ভারত কেন চীনের সড়ক নির্মাণে সংবেদনশীল?

ভারত কেন চীনের সড়ক নির্মাণে সংবেদনশীল?

ঝা জিয়াঝুয়ো,
শেয়ার করুন

চীনা ও ভারতীয় সৈন্যদের চোখাচুখি অবস্থা এ পর্যন্ত সময়ের ইতিহাসে হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের  দীর্ঘতম অবস্থানে পরিণত হয়েছে। সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যেই সীমান্ত বিপত্তিগুলির সমাধান করা হয়, তবে এটি এক মাসের বেশি সময়ের জন্য চলছে যা এখনো শেষ হবে এমন কোন লক্ষণ নেই।

সীমান্তের বিতর্কিত পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ লাইনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ বিরোধের ঘটনা অতীতে দেখা গেলেও ভারতীয় সৈন্যরা স্বীকৃত সিকিম সীমানা অতিক্রম করে চীনের ভূখণ্ডে প্রবেশ করার পরই এবারের অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে।

ভারতীয় সৈন্যরা চীনের একটি সড়ক নির্মাণে বাধা দিতে দোকলামে অনুপ্রবেশ করেছে। আসলে, গত বছরের তুলনায় তিব্বতের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে চীনের সড়ক ও রেলপথ নির্মাণের বিষয়ে ভারত এখন অনেক বেশি সমালোচনামুখর হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, কেন চীনের পরিকাঠামো নির্মাণ সম্পর্কে ভারত এতোটা সংবেদনশীল হলো। এই প্রশ্নটির উত্তর হচ্ছে উন্মুক্ত হবার ক্ষেত্রে ভারতের অনিচ্ছা আর সেইসাথে তার অহংকার এবং একচেটিয়া মনোভাবের অনুভূতি।

ভারত সরকার চীনের সড়ক নির্মাণকে “ভারতের জন্য গুরুতর নিরাপত্তার হুমকি সৃষ্টির মতো স্থিতাবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন” হিসেবে বর্ণনা করে বলেছে, এর ফলে ঘটনাস্থল থেকে ভারতের মূল অঞ্চল আর দূরবর্তী উত্তরপূর্ব এলাকার সংযোগ “চিকেনের নেক” এর দূরত্ব কমে আসবে । যাইহোক,  রাস্তাটি নির্মাণ করা হচ্ছে চীনা অঞ্চলে। সত্যিকার অর্থে এ নিয়ে  এমনকি ভারত যদি উদ্বিগ্নও হয় তবুও তার হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই।

স্পষ্টতই ভারতীয় সৈন্যদের অনুপ্রবেশ চীনের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে। অধিকন্তু ভারত এই বিষয়ে দ্বৈত মানদন্ড অনুসরণ করেছে। সম্প্রতি ভারত বেপরোয়াভাবে ভারত-চীন সীমান্ত সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। এর আওতায় দিল্লি সীমান্ত লাইনে ৭৩ টি কৌশলগত সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে বর্তমানে ২৭ টি সড়ক চালু রয়েছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার প্রশাসনের তিন বছরের পূর্তি উপলক্ষে গত মে মাসে লোহীৎ নদীর উপরে দেশের দীর্ঘতম সেতুটি উদ্বোধন করেছেন। এতে বিতর্কিত পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।

আর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর সামরিক স্থাপনার ক্ষেত্রে চীনের ওপর ভারতের একটি সুস্পষ্ট সুবিধা রয়েছে। তার তৃতীয়, চতুর্থ, এবং পূর্ব কমান্ডের ৩৩তম কোরের অধীনে ভারতীয় নয়টি পার্বত্য ডিভিশন রয়েছে যেগুলোর সবই উত্তর দিকের এলাকা ঘিরে মোতায়েন করা হয়। এই ডিভিশনগুলিকে সহায়তা করার জন্য, ভারতীয় সেনাবাহিনী অসংখ্য পরিবহন নোড, সেনা আবাসস্থল এবং ভূগর্ভস্থ স্টোরেজ সুবিধা তৈরি করেছে।

উপরন্তু, ভারতীয় সেনাবাহিনী তার পূর্ব কমান্ডের অধীনে ১৭ মাউন্টেন স্ট্রাইক কোর তৈরি করেছে যাতে এটি দ্রুত আক্রমণাত্বক বা কাউন্টার-অফেন্স পরিচালনা করতে পারে। ভারতীয় বিমান বাহিনীও পূর্ব সীমান্তের ২২ টি বিমান ফিল্ড নিয়ে একটি বিশেষ সুবিধায় রয়েছে। এসব বিমানক্ষেত্র প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার কাছাকাছি। সমতলভূমিতে তাদের ঘাঁটিগুলি ছাড়াও ভারতের যোদ্ধা এবং বোম্বাররা কোনও প্লেলোড পেনাল্টি ছাড়াই তাদের টার্গেটগুলিতে পৌঁছতে পারবে। এতে তাদের সামান্য জ্বালানির প্রয়োজন হবে।

উপরোক্ত উৎকৃষ্ট সামরিক স্থাপনাকে বিবেচনায় নেয়া হলে ভারতকে দুর্বল পক্ষ হিসেবে দেখা এবং চীনের সীমান্ত সড়ক নির্মাণকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা খুবই হাস্যকর। এর কর্মকান্ডকে কেবল আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অথবা কঠোর অবস্থান নিয়ে নিজেকে দুর্বল ভাবার মানসিক প্রবণতা আড়াল করার প্রকাশ হিসাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

