আমিই কি রাষ্ট্র?

আমিই কি রাষ্ট্র?

ইকরাম সেহগাল,
শেয়ার করুন

প্রায় ৪০ বছর আগে ১৯৭৭ সালে জিয়াউল হকের এক সামরিক অভ্যুত্থানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত জুলফিকার আলী ভুট্টোর সরকার উৎখাত হয়েছিল। শুরুতে জিয়া ৯০ দিনের মধ্যে ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন’ আয়োজনের ব্যাপারে আন্তরিক ছিলেন। কিন্তু নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কুক্ষিগত করার বাসনা, অনুকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রতিহিংসাপরায়ণ ভুট্টোকে নিয়ে উদ্বেগের ফলে শুরুতে থাকা আন্তরিকতা, যদি থেকেও থাকত, দ্রুত বিলীন হয়ে যায়।

৫ জুলাই সামরিক ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে মাথা ঠাণ্ডা রাখার বদলে ভুট্টো লড়াই করার পথ বেছে নেন। সামরিক অধিপতিরা তার রাজনৈতিক শক্তির সাথে পাল্লা দিতে যেকোনো উপায়ে লড়াই জয়ের জন্য মাঠে নামে। ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে ভুট্টোর ফাঁসি শূন্যতার সৃষ্টি করে, নতুন করে দুর্নীতিবাজ সুযোগসন্ধানীরা রাজনীতিতে প্রবেশ করে। পাকিস্তানের বর্তমান বৃহত্তর রাজনৈতিক দৃশ্যপটে থাকা অনেক নেতাই ১৯৮৫ সালের নির্দলীয় নির্বাচনের ফসল। সামরিক স্বৈরাচারের অনুগত ও আশ্রিত শরিফকে তিনবার প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে জোর করে সরিয়ে দেয়া হলো। প্রথম বার ১৯৯৩ সালে প্রেসিডেন্ট ইসহাকের এস্টাবলিশমেন্ট, তারপর ১৯৯৯ সালে মোশররফকে সরিয়ে দিতে শরিফ যে বেসামরিক ক্যুর আয়োজন করেছিলেন, সেনাবাহিনী সেটা প্রতিরোধ করতে গিয়ে এবং এবার ২০১৭ সালে বিচার বিভাগের মাধ্যমে। শরিফের সেনাবাহিনীর ওপর দোষ চাপানোটা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারে পরিণত হয়ে গেছে। তিনি অবলীলায় ভুলে গেছেন, ১৯৯৩ সালে তিনি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পেয়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশ নিতে পেরেছিলেন কেবল সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াহিদ কাকার যখন প্রেসিডেন্ট ইসহাককে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

নওয়াজ শরিফ এই বিভ্রমে বাস করছেন, উচ্চতর আদালতের সাথে মোকাবিলায় অবতীর্ণ হলে তারা ভীত হয়ে বিষয়টি ন্যাবের কাছে পাঠানো বন্ধ করে দেবে। কিন্তু জেআইটি তার এবং তার পরিবারের ব্যাপারে অপরাধের যেসব প্রমাণ জড়ো করেছে, সেটা কি ন্যাব অগ্রাহ্য করতে পারে? ১৯৭৭ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টো কিন্তু ইমরান খানের মতো কোনো বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি বা সংবিধানের ১৯০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগের বিচার বিভাগীয় কোনো বিকল্পের সামনে পড়েননি। ২০১৭ সালের নভেম্বর/ডিসেম্বর মাসে আগাম নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করে পিএমএল (এন) বিচার বিভাগের চেয়ে বরং সেনাবাহিনীর হাতে রাজনৈতিক ‘শাহাদাতকে’ গ্রহণ করার পরিকল্পনা করেছিল। সৌভাগ্যবশত কামার বাজওয়া মারাত্মক উস্কানির মুখেও তার মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পেরেছিলেন। ষড়যন্ত্রের জন্য নওয়াজ শরিফ এখন সুপ্রিম কোর্টকে অভিযুক্ত করছেন, সুপ্রতিষ্ঠিত প্রমাণের মুখেও স্পষ্টভাবে দাবি করছেন, তিনি এখনো জানেন না কেন তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হলো।

ক্ষমতাসীন পার্টি নিজেকে অন্যায়ের শিকার হয়েছে বলে মনে করছে, কারণ তারা এবং বিরোধীরা উভয়েই পাকিস্তান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬২ ও ৬৩-এর গুরুত্ব উপেক্ষা করেছে। শরিফের উত্তরসুরী শহিদ খাকান আব্বাসি ইঙ্গিত দিয়েছেন, অনুচ্ছেদ ৬২ সংবিধান থেকে বাদ দেয়া হবে কিংবা সংশোধন করা হবে।

সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার কারণে মিয়া নওয়াজ শরিফ বা পাকিস্তানের রাজনৈতিক শ্রেণীর কেউই সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারছে না, আধুনিক রাষ্ট্র ব্যক্তি, পরিবার বা গোত্রের ওপর নির্ভর করে না, বরং যে-ই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, প্রতিষ্ঠান ও আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। প্রতিষ্ঠান ও আইনের মতোই রাষ্ট্র শক্তিশালী। দেশের যেসব শাসক এই দুটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তারা রাষ্ট্রকেই আসলে ক্ষতির মুখে ফেলে।

