খাদের কিনারায় ঠেলে দেওয়া

খাদের কিনারায় ঠেলে দেওয়া

পি চিদাম্বরম,
শেয়ার করুন

অতীতে এর আগেও আমি অনেকবার সাবধান করেছিলাম যে কাশ্মীরের ইস্যু বা সমস্যা (বা আর যাই বলা হোক না কেন) একটি রক্তক্ষয়ী ক্ষত যা আরও পতনের দিকে যাচ্ছে। অতীতে প্রতিটি সরকার বিভিন্নভাবেই এই ক্ষতকে স্বীকার করে নিয়ে তার জন্য যে সঠিক দেখাশোনা দরকার সে কথা মেনে নিয়েছে। জওয়াহরলাল নেহেরুর ও শেখ আবদুল্লাহর মধ্যে চুক্তি, তাসখন্দ চুক্তি,  শিমলা চুক্তি,  ইন্দিরা গান্ধী ও শেখ আবদুল্লাহর মধ্যে চুক্তি,  আগ্রা সম্মেলন এবং লাহোর ঘোষণার ইত্যাদি সবই ছিল সমস্যার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করার প্রকৃত প্রচেষ্টা। তবে এর মধ্যে কোনটির মাধ্যমেই স্থায়ী সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়নি। সবগুলোই শেষ পর্যন্ত কাউকে না কাউকে ক্ষুব্ধ করে রেখেছে। সুতরাং ক্ষত থেকে রক্তক্ষরণ আর বন্ধ করা যায়নি। এখানে জড়িত পক্ষগুলোর মধ্যে, সবচেয়ে কঠিন, অযৌক্তিক কিন্তু অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে যুব সমাজ যাদের মধ্যে জঙ্গিবাদের দিকে চলে যাওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশী। অনান্য পক্ষগুলো অনেকবারই যুক্তির পক্ষে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে।

প্রান্তিক অবস্থান

প্রত্যেক দল এবং প্রধানমন্ত্রীর অধীনে থাকা সব কেন্দ্রীয় সরকার সমধান নিয়ে এক বা একাধিক অংশীদারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে সবসময়ই। কিন্তু আমি এখন ভীত যে কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান ২০১৫-১৬ থেকে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন হয়েছে। দুঃখজনকভাবে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থানকে সমানভাবে কঠিন ও  অযৌক্তিক বলা যায়। তাদের কথাবার্তা সম্পর্কে কোন ভবিষ্যৎবাণী করা যাচ্ছে না আর শুধু সময়ই বলতে পারবে যে তারা কতটা একগুয়ে থাকে। কোন চুক্তি থেকে সর্বোচ্চ আদায় করে নেওয়ার অভিপ্রায় এতদিন জঙ্গি মনোভাবীদের মধ্যে ছিল যার কারণে সমাধান চেষ্টার কোনটাই বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এখন কেন্দ্রীয় সরকার সেই একই অবস্থানে আছে। কাশ্মির উপত্যকার সাধারণ মানুষ এখন এই দুই প্রান্তিক অবস্থানের (ম্যাক্সিমালিস্ট পজিশন) মধ্যে আটকা পড়ে গেছে আর এর ফলস্বরূপ যত দিন যাচ্ছে জম্মু ও কাশ্মীরের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ততই খারাপ হয়ে পড়েছে।

 কি বদলেছে?

এর আগে, তরুণরা শুধু রাস্তায় নেমে এসে পাথর ছুঁড়েছে; এখন তরুণীরাও রাস্তায় বেরিয়ে আসছে। এর আগে,  বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের আটকে রাখার চেষ্টা করত, এখন মায়েরা বলছেন, “আমি আমার সন্তানকে এই বিক্ষোভকারীদের সাথে যোগ দিতে বাধা দিতে পারি না কারণ সে বিশ্বাস করে যে সে তার ভবিষ্যত এবং স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে।”

এর আগে, কেন্দ্রীয় সরকার ও জম্মু-কাশ্মীর সরকার একই সুরে তাদের মতামত প্রকাশের চেষ্টা করত। তখন তারা একই জোটের মধ্যে না থাকলেও কথা বলার ধরনে অনেক বেশী মিল ছিল। এখন কেন্দ্রীয় সরকার ও জম্মু-কাশ্মীর সরকার সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নিয়েছে যদিও দুই দল (বিজেপি ও পিডিপি) এই রাজ্যে একটি জোটবদ্ধ সরকার চালানোর ভান করছে। এর আগে, কেন্দ্রীয় সরকার ও জম্মু-কাশ্মীর সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী স্থাপনে একই ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। এখন নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশ্নে দুই দলের অবস্থানে মনে হচ্ছে যে তারা একে অপরের দিকে তরবারি উদ্দ্যত করে আছে।

