সীমান্ত চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও আবহাওয়া ও চোরদের কারণে সীমান্ত খুটিগুলো নেই।

ভারত এই শর্ত মেনে নিলে তা হবে সে দোকলামে আগ বাড়িয়ে প্রবেশ করে আগ্রাসী তৎপরতা চালিয়েছে। চীনা শর্তের আরেকটি অপমানজনক দিক হলো প্রত্যাহার হবে একতরফা। এর মানে হলো ভারত সেনা প্রত্যাহার করে নিলেও চীনা সেনারা থেকে যাবে। এর মানে হলো আলোচনার টেবিলে ভারত আর কোন প্রতীকী পক্ষ হিসেবে থাকলো না।

ভারত যদি শর্তগুলো মেনে নেয় তাহলে সে দোকলামকে বিতর্কিত সীমান্ত হিসেবে দাবি করে আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির যে দাবি করেছিলো তা ফিরিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে চীনের ভূখণ্ড দখল প্রতিরোধ করতে ভুটানের আহ্বানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাড়া দিতে পারে না বলেও ভারতকে মেনে নিতে হবে।

এটা হবে ২০০৭ সালে ভারত-ভুটান চুক্তি বাতিলের সামিল। ওই চুক্তিতে বলা হয় যে দুই পক্ষ ‘তাদের জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কিত ইস্যুগুলোতে ঘনিষ্ঠভাবে পরষ্পরকে সহায়তা করবে।’ চুক্তির এই দৃষ্টিকোণ থেকেই দোকলামে ভারত সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়েছে।

চীন ভারতের সঙ্গে ভুটানের এ ধরনের সম্পর্ক বাতিল করতে চায়। কারণ, এর ফলে ভুটানের বিষয়ে ভারতের হস্তক্ষেপ কখনো কখনো চীনের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এখনো তাই হয়েছে। ভুটানকে ভারতের কাছ থেকে সরিয়ে এনে চীনের একটি স্যাটেলাইট স্টেটে পরিণত করতে বেইজিং অনেক দিন ধরেই চেষ্টা চালিয়ে আসছে।

চীনের তিব্বত অঞ্চল ও ভারতের সঙ্গে ভুটানের সীমান্ত রয়েছে। চিম্বু উপত্যকায় সরু একচিলতে ভূমিতে তিব্বত, সিকিম ও ভুটানের মিলন ঘটছে। ওই জায়গাটি ভারতে শিলিগুড়ি করিডোর থেকে মাত্র ৩০ কি.মি দূরে। ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত এই করিডোর ভারতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে মূলভূখ-ের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

চিম্বু উপত্যকায় চীন অবকাঠামো নির্মাণ করছে। এখানে ২৯ কি.মি. দীর্ঘ একটি সড়কও তৈরি করা হচ্ছে। ভুটান ও ভারত একে বিতর্কিত ভূখণ্ড বলে মনে করছে। কিন্তু চীন এলাকাটিকে তিব্বতের অংশ বলে দাবি করছে। বহু বছর ধরে চীন অবকাঠামো প্রকল্প নির্মাণের জন্য ভূটানের  ভূখণ্ডের কিছু কিছু অংশ দাবি করে আসছে এবং ভুটানও চীনের দাবি মেনে নিচ্ছে।

এতদিন ভুটানের অসহায়ত্বের প্রতি ভারত চোখ বুজেছিলো। কিন্তু যখন চীনের দীর্ঘ সড়কটি সিলিগুড়ি করিডোরের কাছাকাছি পৌঁছে যায় তখন এর অন্তর্নিহিত বিপদ বুঝতে পেরে নয়াদিল্লি সচেতন হয়ে ওঠে।

চীনের অভিযোগ, ভারত আসলে নিজের স্বার্থে হস্তক্ষেপ করেছে এবং ভুটানিদের বাধ্য করেছে যেন চীনকে সড়ক নির্মাণ বন্ধের জন্য চাপ দেয়। ১৪ জুলাই সিনহুয়ার এক সম্পাদকীয়তে বলা হয় যে, ভুটান ভারতকে হস্তক্ষেপের জন্য অনুরোধ করেছে এর কোন প্রমাণ নেই।

১৮৯০ সালের চুক্তিতে যে সীমান্তের প্রশ্নটি নিষ্পত্তি করা হয়েছে ভারত তা মানে।  কিন্তু বিরোধ হলো দোকলামের ঠিক কোন অংশ দিয়ে সীমারেখাটি টানা। প্রকৃত সীমারেখা নিয়ে চীনের বক্তব্যের সঙ্গে ভারতের বক্তব্য মিলে না। তারচেয়ে বরং বিষয়টি আলোচনার টেবিলে ঠেলে দেয়া হোক। ভারত জোর দিয়ে বলছে যে, সে তার মিত্র ভুটানের সাহায্যের অনুরোধে সাড়া দানে বাধ্য।

