মালাবার নৌমহড়া: সমুদ্রবক্ষে জাপান-ভারত বৃহত্তর সহযোগিতার বার্তা

মালাবার নৌমহড়া: সমুদ্রবক্ষে জাপান-ভারত বৃহত্তর সহযোগিতার বার্তা

শেয়ার করুন

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় নৌ মহড়ায় (ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পাশাপাশি) জাপানি যুদ্ধজাহাজ জেএস ইজুমো ও জেএস সাজানামির অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সমুদ্রবক্ষে দেশটির শক্তি প্রদর্শনের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। কোন বিদেশি নৌবাহিনীর সঙ্গে নৌ মহড়ায় অংশ গ্রহণ জেএস ইজুমুর জন্য এই প্রথম। ২০০৭ সাল থেকে অংশগ্রহণ আসা জাপান ২০১৫ সালে মালাবার নৌমহড়ার স্থায়ী সদস্যে পরিণত হয়। অবশ্য এই মহড়া শুরু হয়েছিল ১৯৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের একটি যৌথ উদ্যোগ হিসেবে।

বঙ্গোপসাগরে অনুষ্ঠিত মহড়ায় যোগ দিতে আসার পথে ২৪ হাজার টনের জাহাজ ‘ইজুমো’ প্রথমবারের মতো সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া সফর করে। মহড়া শেষে জাপানের দু’টি যুদ্ধজাহাজই শ্রীলংকা সফরে যায়। প্রশ্ন হলো মালবার মহড়াকে জাপান কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছে?

প্রথমত, জাপানের পানিসীমা বিশেষ করে সেনাকুকু দ্বীপপুঞ্জের আশপাশে চীনের তৎপরতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই মহড়া অনুষ্ঠিত হলো। সম্প্রতি মিয়াকো প্রণালীর ওপর দিয়ে চীনা বিমান বাহিনীর একটি বোমারু বিমান উড্ডয়নের পর বেইজিং এ ধরনে ফ্লাইট চালিয়ে যাবে বলে জাপানকে জানায়। এছাড়া, সম্প্রতিক সময়ে প্রায়ই উত্তর কোরিয়ার ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র জাপানের পানি সীমায় এসে পড়ছে।

দ্বিতীয়ত, এই মহড়া সমুদ্রক্ষেত্রে জাপান ও ভারতীয় নৌ বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রমাণ। ২০০৭ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সিনজো আবে ভারত সফরকালে সেখানকার পার্লামেন্টে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তাতে তিনি প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরকে স্বাধীনতা ও অগ্রগতির পথ হিসেবে উল্লেখ করেন। তখন থেকে এই অঞ্চলের পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে।

তৃতীয়ত, জাপানের সেলফ ডিফেন্স ফোর্স ইতোমধ্যে আফ্রিকার জিবুতিতে ঘাঁটি স্থাপন করেছে। এই ঘাঁটিকে লজিস্টিক সহায়তা প্রদানের জন্য ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, জাপানের তৈরি সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ বিমান ইউএস-২ ভারতকে সরবরাহের ব্যাপারে দু’দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। এর মধ্য দিয়ে জাপান-ভারত সম্পর্কের সম্পূর্ণ নতুন একটি দিকের সূচনা ঘটবে।

চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কটিও নয়াদিল্লির সঙ্গে টোকিও’র সম্পর্ক জোরদার হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র অনেক আগ থেকেই ঘনিষ্ঠ মিত্র। এছাড়া ভারত ক্রমেই অধিক হারে যুক্তরাষ্ট্রের সমরাস্ত্র কিনছে। তিনটি দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে ইন্টার-অপারেবিলিটি ক্রমেই বাড়ছে। যেমন, ভারত এখন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পি-৮১ মেরিটাইম পেট্রোল এয়ারক্রাফট ব্যবহার করছে।

পঞ্চমত, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বজায় রাখতে জাপানের জন্য প্রশান্ত-ভারতীয় মহাসাগরের রুট অবাধ ও উন্মুক্ত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী আবে’র ‘অবাধ ও মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগর কৌশলে’র সঙ্গে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখতে ভারতের কৌশলের সঙ্গে মিলে যায়।

প্রথমবারের মতো চীনা সৈন্যদের একটি দল সম্প্রতি জিবুতিতে চীনের বৈদেশিক ঘাঁটিতে মোতায়েন করা হয়েছে। এখানে ১০ হাজারের মতো সেনা থাকতে পারবে। তাছাড়া চীন তার কথিত ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশলের আওতায় ভারতের নিকট প্রতিবেশী পাকিন্তান, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশে বন্দর স্থাপন করছে। যা ভারতে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

গত বছর নভেম্বরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি’র সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আবে’র দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তারা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নৌ ও বিমান চলাচলের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান বজায় রাখার অঙ্গীকার করেন।

অন্যান্য ক্ষেত্রেও জাপান ও ভারতের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ছে। সম্প্রতি দু’দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সহযোগিতা চুক্তি’ কার্যকর হয়েছে। পারমাণবিক হামলার শিকার হওয়া একমাত্র দেশ জাপানের জন্য এটা একটি বড় ধরনের অগ্রগতি। অথচ দিল্লি এখন পর্যন্ত পারমাণিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) ও ব্যাপকভিত্তিক পরমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধ চুক্তি (সিটিবিটি) সই করেনি। তাই টোকিও’র সঙ্গে এ চুক্তি সই করার জন্য ভারতকে অনেক কাঠখড় পোঁড়াতে হয়েছে।

আগামী সেপ্টেম্বরের যেকোন সময় ভারতে জাপানি প্রধানমন্ত্রীর সফরের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে মালাবার নৌমহড়া। প্রধানমন্ত্রী আবে’র এই প্রস্তাবিত সফরকালে দু’দেশের মধ্যে একটি সমুদ্র নিরাপত্তা চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ২০১৭ সালের মালাবার নৌমহড়াকে সমুদ্রক্ষেত্রে জাপান-ভারত বৃহত্তর সহযোগিতার আগমনি বার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে।