প্রতিযোগিতামূলক হতে চাইলে চীন, পাকিস্তান, ভারতকে অস্ত্র শিল্পের আধুনিকায়ন করতে হবে

প্রতিযোগিতামূলক হতে চাইলে চীন, পাকিস্তান, ভারতকে অস্ত্র শিল্পের আধুনিকায়ন করতে হবে

পি কে বালাচন্দ্রন,
শেয়ার করুন
ইন্টারন্যাশনাল আর্মি গেমস ২০১৭’র এভিয়েডারর্ট ইভেন্টে অগ্রহণকারী চীনের জে-১০বি জঙ্গিবিমান

সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখা এবং নিজ নিজ অঞ্চল ও তার বাইরে ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য নিজস্ব অস্ত্র শিল্প গড়ে তুলেছে ভারত, চীন ও পাকিস্তান। এই তিনটি দেশই একসময় প্রয়োজন পূরণের জন্য বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিলো। ওই নির্ভরশীলতা কাটিয়ে এখন তারা অনেকক্ষেত্রে দেশীয় উৎস থেকে প্রয়োজন মেটাচ্ছে, এমন কি অন্যদেশে রফতানিও করছে। তবে, অস্ত্র উৎপাদন ও রফতানির ক্ষেত্রে চীন যে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। ২০২০ সালের মধ্যে দেশটি পশ্চিমাদের সমপর্যায়ে পৌঁছাতে চাচ্ছে।

তবে এই তিনটি দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পই তাদের অতিমাত্রায় রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে খুব সহজে বিকশিত হতে পারছে না। বৈশি^ক বাজারে টিকে থাকার জন্য এই খাতকে দক্ষ ও উদ্ভাবনীমূলক, মূল্য-সাশ্রয়ী ও প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে। আর এ জন্য সংস্কার অতি জরুরি।

চীনের পর ভারতের ১৩ লাখ জনবলের নিয়মিত সেনাবাহিনী বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম। এর বাইরে দেশটির ১২ লাখ রিজার্ভ সেনা এবং ১৪ লাখ সদস্যের আধা সামরিক বাহিনী রয়েছে। তার হাতে ৯০ থেকে ১১০টি পারমাণবিক বোমা রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেট ৫১.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা তার জিডিপি’র ২.৩%-এর সমান।

পাকিস্তানে নিয়মিত সেনাবাহিনীর সদস্য ৫ লাখ। এর বাইরে রিজার্ভ সদস্য রয়েছে ৩ লাখ। দেশটির হাতে ১০০ থেকে ১২০টি পারমাণবিক বোমা আছে বলে বিশ্বাস করা হয়। এর প্রতিরক্ষা বাজেট ৯.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, জিডিপি’র হিসাবে ৩.৪% (ভারতের চেয়ে বেশি)।

নৌ ও বিমানবাহিনীসহ চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)’র নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনীতে নারী-পুরুষ মিলিয়ে সদস্য সংখ্যা ২৩ লাখ। অচিরেই এই সংখ্যা ১০ লাখে নামিয়ে আনা হবে বলে সম্প্রতি দেশটির পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে, আকার ছোট হলেও ওই বাহিনীর যুদ্ধ করার ক্ষমতায় কোন ঘাটতি থাকবে না। চীনের আধা সামরিক বাহিনীতে ৫ লাখ সদস্য রয়েছে। তার হাতে ২৬০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড আছে বলে ধারণা করা হয়। এর প্রতিরক্ষা বাজেট ২১৪.৮ বিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপি’র মাত্র ১.৯%।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর আকার আয়তনে বেশ ভালো মনে হলেও এর অনেকগুলো সমস্যার একটি হলো দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্প মান্ধাতা আমলের। আর সে কারণেই স্বাধীনতার ৭০ বছর পরও দেশটিকে তার সমরাস্ত্রের ৭০% চাহিদা আমদানি থেকে মেটাতে হয়। হাতে থাকা অস্ত্র-গোলাবারুদ দিয়ে ভারতীয় সেনবাহিনী মাত্র ১০ দিন যুদ্ধ করার ক্ষমতা রাখে। ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে দেশটি যে পরিমাণ অস্ত্র আমদানি করেছে তা তাকে বিশে^র দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারকে পরিণত করেছে। ভারতের চেয়ে এগিয়ে শুধু সৌদি আরব।

চিরশত্রু পাকিস্তান এবং ক্রমেই একরোখা মনোভাবের হয়ে ওঠা চীনের কারণে ভারতকে আরো বেশি করে অস্ত্র আমদানি করতে হচ্ছে। প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট ভাষ্যকার অজয় শুক্লার মতে, ভারতের অস্ত্রশস্ত্র সেই ১৯৭০’র দশকের। জেইন’স ম্যাগাজিনের মতে, ভারতীয় বিমান বাহিনীর ৪০% জুড়ে আছে ৪৫টি মিগ ২৯কে জঙ্গিবিমান। কিন্তু এগুলোর আসলে কোন কার্যকারিতা নেই। ভারতের একসময় ১৩টি সাবমেরিন ছিলো। এখন এর সংখ্যা পাকিস্তানের চেয়েও কম। সেই ১৯৮২ সাল থেকে ভারত একটি যুতসই ফিল্ড রাইফেল তৈরি বা কেনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখনো সফল হতে পারেনি। ১৯৮০’র দশকে বফোর্সের কাছ থেকে মাঝারি পাল্লার কামান কেনার পর ওই ধরনের আর কোন কামান তৈরি বা কিনতে পারেনি দেশটি।