নির্বাচিত নির্বাহীর মতোই বিচার বিভাগ, সামরিক বাহিনী এবং সর্বোপরি সংবিধান হলো পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রধান অংশ। প্রশাসন ও পার্লামেন্টের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যারা তাদের ক্ষতি করে বা অবমূল্যায়ন করে, তারা আসলে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাই ক্ষতিগ্রস্ত করে। ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের খেয়ালখুশি মতো বা দুর্নীতি আড়াল করার জন্য কিংবা অর্থ পাচার ও চুরির জন্য দেশের প্রচলিত আইন পরিবর্তন করা যায় না। এ ধরনের খারাপ ও অপরাধমূলক পদক্ষেপ দেশকেই ধ্বংস করে দিতে পারে। উদাহরণ হিসেবে সিন্ধু সরকারের ন্যাবের আইন বাতিলের অহেতুক তাড়াহুড়ার ঘটনাটির উল্লেখ করা যেতে পারে। পাকিস্তানে যারা মনে করে তারা সংবিধান এবং আইনের শাসনের উর্ধ্বে, তারা ভ্রান্তিতে রয়েছে।

সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার হাস্যকর অনুকরণ টেকসই হয় না। পাকিস্তান সমাজ আধুনিক নয়। এই সমাজ গণতান্ত্রিক মানসিকতার বদলে বৈষম্যভিত্তিক জোরালো ক্রমপরম্পরাভিত্তিক। পরিবার, গোত্র, বেরাদরি, গোত্রবাদ- সবই ক্রমপরম্পরায় নেতার নিরঙ্কুশ ক্ষমতার খুবই ঘনিষ্ঠ। সামন্ততন্ত্রে এগুলোর সবই উপস্থিত, তবে আধুনিক সমাজে নয়। পরিবর্তন হচ্ছে, তবে ধীরে ধীরে। আর তা আধুনিক রাষ্ট্রকে সমুন্নত করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। এই পরিস্থিতি তাদেরকে উল্টা দিকে নিয়ে যায। সব নাগরিককে রক্ষা করবে – এমন শক্তিশালী রাষ্ট্রের অনুপস্থিতির ফলে বর্ণ ও গোত্রের মতো ঐতিহ্যবাহী কাঠামো জোরদার হয়। কারণ এগুলোই তখন সমাজের সদস্যদের পরিপুষ্ট করে এবং সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে।

শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে সচেতন প্রয়াস চালাতে হবে প্রতিষ্ঠান ও আইনকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে সেগুলোকে বরং আরো শক্তিশালী করার জন্য। আধুনিক রাষ্ট্রে সংবিধান হলো দেশের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য সব আইনের মতো এটাও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ সমুন্নত ও ব্যাখ্যা করে। এই বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতোই, তবে সংবিধান দিয়ে পরিচালিত। রাষ্ট্রের আরেকটি প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক হুমকি থেকে দেশকে রক্ষা করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পার্লামেন্টের মতো অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় সেনাবাহিনী স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। কারণ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান দুর্বল হওয়ায় তারা দায়িত্ব পালন করতে পারে না।

সামরিক শাসন বিকশিত করা উচিত নয় এবং প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকা সহায়ক নয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যে কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতার ইতিহাস রয়েছে। পুরো পাকিস্তান সমাজের আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই কেবল একে সঠিক পথে আনা যেতে পারে।

ইসলামাবাদ-লাহোর মিছিল আইনের শাসন এবং সংবিধানের প্রতি চরম অবমাননা ছাড়া কিছুই নয়। প্রায় পুরো কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা একটি কন্টেইনারের ভেতরে বা ওপরে থাকায় পাকিস্তানের পরিচালনাই সঙ্কটে রয়েছে। প্রত্যেকেরই তাদের বিরুদ্ধে দেয়া রায়ের ব্যাপারে প্রতিকার চাওয়ার অধিকার আছে। তবে সেটা হওয়া উচিত যথাযথ ফোরামে। কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকা এক সিনিয়র রাজনীতিবিদ যখন রাষ্ট্রের মূল প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে উস্কানি দেন, তখন তা কেবল লজ্জাজনক ও অগ্রহণযোগ্যই নয়, বিপজ্জনকও। জনগণের ম্যান্ডেট কি আইনের শাসন ও সংবিধানের ঊর্ধ্বে এবং সেনাবাহিনী কেবল মরিয়মের চাচা মোদির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর কাজেই নিয়োজিত থাকার জন্য? জবাবদিহিতা না থাকলে দেশে নৈরাজ্যের সৃষ্টি হবে।

বেপরোয়া ব্যক্তিরা বেপরোয়া পন্থার আশ্রয় গ্রহণ করবে। শক্তি প্রদর্শনের ধারণা সরকারি খরচ সৃষ্টি করে। শরিফের নিজেকে এবং তার পরিবার সদস্যদের ন্যাবের ধারায় দোষী সাব্যস্ত হওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য তিনি জিপি রোডে বেপরোয়া শক্তি প্রদর্শন ঘটাতে চাইছেন। আমাদের রাজনৈতিক শ্রেণী সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা প্রদর্শন করছে। তারা ১৪ শতকে ফ্রান্সের রাজা লুইয়ের কথিত ‘আমিই রাষ্ট্র’ – এই স্পর্ধিত বক্তব্যই কেবল নিশ্চিত করছেন।

[লেখক : প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক]

print
শেয়ার করুন