এর আগে, ইউনাইটেড কমান্ডের বৈঠকে জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সাধারণ আলোচনা হত এবং তার সিদ্ধান্ত মোটামুটি চূড়ান্ত বলা চলত। এখন যদিও মুখ্যমন্ত্রী ইউনাইটেড কমান্ডের মাঝে মাঝে সভা আহ্বান করেন তবে নর্দান আর্মি কমান্ডের প্রতিনিধিত্বে সেনাবাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গীই চূড়ান্ত হিসেবে ধরা হয়। এর আগে, যদি কোনও সংশ্লিষ্ট পক্ষের সাথে আলোচনা করা হতো, তা কেন্দ্রীয় সরকার ও জম্মু-কাশ্মীরের সরকার বেশীরভাগ সময়ই সমর্থন করতো। আজ, জম্মু ও কাশ্মীর সরকার কোন সংশ্লিষ্ট পক্ষের (পাকিস্তান ও হরিয়াতসহ) সাথে আলোচনা করতে গেলে কেন্দ্রীয় সরকার নিরবচ্ছিন্নভাবে তার বিরোধিতা করে।

এর আগে শুধু একবার ছাড়া সবসময়ই অমরনাথ যাত্রীরা নিরাপদে ভ্রমণ করেছে এবং গত ১৫ বছরে এরকমই ছিল অবস্থা। আজ, অমরনাথ যাত্রীদের নিরাপত্তার কোন নিশ্চয়তা নেই এবং গত সোমবার সন্ত্রাসী হামলাটি সরকার কর্তৃক যাত্রীদের নিরাপত্তা দিতে সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। রাজ্যের উপ-মুখ্যমন্ত্রী (বিজেপি নেতা) নিরাপত্তায় ছিদ্রের কথা স্বীকার করেছেন।

এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে ২০০১ সালে সন্ত্রাসীদের দ্বারা সহিংসতার ঘটনা সবচেয়ে বেশী হয়েছিল (৪৫০৭) যা এর পর থেকে কমে আসতে শুরু করে। ২০০৩ সালে তা দাঁড়ায় ২৫৪২ এ এবং ২০১২ ও ২০১৩ এটি নাটকীয়ভাবে ১১৭ ও ১৮১ পর্যন্ত নেমে এসেছিল। কিন্তু সেই ধারায় আবার পরিবর্তন আসছে। বর্তমান মুখোমুখি সংঘর্ষের পরিস্থিতির এক দিকে আছে জঙ্গিরা অন্যদিকে আছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার। আমি শঙ্কিত যে, উভয় পক্ষের প্রান্তিক অবস্থান একে অপরকে দেয়ালে পিঠ ঠেকানোর মরিয়া অবস্থায় ঠেলে দিবে যা উভয়ের অবস্থানকে আরও শক্ত করে তুলবে। এই দ্বন্দ্বের গ্যাঁড়াকলে পড়বে জম্মু ও কাশ্মীরের সাধারণ জনতা বিশেষ করে যারা উপত্যকায় রয়েছেন।

স্থায়ী সমাধান বা দীর্ঘস্থায়ী বিচ্যুতি

বর্তমান তীব্র সংকটের জন্য দায় তিন পক্ষের উপর বর্তাবে: ১) জঙ্গিবাদীরা এবং তাদের পৃষ্ঠপোষক , নিঃসন্দেহে তারা সন্ত্রাসী এবং কোনদিনও তারা হয়তো ভারত থেকে উপত্যকা ছিনিয়ে নিতে পারবে না; ২) বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার যারা সামরিক সমাধানে বিশ্বাস করে এবং ইতিহাস থেকে কোন উপলব্ধি নেয় না না কিংবা দ্বন্দ্ব-সংকটের জটিলতাগুলি নিয়ে কোন বুঝ নেই ৩) পিডিপি, যারা মুফতি মোহাম্মদ সাঈদের অধীনে থাকা তাদের সমস্ত নীতি ও নিষ্ঠা এখন নির্লজ্জভাবে আত্মসমর্পণ করেছে এবং বিজেপি-র আচল ধরে পড়ে আছে।

এর মধ্যে অদ্ভুত যে মানুষটি বেরিয়ে এসেছেন তিনি হল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং কৌতূহল জাগানীয়া বিবৃতি দিতে পেরেছেন ‘আমরা কাশ্মির সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে পেয়েছি’ , তিনি কি আমাদের বলবেন এটা কি এবং সরকার এর জন্য কি করেছে?

আমরা যাই বলি বা লিখি না কেন তা জঙ্গীদের কঠোর (এবং ভুল) অবস্থান পরিবর্তন করবে না; আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীর শক্তির দ্বারা তাদের পরাজিত হতে হবে। কিন্তু আমরা যা বলি বা লিখি তা যদি আমাদের সরকারের কঠোর (এবং ভুল) অবস্থার পরিবর্তন না করতে পারে তবে আমার মনে হয় আমরা স্থায়ী সমাধান নয় বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী বিচ্যুতির দিকে এগিয়ে চলছি।

print