সামনে এগুনোর বিরাট পদক্ষেপ গ্রহণে প্রস্তুতি মিয়ানমারের

সামনে এগুনোর বিরাট পদক্ষেপ গ্রহণে প্রস্তুতি মিয়ানমারের

ল্যারি জ্যাগান,
শেয়ার করুন

মিয়ানমার সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন চাঙ্গা করা এবং সরকারের কর্ম-সম্পাদন দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নাটকীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তনের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারণ চূড়ান্ত করার পর্যায়ে রয়েছে এবং আমলাতন্ত্রে রদ-বদল ইতোমধ্যেই বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতের মতো এলাকায় সরকারি নেতৃত্ব জোরদার করার লক্ষ্যেই মন্ত্রী পর্যায়ে পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

সরকারের অভ্যন্তরীণ সূত্রের মতে, নির্বাহী পদে পরিবর্তন এবং ভবিষ্যতের জন্য কৌশলগত পরিবর্তন সাধনের জন্য আগস্ট মাসটি খুবই তাৎপর্যপূূর্ণ হতে যাচ্ছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে অর্থনীতিতে সরকারের নেতৃত্ব জোরদার (স্থানীয় ব্যবসায়ী সম্প্রদায়গুলো এ নিয়ে খুবই সোচ্চার) করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক পদ্ধতি উদার করবে। এর প্রধান লক্ষ্য ব্যবসা চাঙ্গা করা, দেশে ও বিদেশী উভয় ধরনের বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।

শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর মতে, এখন পর্যন্ত সরকারের অন্যতম ব্যর্থতা হলো অর্থনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণে দুর্বলতা এবং সরকারের নীতিমালা ও পরিকল্পনা জাতির কাছে বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের প্রচার করতে অক্ষমতা। মিয়ানমার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর উইনস্টন সেট আঙকে নব-সৃষ্ট পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পদে নিযুক্তির লক্ষ্য এসব পার্থক্য সংশোধন করা এবং সরকারের অর্থনৈতিক নীতি ও বাস্তবায়নের মধ্যকার ব্যবধান দূর করা।

আগামী দিনগুলোতে এগুলো হবে সেট আঙের প্রধান কাজ। পরিচয় গোপন করার শর্তে এই লেখককে এক সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, সরকারের মূল্যায়ন, অর্থনৈতিক নীতিমালার মধ্যে সমন্বয় সাধন, পরামর্শ করা এবং যোগাযোগ করা হবে তার দায়িত্ব। বোঝা যাচ্ছে, নিজের প্রভাব বাড়ানোর জন্য বিশেষ করে আমলাতন্ত্রে তার অবস্থান জোরদার করতে তার এক পা থাকবে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে, অন্যটি মন্ত্রণালয়ে।

তিনি মন্ত্রণালয়টির অস্ট্রেলিয়ান উপদেষ্টা অধ্যাপক সিন টার্নেলের অত্যন্ত আস্থাভাজন লোক। উদার ও স্বচ্ছ অর্থনৈতিক নীতির আগ্রহী ব্যক্তিত্বও তিনি। শীর্ষ পর্যায়ের সাথে ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, এ দু’জন হবেন অপ্রতিরোধ্য এবং নীতি প্রণয়ন করে সেগুলো তারা বাস্তবায়নও করবেন। থিন সিন সরকারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন সেট আঙ। বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনি বিশেষ অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিশেষ করে জাপান সরকারের সাথে যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ইয়াঙ্গুনের উপকন্ঠের থিলিওয়া সেজের কথা বলা যায়। থাইল্যান্ড ও চীনের সাথেও দুটি বিশেষ অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠার কারিগর ছিলেন তিনি।

বিশেষ করে মিয়ানমারের পশ্চিমে কিয়ুক ফিয়ুতে চীনের সাথে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা বিশেষ ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে। এ নিয়ে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।

সেট আঙ ন্যাশনাল ইকোনমিক কো-অর্ডিনেশন কমিটিতেও নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন। এর মানে হলো, তিনি সমন্বয়ের দায়িত্বও পালন করবেন। সরকার এই ব্যাপারে এমন ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়েছে যে, সরকারের প্রতিটি শীর্ষ পর্যায়ে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। এখন এই প্রতিমন্ত্রীর নিয়োগের ফলে সরকারের অর্থনীতি-সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ একই সুরে গান গাইতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ী সম্প্রদায় তার নিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছে। অবশ্য তিনি কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ পাবেন কিনা তা নিয়ে অনেকে সংশয়ে রয়েছে। তবে দি লেডি (আঙ সান সু চি, তিনি মিয়ানমারে এই নামেই পরিচিত, তিনিই তাকে এই পদে নিয়োগ দিয়েছেন) তাকে সমর্থন করবেন। আর সরকার তার ওপর যে আস্থা স্থাপন করেছে, তার প্রতিদান দিতে তাকে শিগগিরই কাজ দিয়ে তার নিয়োগকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে হবে। তার কাছে প্রত্যাশা অনেক। বিশেষ করে বিদেশী ব্যবসায়ী ও দাতা, আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার কাছে মিয়ানমারকে খুলে দিতে হবে তাকে। অতীতে তাদের সাথে তার কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