এরপরও ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্প অদক্ষ ও অ-প্রতিযোগিতামূলক।

সম্প্রতি এক জনসভায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর উপপ্রধান লে. জেনারেল শরৎ চাঁদ বলেন যে ভারতের চেয়ে ভালো প্রতিরক্ষা শিল্প পাকিস্তানের। ভারতীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রায় পুরোটাই সরকারি। এই শিল্পের দুর্বলতার কারণ হলো এর কোন প্রতিযোগী নেই এবং উদ্ভাবন, ভালো ও দ্রুততর করার জন্য প্রেরণাও নেই।
১ আগস্ট স্টেটসম্যান পত্রিকায় এক নিবন্ধে মেজর জেনারেল হর্শ কাকার উল্লেখ করেন যে, ভারতে অন্য যেকোন শিল্পের চেয়ে অস্ত্র কারখানাগুলোতে ওভারহেড খরচ অনেক বেশি। ফলে ব্যয় ও মূল্য অনেক বেশি। উদ্ভাবন ও মানসম্পর্কে সচেতনতার অভাবে অস্ত্রগুলো মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারছে না। টিএনটি (ট্রাই নাইট্রো টলুইন) চুইয়ে পড়ায় পালগাঁও-এর একটি অস্ত্র গুদামে এন্টি-ট্যাংক মাইনের বিস্ফোরণে ২০ সেনা অফিসার নিহত হয়। প্রস্ততকারক কোম্পানির কাছে অভিযোগ পাঠানো হলেও তার কোন জবাব পাওয়া যায়নি।
অস্ত্র নির্মাণে বিলম্ব হচ্ছে কারণ খুচরা যন্ত্রাংশ একবারে বা সময়মতো পাওয়া যায় না। চেন্নাইয়ের কাছে আভাদিতে যে ট্যাংক কারখানা রয়েছে সেখান থেকেও চালান আসছে না খুচরা যন্ত্রাংশের অভাবে। ট্রাক নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রচুর অপচয় হচ্ছে। এর কারখানা জবলপুরে। কিন্তু এর জন্য যন্ত্রাংশ তৈরি হয় বেঙ্গালুরুতে অশোক লেল্যান্ডের কারখানায়। হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে যন্ত্রাংশ জবলপুর নিয়ে যাওয়া হয় সংযোজনের জন্য। অথচ বেঙ্গালুরুতেই অশোক লেল্যান্ডের কারখানায় কাজটি করা যেতো।

ইন্ডিয়ান ডিফেন্স রিভিও পত্রিকায় ব্রিগেডিয়ার অরুন বাজপাই এক নিবন্ধে বলেন যে ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে ৪১টি অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি, ৪২টি ল্যাবরেটরি এবং ৮টি সরকারি খাতে নেয়া প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর সবগুলোই অদক্ষ। কারণ এগুলো সেই স্বাধীনতা-পূর্ব নীতি অনুসরণ করে চলছে।

পশ্চিমা সূত্রগুলোর মতে ভারতীয়দের কারিগরি দক্ষতা নিম্নমানের। আমদানি করা ব্যবস্থার সঙ্গে দেশীয় ব্যবস্থার সমন্বয় সন্তোষজনক নয়। এর ফলে যৌথ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ বিলম্বিত হচ্ছে।

আধুনিককালের উপযোগি করে ভারতের অস্ত্র শিল্পকে ঢেলে সাজানোর জন্য ২০০৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত দুটি কমিটি সুপারিশ করেছে। কিন্তু প্রতিটি সরকারই তা উপেক্ষা করেছে। বাজপাই বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথমবারের মতো তিন বাহিনীকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলমুক্ত করেছেন সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর উপ-প্রধানদের আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দিয়ে। গত কয়েক বছর ধরে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি’র ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্প শুরু হওয়ার পর অত্যন্ত সুরক্ষিত প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাতে বেসরকারি খাতের কোম্পানিগুলো আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমে এক পর্যালোচনায় বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি বিনয় খুশাল বলেন, যে প্রতি বছর নীতি পবির্তন হওয়ায় বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে অংশগ্রহণ কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া ব্যাংকের সুদের হার অত্যন্ত চড়া, ৯.৬৫% পর্যন্ত। অন্যদিকে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরেও অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বহুসংখ্যক এজেন্সির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র যোগাড় করতে মাসের পর মাস লেগে যায়।