ভারত মনে কওে, এক্ষেত্রে ভারতের কোনরকম নমনীয়তা ভুটানের সঙ্গে তার সম্পর্ক গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ১৯৪৯ সালে ভারতের একটি সামন্ত রাজ্যের মতো অবস্থা থেকে ভুটান ক্রমেই স্বাধীন সত্বা হিসেবে আবির্ভুত হতে চাইছে। এমনকি এখনো ভারত চাইছে যে তার কৌশলগত স্বার্থের ব্যাপারে ভুটান সমর্থন দেবে।

ভারত যদি চীনা হামলার সম্মুখিন হয় তাহলে সে নিজের স্বার্থ রক্ষায় ভুটানের কাছ থেকে সহযোগিতা চাইতে পারবে। একইভাবে চীন পাল্টা কোন উদ্যোগ নিলে ভুটানও ভারতের কাছে সহায়তার জন্য আবেদন জানাতে পারবে। ভারত যদি তার প্রয়োজন পূরণে অসমর্থ হয় তাহলে ভুটানের পক্ষে চীনের দাবি মেনে নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না।

তবে ভুটান বেশ কয়েক বছর ধরে চীনের ভূখণ্ড গত দাবি মেনে নিয়ে দেশটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে চাইছে। এটা অংশত হয়েছে ভারতের সঙ্গে অসংগত সম্পর্কে খুশি হওয়ার খুব তেমন একটা কারণ না থাকায়। ভুটান প্রতিবেশি বড় ভাইয়ের ওপর অর্থনৈতিক ও আর্থিকভাবে অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। ভুটানকে বিপুল পরিমাণে ঋণ ও অনুদান দিয়ে ভারত দেশটির আনুগত্য কিনে নিয়েছে। ভারতে ওপর ভুটানের নির্ভরশীলতা এই পর্যায়ে যে ভুটানের ৯০% রফতানি হয় ভারতে। অন্যদিকে, তার আমদানি প্রয়োজনের ৭৫% ভারত পূরণ করে।

ভুটান একটি পুরোপুরি রাজা শাসিত রাষ্ট্র হিসেবে থাকার দিনগুলোতে ভারতের সঙ্গে এর সম্পর্ক বেশ ভালো ছিলো। কিন্তু ২০০৭ সালে রাজতন্ত্রের অবসানের পর থেকে দেশটি স্বাধীন পরাষ্ট্রনীতি অনুসরণের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। একই সঙ্গে ভারতের পাশাপাশি বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও আরো বিস্তৃত ও জোরদার সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে। এতে নয়াদিল্লি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়। যে কারণে ভুটানে ২০১৩ সালের নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে ভারত দেশটির ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। এই নিষেধাজ্ঞা ভুটানের জনগণের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে এবং তারা ভারতের ব্যাপারে ক্রমেই সন্দিহান হয়ে ওঠছে। ভুটানিরা এই মুহূর্তে কিছু বলছে না এই কারণে যে তাদের আশংকা এর পরিণতিতে ১৯৭৫ সালে সিকিম দখল করে নেয়ার মতো আরেকটি ঘটনা ঘটতে পারে।

ফলে, ভারত একটি বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ে গেছে। একদিকে একে ভুটানের ওপর নিজের কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতে চীনের ধমকানির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। তাকে নিশ্চিত করতে হবে যেন চীন শিলিগুড়ি করিডোরের খুব কাছে না আসতে পারে। এতে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ হুমকির মুখে পড়বে। ইতোমধ্যে এই অঞ্চলের বিদ্রোহ নিয়ে নয়াদিল্লি সমস্যায় রয়েছে। অন্যদিকে, বিপুল সামরিক শক্তির অধিকারী চীনের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে ভারত জড়িয়ে পড়তে পারে না। এতে তার অনেক দখল হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। সামরিকভাবে যেকোন পরাজয়ে ভুটান, সিকিম ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর কাছে ভারতে বিশ^াসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

চীনের ইন্সটিটিউট অব সাউথ, সাউথ ইস্ট এশিয়ান এন্ড ওশানিক স্টাডিজের পরিচালক ড. হু শিসেং টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলেন, চীন আলোচনার জন্য যেসব শর্ত দিয়েছে তা থেকে তাদের সরে আসার কোন পথ নেই। ভারতের একতরফা প্রত্যাহার চীন সরকারের জন্য নীতিগত ও প্রকাশ্য প্রেস্টিজের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার ভারতও পিছিয়ে আসতে পাওে না। কারণ, এতে তার মুখরক্ষা হবে না।

আগামী ২৬ জুলাই বেইজিংয়ে ভারত ও চীনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের মধ্যে বৈঠক এই অচলাবস্থার নিরসন ঘটিয়ে আলোচনার সূচনা করবে বলেও ড. হুম মনে করেন না।

ফলে একটি সামরিক সংঘাতের আশংকা ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে। তবে হু’র মতে আসন্ন শীত উত্তেজনা প্রশমনের একটি উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে। ওই অঞ্চলের প্রবল শীত উভয় পক্ষের সামরিকবাহিনীকে সাময়িকভাবে পিছিয়ে যেতে বাধ্য করতে পারে। কিন্তু শীতের অবসান হওয়া মাত্র দেশ দুটির মর্যাদাবোধ তাদেরকে ফের সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে।

শেয়ার করুন