গৃহযুদ্ধের পথে ছুটছে ভারত?

গৃহযুদ্ধের পথে ছুটছে ভারত?

ড. নুরুল হাসান,
শেয়ার করুন

গো-রক্ষার নামে স্বঘোষিত গো-রক্ষাকরা ভারতজুড়ে এক ভয়ংকর তাণ্ডাব শুরু করেছে। ‘গণপিটুনি’তে হতাহতের ঘটনা বৃদ্ধির পেলেও এ ব্যাপারে মোদি সরকারের নীরবতা যেমন গো-রক্ষকদের উৎসাহিত করছে তেমনি তাদের উন্মত্ততা মুসলমান ও নিম্ম-বর্ণের ভারতীয়দের মনে নিদারুন ভীতি সৃষ্টি করেছে।২০১৫ সালে ২৮ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ আখলাখ থেকে শুরু করে ২০১৭ সালের ২২ জুন হাফিজ জুনায়েদ খান পর্যন্ত অগনিত মুসলমানকে গো-রক্ষকরা নৃশংসভাবে হত্যা করেছে।

এসব ঘটনা ভারতের সর্বত্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনে ভীতি সঞ্চার করেছে। উন্মত্ত গো-রক্ষকদের বিরুদ্ধে মুসলমান ও সেক্যুলার হিন্দুরা প্রতিবাদ বিক্ষোভে মাঠে নেমেছে।দিল্লি’র যন্তরমন্ত্ররে ‘নট ইন মাই নেম’ ব্যানারে দাঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ সমবেশে ভানতি আনন্দ মেত্রি নামে এক হিন্দু সাধু মিডিয়াকে বলেন, দেশটি ভয়ংকর এক গৃহযুদ্ধের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তোমরা শুধু এর দর্শক। ‘গো-রক্ষকদের হাতে নিহতের সংখ্যা বাড়ছে’ শীর্ষক এক রিপোর্টে (২৯ জুন ২০১৭) ইন্ডিয়াস্পেন্ড-এর সাংবাদিক এলেন ব্যারি লিখেন, মোদি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে গো-মাংস খাওয়া বা গো- নির্যতনের ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দ্রুত বাড়ছে।

২০১০ সাল থেকে এমন ৬৩টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়, যার ৬১টি ঘটে মোদির শাসনামলে। এসব ঘটনায় নিহত ২৮ জনের ২৪ জনই মুসলমান। সাবেক অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরাম তার এক নিবন্ধে লিখেন, গো-রক্ষকরা হামলা চালাতে গিয়ে মোদিকে ভয় পায় না (৩০ জুন ২০১৭)। তিনি আরো বলেন, ‘মুখ দেখানো বিবৃতি দেয়ার বদলে মোদির উচিত হবে টেলিফোন তুলে নিয়ে তার সংঘের মুখ্যমন্ত্রীদের বলা যেন তারা গো-রক্ষকদের শক্ত হাতে দমন করে।’এসব করে হিন্দুদেরকে একটি রক্তপিপাসু হিসেবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে। এরা শুধু গো-মাংস খাওয়ার অযুহাতে নিরপরাধ লোকজনকে হত্যা করছে। অথচ পৃথিবীর সাতশ’ কোটি মানুষ গো-মাংস ভক্ষণ করে। ভারতের সংঘ পরিবার দেশটিকে হাস্যাস্পদে পরিণত করছে।মোট কথা বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে আইন বলতে কিছু নেই। সেখানে সংখ্যালঘু ও দলিতদের সহজেই দাঙ্গাবাজ জনতার নামে খুন করা যায়। গো-মাংস খাওয়া বা ধর্মান্তরিত হওয়ার অপরাধে গো-রক্ষকরা এসব হত্যাকাণ্ডের  নেতৃত্ব দেয়। ফলে নিপীড়িত মানুষগুলোর সামনে এখন অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে নিজেদের রক্ষা করা ছাড়া আর কোন পথ নেই। জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশের সংহতির স্বার্থে সাম্প্রদায়িক সংঘি সন্ত্রাসী নামক ক্যান্সার নির্মূল করা প্রয়োজন।ইকনমিক টাইমস’র কনসালটিং এডিটর ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার কলামিস্ট স্বামীনাতন আয়ার লিখেন: আমার আশংকা হলো এই উন্মত্ততা দ্রুত সামাল দিতে না পারলে হিন্দু সন্ত্রাসীরা মুসলিম সন্ত্রাসীদের সম্মুখিন হবে। তখন পুরো দেশে গৃহযুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠবে। রাষ্ট্র যদি মুসলমানদের সুরক্ষা দিতে না পারে তাহলে তারা নিজেদের সুরক্ষার জন্য নিজস্ব সশস্ত্র স্কোয়াড গড়ে তুলবে – এমন আশংকা প্রবল। তখন রাষ্ট্রকে অসহায় হয়ে হিন্দু-মুসলিম সন্ত্রাসীদের তা-ব দেখতে হবে। আজ যদি হিন্দু-মুসলিম সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটে তা বাগে আনা সহজ হবে না। হিন্দু সহিংসতাকে প্রশ্রয় দিয়ে কেউ মুসলিম সহিংসতার আস্কারা দিচ্ছে কিনা সে বিষয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে।গো-রক্ষকদের দাঙ্গার প্রতিবাদে গত ১৪ জুলাই মৌনাথ ভঞ্জন শহরে এক অবস্থান ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয়। ‘মৌ নাগরিক মঞ্চে’র ব্যানারে আয়োজিত এই ধর্মঘটে বিপুল সংখক মানুষ যোগ দেয়। হিন্দু, মুসলিমসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলো সেখানে। তারা কঠোর ভাষায় পিটিয়ে হত্যার ঘটনাগুলোর নিন্দা জানান। ভারতের অভ্যন্তরিণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিদেশি, এমন কি ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের খবরেও বলা হচ্ছে হচ্ছে যে দেশটি দ্রুত গৃহযুদ্ধের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি যদি গো-রক্ষকদের অপতৎপরতা নিয়ে তার নীরবতা ভেঙ্গে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা প্রতিরোধে উপযুক্ত ব্যবস্থা না নেন তাহলে ভারত শিগগিরই ধ্বংসের প্রান্তে উপনীত হবে।

print