অবশ্য তিনি ত্রুুটিমুক্ত তা-ও নন। আমলাতন্ত্রের মধ্য থেকেও তিনি প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়বেন। অনেকে তাকে ভুঁইফোড় ও অতিমাত্রায় পাশ্চাত্যপন্থী বিবেচনা করে। ফলে উচ্চ মাত্রার প্রত্যাশা ছাড়াও তাকে আমলাদের সাথে সতর্কভাবে মোকাবিলা করতে হবে। বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি আমলাতন্ত্র সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছেন। এটাই তাকে অন্য মন্ত্রীদের চেয়ে এগিয়ে রাখবে।

মন্ত্রিসভায় এটা একটা বড় পরিবর্তন। তবে এটাই একমাত্র পরিবর্তন নয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী পে জিন তু আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন। তিনি স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়েছেন। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন নির্মাণমন্ত্রী উইন খাইঙ। তিনি এখন উভয় মন্ত্রণালয়ই তদারকি করবেন। তবে বিদ্যুতের জন্য একজন প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত করা হবে।

বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে এই পরিবর্তন বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। আঙ সান সু চি যে কাজ চান, সেটাই তিনি এর মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছেন।

নতুন মন্ত্রীর সামনে অনেক কাজ। চীনা সমর্থনপুষ্ট বিতর্কিত মাইস্টন ড্যামের ভবিষ্যত নির্ধারণ ছাড়া আরো তিনটি চীনা প্রকল্প নিয়ে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চীনারা ইতোমধ্যে মিয়ানমারের জাতীয় গ্রিডের সাথে ইউনানের বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ককে সংযোগ সাধনের একটি প্রস্তাব দিয়েছে। রুরাল ইউনান নেটওয়ার্ক থেকে ইতোমধ্যে চীনের অধিকতর উন্নত পূর্ব এলাকা এবং ভিয়েতনাম ও লাওসেও উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়ে থাকে।

তবে কেবল জলবিদ্যুৎ উৎপাদন নয়। মিয়ানমার কয়লাচালিত বিদ্যুৎও উৎপাদন করতে চায়। এছাড়া সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড থেকে এলএনজিও আমদানির বিকল্প চিন্তা রয়েছে তাদের। এসব ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বাড়াতে না পারলে আগামী বছর মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মন্ত্রিসভায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলেও অনেকে মনে করছেন, এটা এখানেই থামবে না। অবশ্য এই ধারণাও রয়েছে, তিনি বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আনতে অনীহ। তিনি বেশির ভাগ মন্ত্রীকেই অথর্ব মনে করলেও তাদের আনুগত্যের বিষয়টি আমলে নিচ্ছেন। তাছাড়া তিনি স্থিতিশীলতা রক্ষা করতেও চান।

অন্য যেসব মন্ত্রী পদে পরিবর্তন আসতে পারে সেগুলো হচ্ছে বাণিজ্য, শিল্প, পর্যটন ও জাতিগতবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। তবে কারা তাদের স্থলাভিষিক্ত হবেন তা নিয়ে সিনিয়র সরকারি ও পার্টি কর্মকর্তারা জ্ঞাত নন। অনেকে মনে করছেন, প্রতিমন্ত্রীদের পদোন্নতি দেওয়া হবে। তবে কী করা হবে সবই নিজের মধ্যে রেখে দিয়েছেন সু চি।

সন্দেহ নেই, মন্ত্রিসভার এসব পরিবর্তনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো অর্থনীতিকে সচল করা।

সু চির প্রশাসনের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ঘোষণা (তিন পাতার একটি দলিল) করার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে গত সপ্তাহে স্টেট কাউন্সিলরের অফিস থেকে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। এতে সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য না থাকায় ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। পরিকল্পনা ও অর্থমন্ত্রী কিয়াও উইন এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘সরকারের দীর্ঘ মেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় সময় লাগবে। তবে এটা সবার জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।’

print
শেয়ার করুন