রাস্তাঘাঁট সম্পদ বৃদ্ধি বা যুদ্ধের পথ দুটোই হতে পারে। চীন এটাকে বলছে “সম্পদ তৈরির আগে সড়ক নির্মাণ”। আর রাস্তা নির্মাণ দেশের দ্রুত বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এটি কেবল চীনেই নয়, চীন ও তার প্রতিবেশীদের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রও তৈরি করবে।

দুর্ভাগ্যবশত, ভারত সীমান্ত এলাকার অবকাঠামোকে কেবলমাত্র সামরিক ব্যবহারের জন্য বলে মনে করে। এটি যে অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার জন্য সেটি তারা বিবেচনা করে না।

বস্তুত, দোকলামের ঘটনা চীনকে তিব্বতের লেক মানসরভর যেতে ভারতীয়দের নাথু লা সীমান্ত পারাপারের অনুমতি বন্ধ করতে বাধ্য করেছে। এটি হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয়ের জন্য পবিত্র যা সিকিমের ৬৫ ভাগ রাষ্ট্রীয় জিডিপির উৎস পর্যটন শিল্পকে আঘাত করেছে।

১৯৬২ সালে ভারত-চীন সীমান্ত যুদ্ধের পর কয়েক দশক ধরে ভারত সীমান্ত এলাকার প্রতি ইচ্ছাকৃত অবহেলার কৌশল অবলম্বন করে বলেছিল যে, অবকাঠামোর অভাব থাকলে উত্তর থেকে যে কোনও আক্রমণ বাধাপ্রাপ্ত হবে। শুধু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দিল্লি এই কৌশলটির ভ্রান্তি স্বীকার করেছে এবং সীমান্তের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপকভাবে মনোযোগ দিয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে চীনের বেল্ট এবং রোড ইনিশিয়েটিভের প্রবর্তনের সাথে, ইউরেশিয়ায় অবকাঠামো সংযুক্তি বাড়ানো হয়েছে। এটি পারস্পরিক সুবিধা এবং সাধারণ উন্নয়নকে সামনে নিয়ে এসেছে আর এই অঞ্চলে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এর প্রতি স্বাগত জানিয়েছে।

এক্ষেত্রে ভারত হলো কয়েকটি ব্যতিক্রমের মধ্যে একটি যে এই উদ্যোগের অংশ হয়নি। দক্ষিণ এশীয় অন্যান্য দেশগুলির তুলনায় ব্যতিক্রমীভাবে ভারত এই উদ্যোগের বিরোধিতা করছে এ কারণে যে তারা এটিকে চীনের প্রতিরক্ষা প্রচেষ্টার অংশ বলে মনে করে।

নতুন রেলপথ নির্মাণ, রাস্তাঘাট ও বন্দর তৈরিসহ চীন ও দক্ষিণ এশীয় দেশগুলির সাথে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং সমস্ত ধরনের সেবাসহ নতুন অবকাঠামো উন্নয়নকে ভারত এই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখে। এ কারণে তারা এই আশঙ্কা করছে যে, দক্ষিণ এশিয়াকে চীনের শক্তিশালী অর্থনীতির কক্ষপথে নিয়ে আসা হবে এবং এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সুবিধাগুলো ব্যবহার করা হবে।

বস্তুত বেল্ট এবং রোড ইনিশিয়েটিভ চীন প্রস্তাব করলেও এর মধ্যে অন্যদের স্বার্থও রয়েছে। কারণ এতে শান্তি এবং সহযোগিতার মনোভাব, নিখুঁততা ও সমন্বয়তা, পারস্পরিক শিক্ষা এবং পারস্পরিক সুবিধার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এর পরও ভারত এটিকে একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করবে কিনা সেটি দেশটির রাজনীতিবিদদের জ্ঞান এবং বিজ্ঞতা প্রকাশের উপর নির্ভর করে।

চীন ও ভারতের অনেক মিল রয়েছে, কিন্তু তারা নিজেরা প্রতিযোগিতায়ও নিয়োজিত রয়েছে। বিশ্বায়নের এই যুগে চীনের সড়ক নির্মাণে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি একটি দর্পন যার মধ্য দিয়ে দূরদৃষ্টির অভাব, আবদ্ধ মন এবং অসহিষ্ণুতার প্রতিফলন ঘটছে। জিডিপি অনুসারে এশিয়ান এই দুই বড় দেশের মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্যকে এটি কেবল প্রতিফলিত করে না অধিকন্তু আস্থা, উন্মুক্ততা ও অন্তর্ভুক্তমূলকতার মধ্যেও  দু’দেশের মধ্যেও বিস্তৃত ব্যবধানের প্রকাশ ঘটায়।

চীন ২১ শতকের অভিমুখে যখন নিজের উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তখন ভারত ১৯ শতকের মধ্যে রয়ে গেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এই পশ্চাদপদ কৌশল দেশটির একটি ঐতিহাসিক ভুল।

লেখক পিপলস লিবারেশন আর্মি অফ মিলিটারী সায়েন্সেস একাডেমীর সিনিয়র ফেলো

print
শেয়ার করুন