তবে সামরিক হার্ডওয়্যার রফতানিতে মাঝারি গোছের অগ্রগতি করতে পেরেছে ভারত। প্রতিরক্ষা রফতানিতে জোর দেয়ার ফল হিসেবে ২০১৬ সালে দেশটির রফতানি দাঁড়ায় ৩৩০ মিলিয়ন ডলার। আগামী দু’বছরের মধ্যে রফতানি ২ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

মালয়েশিয়ার বিমান বাহিনীর এসইউ-৩০ এমকেএম জঙ্গিবিমানের কিছু সুনির্দিষ্ট যন্ত্রাংশ রফতানি করেছে ভারত। এছাড়া দেশটি আফগানিস্তান, নেপাল ও নামিবিয়ায় রফতানি করা অস্ত্রের মধ্যে হালকা হেলিকপ্টারও রয়েছে।

মিয়ানমারের জন্য এইচএমএস-এক্স২ সোনার তৈরি করছে ভারত। তাছাড়া তুরস্কের মতো ন্যাটো সদস্য দেশের জন্য সুরক্ষামূলক আর্মার তৈরি করছে। বিশ্বের  বহু নির্মাতার জন্য বিভিন্ন ধরনের খুচরা যন্ত্রাংশ, মেকানিক্যাল কম্পোনেন্ট ও ইলেক্ট্রনিক যন্ত্র তৈরি করা হচ্ছে। ২০১৪ সালে মৌরিতাসের জন্য ৫০.৮ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ১,৩০০ টনের সামুদ্রিক টহল জাহাজ ‘বারাকুডা’ তৈরি করা হয়। শ্রীলংকাকে অত্যাধুনিক সামুদ্রিক টহল জাহাজ সরবরাহ করেছে গোয়া শিপইয়ার্ড লিমিটেড। তাছাড়া মৌরিতাজের জন্য এই শিপইয়ার্ডে ১১টি ফাস্ট এ্যাটাক ক্রাফট ও দুটি ফাস্ট পেট্রোল ভেসেল তৈরি করে।

যদিও ভারতীয় অস্ত্র কেনার জন্য ধন্যবাদ দিতে হয় ক্রেতাদের, কিন্তু সবাই ব্রহ্ম ক্ষেপণাস্ত্র পেতে আগ্রহী এর সক্ষমতার জন্য। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, আরব আমিরাত, চিলি, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, দক্ষিণ আফ্রিকা, আলজেরিয়া, গ্রিস, থাইল্যান্ড, মিশর, সিঙ্গাপুর, ভেনেজুয়েলা, ব্রাজিল এবং এমনকি বুলগেরিয়া পর্যন্ত এই ক্ষেপণাস্ত্র কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

পাকিস্তানের ক্ষেত্রে, এর প্রতিরক্ষা শিল্প স্থানীয় ব্যবহারের জন্য প্রতিবছর ১.৫ বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র উৎপাদন করে। জেইন’স ডিফেন্স উইকলির এক রিপোর্টে পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা এ পর্যন্ত ১.৫ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র আমদানি বাদ দিতে পেরেছি। এটা আমাদের জন্য একটি বড় বোনাস।

পাকিস্তান তার খালিদ ব্যাটেল ট্যাংক ও জে-১৭ জঙ্গিবিমান রফতানি করে। কিন্তু এগুলোর গোলাবারুদের মান নিয়ে ওমানসহ কয়েকটি দেশে প্রশ্ন উঠেছে। মানসম্পন্ন পণ্য তৈরি করতে হলে পাকিস্তানকেও ভারতের মতো বেসরকারি খাতকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

২০১৬ সালে চীনের প্রতিরক্ষা শিল্প ৩৬২ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র উৎপাদন করে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির মতো কিছু ক্ষেত্রে চীন অত্যন্ত উঁচু মানে পৌঁছাতে পেরেছে। কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে গবেষণার ক্ষেত্রে দেশটি বেশ পিছিয়ে। ফলে তাকে রাশিয়ার প্রযুক্তির ওপর অব্যাহতভাবে নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে। এখনো দেশটির তৈরি সামমেরিন খুব বেশি শব্দ উৎপন্ন করে।

যেকোন দেশের সরকারি খাতের মতো চীনের রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিরক্ষা শিল্পও একই রকম বহু সমস্যার সম্মুখিন। অত্যন্ত কেন্দ্রিভুত ও নিরাপত্তা সচেতনতা, অদক্ষতা, কিছু কিছু ক্ষেত্রে উদ্ভাবনের অভাব প্রকট।

বর্তমানে সেখানে বেসরকারি খাতকে অন্তর্ভুক্ত করার একটি চেষ্টা শুরু হয়েছে। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত চীনের প্রতিরক্ষা শিল্প ৬২ বিলিয়ন ডলারের বন্ড ও ইক্যুইটি বিক্রি করেছে।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং একটি বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তির দিক দিয়ে অগ্রসর এবং সুসংগঠিত পিএলএ দেখতে চান। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, সামরিক বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার শুধু কমিউনিস্ট পার্টির। এর মানে হলো আগামীতেও সেখানকার প্রতিরক্ষা শিল্পের কাঠামো অতিমাত্রায় কেন্দ্রিভুত থাকবে।

print
শেয়ার করুন